ঢাকা ১১:৫৫ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০৮ মার্চ ২০২৬

চরফ্যাশনে শুঁটকি উৎপাদন করে স্বপ্ন বুনছে উপকূলের মানুষ

দ্বীপজেলা ভোলার চরফ্যাশনের উপকূলের বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলে এখন ব্যস্ততার ভিন্ন এক চিত্র। মাঠের পর মাঠজুড়ে রোদে বিছানো ছোট মাছ, চিংড়ি ও চেউয়া। মৌসুম প্রায় শেষের পথে, আর কয়েক সপ্তাহ পরই আবহাওয়ার পরিবর্তন। তাই রোদের প্রতিটি মুহূর্তকে কাজে লাগাতে নারী-পুরুষ শ্রমিকরা দিনভর নিরলস পরিশ্রম করছেন।

চরফ্যাশন উপজেলার বিচ্ছিন্ন দ্বীপ ঢালচরে গিয়ে দেখা যায়, নদী থেকে ট্রলারে ট্রলারে মাছ আসছে কিনারায়। শ্রমিকরা সেগুলো ধুয়ে পরিষ্কার করছেন। কেউ চিংড়ি, চেউয়া ও ছোট মাছ আলাদা করছেন। আবার কেউ বাঁশের চাটাই বা জাল শিটের ওপর মাছ সারি করে বিছিয়ে দিয়ে রোদে শুকাচ্ছেন। কেউ মাছ উল্টাচ্ছেন, কেউ মাছ আলাদা করছেন, কেউ বস্তাবন্দি করছেন। সূর্যাস্তের আগেই দিনের উৎপাদন গুছিয়ে রাখার তাড়া সবার মাঝে। শুঁটকি উৎপাদনে নারীর অংশগ্রহণ বিশেষভাবে লক্ষ্য করা গেছে। অনেক গৃহিণী মৌসুমে বাড়তি আয়ের আশায় এ কাজে যুক্ত হয়েছেন এবং পুরুষদের সঙ্গে সমানতালে কাজ করছেন।

‎‎স্থানীয় জেলেরা জানান, বিগত বছরের তুলনায় এ বছর চেউয়া মাছ বেশি পাওয়া যাচ্ছে মেঘনায়। দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রপ্তানির সম্ভাবনা রয়েছে। নদী থেকে মাছ ধরে চরেই শুকানো হয়, আর দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পাইকাররা এসে সরাসরি কিনে নিয়ে যান। এ মৌসুমে কয়েক লাখ টাকার লেনদেন হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

‎ঢালচরের কামাল মাঝি জানান, ঢালচরে শুঁটকি উৎপাদন পুরোপুরি প্রাকৃতিক রোদনির্ভর। আধুনিক ড্রায়ার বা উন্নত সংরক্ষণব্যবস্থা না থাকায় হঠাৎ বৃষ্টি, অতিরিক্ত আর্দ্রতা বা ঝড়ো হাওয়ায় বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা থাকে বিশেষ করে মৌসুমের শেষ দিকে।

‎শুঁটকি উৎপাদনে নিয়োজিত শ্রমিক আলমগীর বেপারি ও নারী শ্রমিক বিধবা রেনু বেগম জানান, মৌসুমে প্রতিদিন সকালে মাছ নিয়ে কাজ শুরু হয়। রোদে শুকানো থেকে শুরু করে আলাদা করা ও বস্তাবন্দি-সব কাজই করেন তারা। প্রতিটি উৎপাদন কেন্দ্রে গড়ে ১০-১২ জন শ্রমিক কাজ করেন।

কেউ করেন দৈনিক ৭০০-৮০০ টাকা মজুরিতে, কেউ মৌসুমি চুক্তিতে। এ কয়েক মাসের আয়ই অনেক পরিবারের সারা বছরের ভরসা।

‎ঢালচরের শুঁটকি আড়তদার শাহে আলম ফরাজি বলেন, এ বছর ঢালচরের শুঁটকি ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছে। প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার লেনদেন হচ্ছে। পাইকারদের কাছে চিংড়ির শুঁটকি মণপ্রতি ছয় থেকে সাত হাজার টাকা, মাটিতে শুকনো ‎চেউয়া ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা এবং জাল শিটের ওপরে শুকনো চেউয়া মাছের প্রতিমণ ৩ হাজার থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি করছি ব্যবসায়ীদের কাছে। 

‎‎তিনি আরো বলেন, গত কয়েক বছরের তুলনায় এ বছর জেলে ও উৎপাদকরা লাভবান হবেন বলে আশা করা হচ্ছে। তবে আধুনিক সংরক্ষণ ও মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু করা গেলে বাজার আরো সম্প্রসারিত হবে এবং রপ্তানির সুযোগ বাড়বে।

‎এ ব্যাপারে চরফ্যাশন উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা জয়ন্ত কুমার অপু আমার দেশকে বলেন, ঢালচরের শুঁটকি খাতকে আমরা আরো আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন করতে কাজ করছি। উৎপাদকদের কেমিক্যালমুক্ত, স্বাস্থ্যসম্মত ও উন্নত পদ্ধতিতে শুঁটকি উৎপাদনের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। মানসম্মত উৎপাদন নিশ্চিত করা গেলে এ খাত উপকূলের অর্থনীতিতে আরো বড় অবদান রাখবে এবং জেলে ও শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

