জ্বালানি তেল সংকটের সরাসরি প্রভাব এখন রাজধানীসহ সারাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিক সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় দেশেও তেলের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ফিলিং স্টেশনগুলোতে তেলের জন্য দীর্ঘ লাইন এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) বেঁধে দেওয়া ‘তেল সরবরাহের সীমা’র কারণে দেশের সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে।
পাম্পে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা
রাজধানীর বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে দেখা গেছে পণ্যবাহী ট্রাক ও ডেলিভারি ভ্যানের দীর্ঘ সারি। মহাখালী এলাকায় তেলের জন্য অপেক্ষমাণ চালক রাকিব জানান, বিকেল সাড়ে ৩টা থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত তিনি তেল পাননি। দীর্ঘ সময় পাম্পে নষ্ট হওয়ায় সময়মতো গন্তব্যে পণ্য পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে চালকরা প্রয়োজনীয় পরিমাণ তেলও পাচ্ছেন না, যা দূরপাল্লার পরিবহনের ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ ও খরচ বৃদ্ধি
দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠীগুলোর মতে, জ্বালানি সংকট সরাসরি উৎপাদন ও বিপণন খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
- প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ: প্রতিষ্ঠানের বিপণন পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল জানান, পর্যাপ্ত তেল না পাওয়ায় ডিস্ট্রিবিউশন ব্যাহত হচ্ছে। কর্মীরা দীর্ঘ সময় অপেক্ষায় থাকায় রিসোর্সের পূর্ণ ব্যবহার হচ্ছে না, যা দীর্ঘমেয়াদে খরচ বাড়ানোর ঝুঁকি তৈরি করছে।
- সিটি গ্রুপ: পরিচালক বিশ্বজিৎ সাহা বলেন, নিজস্ব পরিবহন কোনোমতে চললেও বাইরের ট্রাক ভাড়া করতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে। চাহিদামতো ট্রাক পাওয়া যাচ্ছে না এবং পাওয়া গেলেও অস্বাভাবিক ভাড়া দাবি করা হচ্ছে।
- হিফস অ্যাগ্রো: প্রতিষ্ঠানটির সিইও ছৈয়দ মুহাম্মদ শোয়াইব হাছান জানান, ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে ১০ হাজার টাকার ট্রাক ভাড়া কয়েকদিনের ব্যবধানে ৩০ হাজার টাকায় ঠেকেছে। এছাড়া কারখানায় যেখানে দৈনিক ৩০০ লিটার ডিজেল প্রয়োজন, সেখানে মিলছে মাত্র ১০০ লিটার।
শিল্প উৎপাদনে বিঘ্ন
বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময় জেনারেটর চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় ডিজেল না পাওয়ায় অনেক কারখানায় উৎপাদন বন্ধ থাকছে। বিশেষ করে পোশাক খাতের মালিকরা জেনারেটর নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় আছেন। ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা করছেন, এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে বাজারে নিত্যপণ্যের কৃত্রিম সংকট তৈরি হতে পারে এবং দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাবে।
বিপিসির বেঁধে দেওয়া তেলের সীমা
বিপিসি গত ৬ মার্চ এক নির্দেশনায় গাড়িপ্রতি তেল বিক্রির সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে:
- মোটরসাইকেল: ২ লিটার (পেট্রোল/অকটেন)।
- ব্যক্তিগত গাড়ি: ১০ লিটার।
- এসইউভি/জিপ/মাইক্রোবাস: ২০-২৫ লিটার।
- দূরপাল্লার বাস/ট্রাক: ২০০-২২০ লিটার।
বিপিসি জানিয়েছে, দেশের ৯৫ শতাংশ তেল আমদানিনির্ভর হওয়ায় বৈশ্বিক সংকটে সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এছাড়া গুজবের কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে অতিরিক্ত তেল কেনার প্রবণতা তৈরি হওয়ায় এই নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
ঈদ সামনে রেখে শঙ্কা
আগামী সপ্তাহে ঈদ উৎসবকে কেন্দ্র করে সাধারণত পোশাক ও খাদ্যপণ্যের চাহিদা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। এমন সময়ে সরবরাহ ব্যবস্থার এই স্থবিরতা সাধারণ মানুষের ঈদ প্রস্তুতিতে বড় ধরনের বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। সংশ্লিষ্টরা দ্রুত এই সংকট নিরসনে সরকারের কার্যকর হস্তক্ষেপ এবং বাজার তদারকি জোরদারের দাবি জানিয়েছেন।
রিপোর্টারের নাম 























