ঢাকা ০৯:২৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৬

দুদক কমিশন নিয়োগ: ২০২৫ সালের সংশোধিত আইনের আদ্যোপান্ত

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) শীর্ষ নেতৃত্বের শূন্যতা পূরণে এখন ২০২৫ সালের সংশোধিত আইন বা অধ্যাদেশটিই মূল ভিত্তি। আগে এই সংস্থাটি কেবল তিন সদস্যের একটি কমিশন দ্বারা পরিচালিত হলেও নতুন সংশোধনীতে কমিশনের আকার, নিয়োগ প্রক্রিয়া এবং স্বচ্ছতার বিষয়ে আমূল পরিবর্তন আনা হয়েছে।

কমিশনের আকার ও কাঠামো নতুন অধ্যাদেশ অনুযায়ী এখন থেকে দুর্নীতি দমন কমিশন অনধিক পাঁচজন কমিশনারের সমন্বয়ে গঠিত হবে। যেখানে আগের আইনে সদস্য সংখ্যা ছিল মাত্র তিনজন। এই পাঁচজনের মধ্যে অন্তত একজনকে নারী হতে হবে এবং একজনকে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়ে দক্ষ ও অভিজ্ঞ হতে হবে। এই পাঁচজন কমিশনারের মধ্য থেকেই রাষ্ট্রপতি একজনকে কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে বেছে নেবেন। কমিশনার হওয়ার জন্য আইন, বিচার, প্রশাসন বা দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রমে অন্তত ২০ বছরের পেশাদার অভিজ্ঞতার শর্ত দেওয়া হয়েছে। তবে কোনো ব্যক্তি যদি বিদেশি নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন বা যথাযথ অনুমতি ছাড়া বিদেশে বিনিয়োগ করেন, তবে তিনি এই পদের জন্য অযোগ্য বলে বিবেচিত হবেন।

সাত সদস্যের শক্তিশালী বাছাই কমিটি কমিশনার নিয়োগের জন্য নাম সুপারিশ করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে একটি উচ্চপর্যায়ের সাত সদস্যের বাছাই কমিটিকে। এই কমিটির প্রধান বা সভাপতি হবেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের একজন জ্যেষ্ঠ বিচারক। কমিটির অন্যান্য সদস্যদের মধ্যে থাকবেন হাইকোর্ট বিভাগের একজন বিচারক, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি), সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) চেয়ারম্যান এবং জাতীয় সংসদের স্পিকার মনোনীত সরকারি ও বিরোধী দলের একজন করে দুইজন সংসদ সদস্য। এছাড়া সুশাসন বা দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রমে অভিজ্ঞ একজন নাগরিককে কমিটির সভাপতি সদস্য হিসেবে মনোনীত করবেন। উল্লেখ্য যে, দেশে সংসদ কার্যকর না থাকলে এই দুইজন সংসদ সদস্য ছাড়াই কমিটি তার কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে।

নিয়োগের ধাপ ও স্বচ্ছতা নিয়োগ প্রক্রিয়ায় এবারই প্রথম গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে আবেদন গ্রহণের বিষয়টি আইনি বাধ্যবাধকতা হিসেবে যুক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ, কমিটি বিজ্ঞপ্তি দিয়ে আগ্রহী ব্যক্তিদের কাছ থেকে জীবনবৃত্তান্ত আহ্বান করবে। আবেদনকারীদের জন্য সবচেয়ে বড় শর্ত হলো, জীবনবৃত্তান্তের সাথে নিজেদের সম্পদের হিসাব বিবরণী জমা দিতে হবে। বাছাই কমিটি আবেদনগুলো যাচাই-বাছাই করে একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা বা শর্টলিস্ট তৈরি করবে এবং প্রার্থীদের সাক্ষাৎকার নেবে। এই সাক্ষাৎকার প্রক্রিয়ায় কারিগরি সহায়তার জন্য কমিটি চাইলে সর্বোচ্চ দুইজন বিশেষজ্ঞকে সাথে রাখতে পারবে। যাবতীয় যাচাই-বাছাই শেষে কমিটি প্রতিটি পদের বিপরীতে দুইজন যোগ্য প্রার্থীর নাম রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠাবে।

চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও কার্যপদ্ধতি বাছাই কমিটি সাধারণত আলোচনার মাধ্যমে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেষ্টা করবে। তবে কোনো বিষয়ে মতভেদ দেখা দিলে উপস্থিত সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠের মতই সিদ্ধান্ত হিসেবে গণ্য হবে। কমিটির সাচিবিক সহায়তার দায়িত্বে থাকবে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। বাছাই কমিটির পাঠানো তালিকা থেকে রাষ্ট্রপতি চূড়ান্তভাবে কমিশনার ও চেয়ারম্যান নিয়োগ দেবেন। তবে সংসদীয় গণতন্ত্রের রীতি অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির এই সিদ্ধান্ত মূলত প্রধানমন্ত্রীর লিখিত পরামর্শের মাধ্যমেই কার্যকর হয়ে থাকে।

নতুন এই আইনের ফলে দুদকের নিয়োগ প্রক্রিয়া যেমন দীর্ঘ ও সুনিশ্চিত করা হয়েছে, তেমনি প্রার্থীদের সম্পদের বিবরণী ও সাক্ষাৎকার গ্রহণের মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও যোগ্য নেতৃত্ব খুঁজে বের করার পথ প্রশস্ত করা হয়েছে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় লিজেন্ডারি সংগীতশিল্পী আশা ভোঁসলেকে শেষ বিদায়

