ঢাকা ০৭:০১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১১ মার্চ ২০২৬

ইরানের ‘মোজাইক ডিফেন্স’: যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের জন্য এক নতুন চ্যালেঞ্জ

মধ্যপ্রাচ্যে ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যেকার সামরিক সংঘাত কেবল অস্ত্রের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি আধুনিক কৌশল ও কূটনীতির এক নতুন অধ্যায় উন্মোচন করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরানের ‘মোজাইক ডিফেন্স’ কৌশল, যা বিভক্ত, স্বনির্ভর এবং কম খরচে দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম, তা প্রতিপক্ষকে নিরন্তর চাপের মধ্যে রাখছে এবং যুদ্ধকে দ্রুত সমাপ্তির পথে যেতে বাধা দিচ্ছে।

ইরানের সামরিক কূটনীতিতে ‘মোজাইক ডিফেন্স’ একটি যুগান্তকারী কৌশল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই পদ্ধতির মূল ধারণা হলো একটি কেন্দ্রীয় কমান্ড কাঠামো ভেঙে দিয়ে বহুস্তরীয়, স্বনির্ভর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করা। এর ফলে এক বা দুটি বড় হামলায় পুরো সামরিক শক্তি ধ্বংস হওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে। এটি কেবল যুদ্ধকালীন প্রতিক্রিয়া নয়, বরং সময়কে একটি অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার এক সুচিন্তিত কৌশল। এই প্রতিরক্ষা মডেলে, বেসিজ মিলিশিয়া, ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি), নৌবাহিনী, ক্ষেপণাস্ত্র ইউনিট এবং স্থানীয় কমান্ডগুলো স্বাধীনভাবে কাজ করার ক্ষমতা রাখে।

এই কৌশল এমন এক পরিস্থিতির জন্য বিশেষভাবে তৈরি করা হয়েছে যেখানে ইরানের উচ্চপদস্থ কমান্ডার নিহত হলেও, যোগাযোগ নেটওয়ার্ক বিঘ্নিত হলেও বা সদর দপ্তর ধ্বংস হলেও স্থানীয় ইউনিটগুলো স্বতন্ত্রভাবে লড়াই চালিয়ে যেতে পারে। ফলে, এক বা একাধিক লক্ষ্যবস্তুকে বাদ দিয়ে দিলে পুরো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে – এমন ধারণা এই কৌশলে অনুপস্থিত।

আন্তর্জাতিক সামরিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, ইরান এই কৌশল ব্যবহার করে যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত ও ব্যয়বহুল করে তুলছে। তারা তুলনামূলকভাবে কম খরচে অনেক বেশি প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে সক্ষম হচ্ছে। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনগুলো সস্তা হলেও, প্রতিপক্ষকে হাজার হাজার ডলারের ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করতে বাধ্য করছে। এর মাধ্যমে ইরান কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপও তৈরি করতে সক্ষম হচ্ছে।

ইরান কেবল সামরিক লড়াইয়ে জয়ী হতে চায় না, বরং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তিকেও দুর্বল করে দিতে চাইছে। এই কৌশলটি ইরানের সক্ষমতা, কম ব্যয় এবং একটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি প্রদর্শন করে।

কেন্দ্রীয় কমান্ডে আঘাত হানলেও ইরানের প্রতিরোধ অব্যাহত থাকছে। বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান অভিযানে ইরানের উচ্চ পর্যায়ের কমান্ড সদস্য এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। এই আক্রমণগুলোর পরেও ইরানের স্বনির্ভর ইউনিটগুলো যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে, যা ইরানের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বহীন প্রতিরোধ এক নতুন বাস্তবতার জন্ম দিয়েছে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ব্রিটিশ গণমাধ্যমে মুসলিমবিদ্বেষ: পক্ষপাতদুষ্ট প্রতিবেদনের উদ্বেগজনক চিত্র

ইরানের ‘মোজাইক ডিফেন্স’: যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের জন্য এক নতুন চ্যালেঞ্জ

আপডেট সময় : ০৫:২১:০৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১১ মার্চ ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যে ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যেকার সামরিক সংঘাত কেবল অস্ত্রের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি আধুনিক কৌশল ও কূটনীতির এক নতুন অধ্যায় উন্মোচন করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরানের ‘মোজাইক ডিফেন্স’ কৌশল, যা বিভক্ত, স্বনির্ভর এবং কম খরচে দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম, তা প্রতিপক্ষকে নিরন্তর চাপের মধ্যে রাখছে এবং যুদ্ধকে দ্রুত সমাপ্তির পথে যেতে বাধা দিচ্ছে।

ইরানের সামরিক কূটনীতিতে ‘মোজাইক ডিফেন্স’ একটি যুগান্তকারী কৌশল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই পদ্ধতির মূল ধারণা হলো একটি কেন্দ্রীয় কমান্ড কাঠামো ভেঙে দিয়ে বহুস্তরীয়, স্বনির্ভর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করা। এর ফলে এক বা দুটি বড় হামলায় পুরো সামরিক শক্তি ধ্বংস হওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে। এটি কেবল যুদ্ধকালীন প্রতিক্রিয়া নয়, বরং সময়কে একটি অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার এক সুচিন্তিত কৌশল। এই প্রতিরক্ষা মডেলে, বেসিজ মিলিশিয়া, ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি), নৌবাহিনী, ক্ষেপণাস্ত্র ইউনিট এবং স্থানীয় কমান্ডগুলো স্বাধীনভাবে কাজ করার ক্ষমতা রাখে।

এই কৌশল এমন এক পরিস্থিতির জন্য বিশেষভাবে তৈরি করা হয়েছে যেখানে ইরানের উচ্চপদস্থ কমান্ডার নিহত হলেও, যোগাযোগ নেটওয়ার্ক বিঘ্নিত হলেও বা সদর দপ্তর ধ্বংস হলেও স্থানীয় ইউনিটগুলো স্বতন্ত্রভাবে লড়াই চালিয়ে যেতে পারে। ফলে, এক বা একাধিক লক্ষ্যবস্তুকে বাদ দিয়ে দিলে পুরো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে – এমন ধারণা এই কৌশলে অনুপস্থিত।

আন্তর্জাতিক সামরিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, ইরান এই কৌশল ব্যবহার করে যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত ও ব্যয়বহুল করে তুলছে। তারা তুলনামূলকভাবে কম খরচে অনেক বেশি প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে সক্ষম হচ্ছে। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনগুলো সস্তা হলেও, প্রতিপক্ষকে হাজার হাজার ডলারের ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করতে বাধ্য করছে। এর মাধ্যমে ইরান কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপও তৈরি করতে সক্ষম হচ্ছে।

ইরান কেবল সামরিক লড়াইয়ে জয়ী হতে চায় না, বরং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তিকেও দুর্বল করে দিতে চাইছে। এই কৌশলটি ইরানের সক্ষমতা, কম ব্যয় এবং একটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি প্রদর্শন করে।

কেন্দ্রীয় কমান্ডে আঘাত হানলেও ইরানের প্রতিরোধ অব্যাহত থাকছে। বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান অভিযানে ইরানের উচ্চ পর্যায়ের কমান্ড সদস্য এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। এই আক্রমণগুলোর পরেও ইরানের স্বনির্ভর ইউনিটগুলো যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে, যা ইরানের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বহীন প্রতিরোধ এক নতুন বাস্তবতার জন্ম দিয়েছে।