হামলা মোকাবিলায় প্রস্তুত আমিরাত: প্রেসিডেন্ট আল নাহিয়ান

চরফ্যাশনে শুঁটকি উৎপাদন করে স্বপ্ন বুনছে উপকূলের মানুষ

আপডেট সময় : ১০:১২:১৪ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৮ মার্চ ২০২৬

দ্বীপজেলা ভোলার চরফ্যাশনের উপকূলের বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলে এখন ব্যস্ততার ভিন্ন এক চিত্র। মাঠের পর মাঠজুড়ে রোদে বিছানো ছোট মাছ, চিংড়ি ও চেউয়া। মৌসুম প্রায় শেষের পথে, আর কয়েক সপ্তাহ পরই আবহাওয়ার পরিবর্তন। তাই রোদের প্রতিটি মুহূর্তকে কাজে লাগাতে নারী-পুরুষ শ্রমিকরা দিনভর নিরলস পরিশ্রম করছেন।

চরফ্যাশন উপজেলার বিচ্ছিন্ন দ্বীপ ঢালচরে গিয়ে দেখা যায়, নদী থেকে ট্রলারে ট্রলারে মাছ আসছে কিনারায়। শ্রমিকরা সেগুলো ধুয়ে পরিষ্কার করছেন। কেউ চিংড়ি, চেউয়া ও ছোট মাছ আলাদা করছেন। আবার কেউ বাঁশের চাটাই বা জাল শিটের ওপর মাছ সারি করে বিছিয়ে দিয়ে রোদে শুকাচ্ছেন। কেউ মাছ উল্টাচ্ছেন, কেউ মাছ আলাদা করছেন, কেউ বস্তাবন্দি করছেন। সূর্যাস্তের আগেই দিনের উৎপাদন গুছিয়ে রাখার তাড়া সবার মাঝে। শুঁটকি উৎপাদনে নারীর অংশগ্রহণ বিশেষভাবে লক্ষ্য করা গেছে। অনেক গৃহিণী মৌসুমে বাড়তি আয়ের আশায় এ কাজে যুক্ত হয়েছেন এবং পুরুষদের সঙ্গে সমানতালে কাজ করছেন।

‎‎স্থানীয় জেলেরা জানান, বিগত বছরের তুলনায় এ বছর চেউয়া মাছ বেশি পাওয়া যাচ্ছে মেঘনায়। দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রপ্তানির সম্ভাবনা রয়েছে। নদী থেকে মাছ ধরে চরেই শুকানো হয়, আর দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পাইকাররা এসে সরাসরি কিনে নিয়ে যান। এ মৌসুমে কয়েক লাখ টাকার লেনদেন হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

‎ঢালচরের কামাল মাঝি জানান, ঢালচরে শুঁটকি উৎপাদন পুরোপুরি প্রাকৃতিক রোদনির্ভর। আধুনিক ড্রায়ার বা উন্নত সংরক্ষণব্যবস্থা না থাকায় হঠাৎ বৃষ্টি, অতিরিক্ত আর্দ্রতা বা ঝড়ো হাওয়ায় বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা থাকে বিশেষ করে মৌসুমের শেষ দিকে।

‎শুঁটকি উৎপাদনে নিয়োজিত শ্রমিক আলমগীর বেপারি ও নারী শ্রমিক বিধবা রেনু বেগম জানান, মৌসুমে প্রতিদিন সকালে মাছ নিয়ে কাজ শুরু হয়। রোদে শুকানো থেকে শুরু করে আলাদা করা ও বস্তাবন্দি-সব কাজই করেন তারা। প্রতিটি উৎপাদন কেন্দ্রে গড়ে ১০-১২ জন শ্রমিক কাজ করেন।

কেউ করেন দৈনিক ৭০০-৮০০ টাকা মজুরিতে, কেউ মৌসুমি চুক্তিতে। এ কয়েক মাসের আয়ই অনেক পরিবারের সারা বছরের ভরসা।

‎ঢালচরের শুঁটকি আড়তদার শাহে আলম ফরাজি বলেন, এ বছর ঢালচরের শুঁটকি ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছে। প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার লেনদেন হচ্ছে। পাইকারদের কাছে চিংড়ির শুঁটকি মণপ্রতি ছয় থেকে সাত হাজার টাকা, মাটিতে শুকনো ‎চেউয়া ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা এবং জাল শিটের ওপরে শুকনো চেউয়া মাছের প্রতিমণ ৩ হাজার থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি করছি ব্যবসায়ীদের কাছে। 

‎‎তিনি আরো বলেন, গত কয়েক বছরের তুলনায় এ বছর জেলে ও উৎপাদকরা লাভবান হবেন বলে আশা করা হচ্ছে। তবে আধুনিক সংরক্ষণ ও মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু করা গেলে বাজার আরো সম্প্রসারিত হবে এবং রপ্তানির সুযোগ বাড়বে।

‎এ ব্যাপারে চরফ্যাশন উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা জয়ন্ত কুমার অপু আমার দেশকে বলেন, ঢালচরের শুঁটকি খাতকে আমরা আরো আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন করতে কাজ করছি। উৎপাদকদের কেমিক্যালমুক্ত, স্বাস্থ্যসম্মত ও উন্নত পদ্ধতিতে শুঁটকি উৎপাদনের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। মানসম্মত উৎপাদন নিশ্চিত করা গেলে এ খাত উপকূলের অর্থনীতিতে আরো বড় অবদান রাখবে এবং জেলে ও শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।