দুদক কমিশন নিয়োগ: ২০২৫ সালের সংশোধিত আইনের আদ্যোপান্ত

আপডেট সময় : ০১:২৩:৩৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ৯ মার্চ ২০২৬

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) শীর্ষ নেতৃত্বের শূন্যতা পূরণে এখন ২০২৫ সালের সংশোধিত আইন বা অধ্যাদেশটিই মূল ভিত্তি। আগে এই সংস্থাটি কেবল তিন সদস্যের একটি কমিশন দ্বারা পরিচালিত হলেও নতুন সংশোধনীতে কমিশনের আকার, নিয়োগ প্রক্রিয়া এবং স্বচ্ছতার বিষয়ে আমূল পরিবর্তন আনা হয়েছে।

কমিশনের আকার ও কাঠামো নতুন অধ্যাদেশ অনুযায়ী এখন থেকে দুর্নীতি দমন কমিশন অনধিক পাঁচজন কমিশনারের সমন্বয়ে গঠিত হবে। যেখানে আগের আইনে সদস্য সংখ্যা ছিল মাত্র তিনজন। এই পাঁচজনের মধ্যে অন্তত একজনকে নারী হতে হবে এবং একজনকে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়ে দক্ষ ও অভিজ্ঞ হতে হবে। এই পাঁচজন কমিশনারের মধ্য থেকেই রাষ্ট্রপতি একজনকে কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে বেছে নেবেন। কমিশনার হওয়ার জন্য আইন, বিচার, প্রশাসন বা দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রমে অন্তত ২০ বছরের পেশাদার অভিজ্ঞতার শর্ত দেওয়া হয়েছে। তবে কোনো ব্যক্তি যদি বিদেশি নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন বা যথাযথ অনুমতি ছাড়া বিদেশে বিনিয়োগ করেন, তবে তিনি এই পদের জন্য অযোগ্য বলে বিবেচিত হবেন।

সাত সদস্যের শক্তিশালী বাছাই কমিটি কমিশনার নিয়োগের জন্য নাম সুপারিশ করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে একটি উচ্চপর্যায়ের সাত সদস্যের বাছাই কমিটিকে। এই কমিটির প্রধান বা সভাপতি হবেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের একজন জ্যেষ্ঠ বিচারক। কমিটির অন্যান্য সদস্যদের মধ্যে থাকবেন হাইকোর্ট বিভাগের একজন বিচারক, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি), সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) চেয়ারম্যান এবং জাতীয় সংসদের স্পিকার মনোনীত সরকারি ও বিরোধী দলের একজন করে দুইজন সংসদ সদস্য। এছাড়া সুশাসন বা দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রমে অভিজ্ঞ একজন নাগরিককে কমিটির সভাপতি সদস্য হিসেবে মনোনীত করবেন। উল্লেখ্য যে, দেশে সংসদ কার্যকর না থাকলে এই দুইজন সংসদ সদস্য ছাড়াই কমিটি তার কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে।

নিয়োগের ধাপ ও স্বচ্ছতা নিয়োগ প্রক্রিয়ায় এবারই প্রথম গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে আবেদন গ্রহণের বিষয়টি আইনি বাধ্যবাধকতা হিসেবে যুক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ, কমিটি বিজ্ঞপ্তি দিয়ে আগ্রহী ব্যক্তিদের কাছ থেকে জীবনবৃত্তান্ত আহ্বান করবে। আবেদনকারীদের জন্য সবচেয়ে বড় শর্ত হলো, জীবনবৃত্তান্তের সাথে নিজেদের সম্পদের হিসাব বিবরণী জমা দিতে হবে। বাছাই কমিটি আবেদনগুলো যাচাই-বাছাই করে একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা বা শর্টলিস্ট তৈরি করবে এবং প্রার্থীদের সাক্ষাৎকার নেবে। এই সাক্ষাৎকার প্রক্রিয়ায় কারিগরি সহায়তার জন্য কমিটি চাইলে সর্বোচ্চ দুইজন বিশেষজ্ঞকে সাথে রাখতে পারবে। যাবতীয় যাচাই-বাছাই শেষে কমিটি প্রতিটি পদের বিপরীতে দুইজন যোগ্য প্রার্থীর নাম রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠাবে।

চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও কার্যপদ্ধতি বাছাই কমিটি সাধারণত আলোচনার মাধ্যমে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেষ্টা করবে। তবে কোনো বিষয়ে মতভেদ দেখা দিলে উপস্থিত সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠের মতই সিদ্ধান্ত হিসেবে গণ্য হবে। কমিটির সাচিবিক সহায়তার দায়িত্বে থাকবে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। বাছাই কমিটির পাঠানো তালিকা থেকে রাষ্ট্রপতি চূড়ান্তভাবে কমিশনার ও চেয়ারম্যান নিয়োগ দেবেন। তবে সংসদীয় গণতন্ত্রের রীতি অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির এই সিদ্ধান্ত মূলত প্রধানমন্ত্রীর লিখিত পরামর্শের মাধ্যমেই কার্যকর হয়ে থাকে।

নতুন এই আইনের ফলে দুদকের নিয়োগ প্রক্রিয়া যেমন দীর্ঘ ও সুনিশ্চিত করা হয়েছে, তেমনি প্রার্থীদের সম্পদের বিবরণী ও সাক্ষাৎকার গ্রহণের মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও যোগ্য নেতৃত্ব খুঁজে বের করার পথ প্রশস্ত করা হয়েছে।