ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতিতে এক নতুন এবং গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। বিশেষ করে জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, শিপিং বা জাহাজীকরণ ব্যয় বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কায় বাংলাদেশের মতো আমদানি-নির্ভর দেশগুলো নতুন করে চরম চাপে পড়েছে। এমন সংকটময় প্রেক্ষাপটে সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ধাক্কা সামাল দিতে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) থেকে প্রায় ১.৬ বিলিয়ন বা ১৬০ কোটি ডলার ঋণ পাওয়ার একটি বড় সুযোগ তৈরি হয়েছে বাংলাদেশের সামনে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এডিবির একটি বিশেষ জরুরি সহায়তা প্যাকেজের আওতায় এই অর্থের বড় একটি অংশ পাওয়া যেতে পারে। এর মধ্যে বৈশ্বিক অস্থিরতা মোকাবিলায় ঘোষিত বিশেষ প্যাকেজ থেকে ১০০ কোটি ডলার এবং চলমান অর্থনৈতিক সংস্কার কর্মসূচির দ্বিতীয় কিস্তি হিসেবে আরও ৬০ কোটি ডলার বাজেট সহায়তা পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ইআরডি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই অর্থ পেতে হলে বাংলাদেশকে একটি ‘নিডস অ্যাসেসমেন্ট রিপোর্ট’ বা প্রয়োজনীয়তা মূল্যায়ন প্রতিবেদন জমা দিতে হবে, যেখানে যুদ্ধের কারণে দেশের বাজেটে ও রিজার্ভে সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাবের চিত্র তুলে ধরা হবে।
জ্বালানি ব্যয় ও আমদানিতে অশনিসংকেত: অর্থনীতিবিদদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশের ওপর সবচেয়ে বড় আঘাত আসবে জ্বালানি খাতে। আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ‘জিরো কার্বন অ্যানালিটিক্স’-এর হিসাবে, যুদ্ধ অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশের জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানি বিল বছরে প্রায় ৪০ শতাংশ বা ৪৮০ কোটি ডলার পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। গত তিন সপ্তাহেই সরকারকে তুলনামূলক চড়া দামে ৯টি এলএনজি কার্গো আমদানি করতে হয়েছে। শিপিং রুটে বিঘ্ন ঘটলে শুধু জ্বালানি নয়, সার ও পেট্রোকেমিক্যাল আমদানিতেও খরচ বাড়বে, যা সরাসরি কৃষি উৎপাদনে প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ ও সরকারি উদ্যোগ: বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম মনে করেন, এই সংকট মোকাবিলায় সরকারের আগামী তিন মাসের জন্য একটি ‘জরুরি কর্মপরিকল্পনা’ থাকা জরুরি। তিনি বলেন, “জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে থাকা প্রবাসী বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থান রক্ষা করা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সরকার যেন জ্বালানি মজুদের প্রকৃত তথ্য জনগণের সামনে তুলে ধরে, যাতে বাজারে কোনো গুজব বা অস্থিরতা তৈরি না হয়।” এছাড়া তিনি ভোক্তাদেরও জ্বালানি ব্যবহারে আরও সাশ্রয়ী ও সহনশীল হওয়ার আহ্বান জানান।
তৎপর মন্ত্রিসভা কমিটি: বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি এবং ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার প্রভাব মোকাবিলায় সরকার ইতোমধ্যে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে সাত সদস্যের একটি শক্তিশালী মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করেছে। এই কমিটি নিয়মিতভাবে বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং এর ফলে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও মূল্যস্ফীতির ওপর কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে তা বিশ্লেষণ করছে। কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতেই উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থায়ন এবং অভ্যন্তরীণ নীতি সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এডিবির এই সম্ভাব্য ঋণ সহায়তা স্বল্পমেয়াদে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে কিছুটা স্বস্তি দেবে। তবে দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তার জন্য রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি, জ্বালানি আমদানিতে পরনির্ভরশীলতা কমানো এবং কঠোর অর্থনৈতিক সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই।
রিপোর্টারের নাম 























