ঢাকা ১১:১৪ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০৮ মার্চ ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের উত্তাপ বাংলাদেশে: জ্বালানি সংকটে রেশনিং ও কৃচ্ছ্রসাধনের কঠিন চ্যালেঞ্জ

মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়া যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাবে টালমাটাল বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার। এর সরাসরি আঁচ লেগেছে বাংলাদেশেও। আমদানিতে বিঘ্ন আর অভ্যন্তরীণ মজুত নিয়ে উদ্বেগের মুখে সরকার জ্বালানি তেল বিক্রিতে কঠোর রেশনিং ব্যবস্থা চালু করেছে। রাজধানীসহ সারা দেশে পাম্পগুলোতে তেলের জন্য যানবাহনের দীর্ঘ সারি আর সাধারণ মানুষের মাঝে তৈরি হওয়া উদ্বেগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এই সংকট মোকাবিলায় সরকার এখন কৃচ্ছ্রসাধন ও রেশনিংয়ের মতো কঠোর পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হচ্ছে।

রাজধানীর চিত্র এখন অনেকটাই পাল্টে গেছে। সাহরির পর থেকেই মগবাজার, মহাখালী, খিলক্ষেত কিংবা টঙ্গীর মতো এলাকাগুলোতে পেট্রোল পাম্পের সামনে শত শত যানবাহনের লাইন দেখা যাচ্ছে। ছুটির দিনের ভোরেও এই দীর্ঘ সারির কারণে মূল সড়কে যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। অনেক পাম্পে ‘তেল নেই’ সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে, যা সাধারণ চালকদের ভোগান্তি ও উৎকণ্ঠা বাড়িয়ে দিয়েছে। মূলত মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন-ইসরাইল ও ইরান সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের প্রধান রুট ‘হরমুজ প্রণালি’ কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। বিশ্বের ২০ শতাংশ জ্বালানি পণ্য এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ইরান এই জলপথ বন্ধ করে দেওয়ায় শত শত তেলের ট্যাংকার আটকা পড়েছে, যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের আমদানিতেও। উল্লেখ্য, দেশের গ্যাস চাহিদার ৪৫ শতাংশ এবং জ্বালানি তেলের বড় একটি অংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে।

অভ্যন্তরীণ বাজারে এই সংকটের বড় একটি কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে জনমনে তৈরি হওয়া আতঙ্ক বা ‘প্যানিক বায়িং’। রমজানের নিত্যপণ্যের মতো জ্বালানি তেলের ক্ষেত্রেও সাধারণ মানুষ প্রয়োজনের অতিরিক্ত মজুত করার চেষ্টা করছে। বিপিসির তথ্যমতে, গত এক সপ্তাহে ডিজেল, পেট্রোল ও অকটেনের বিক্রি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে। এই অতিরিক্ত চাহিদা সামাল দিতে না পেরে অনেক পাম্পের মজুত দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পেট্রোলিয়াম করপোরেশন যানবাহনে জ্বালানি সরবরাহের সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, মোটরসাইকেল দৈনিক সর্বোচ্চ ২ লিটার, প্রাইভেট কার ১০ লিটার এবং দূরপাল্লার বাস-ট্রাক ২০০ থেকে ২২০ লিটারের বেশি তেল নিতে পারবে না। এছাড়া তেল কেনার সময় আগের ক্রয়ের রসিদ দেখানোর বাধ্যবাধকতাও আরোপ করা হয়েছে।

জ্বালানি সংকটের প্রভাব কেবল সড়কেই সীমাবদ্ধ নেই, এটি আঘাত হেনেছে শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতেও। গ্যাস সাশ্রয়ের লক্ষ্যে দেশের পাঁচটি সার কারখানার মধ্যে চারটির উৎপাদন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। জাতীয় গ্রিডে এলএনজি সরবরাহ কমিয়ে দেওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে চড়া মূল্যে জ্বালানি কেনার চেষ্টা করা হলেও সরবরাহকারী দেশগুলোর অনীহার কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না। এমনকি চীনও তাদের পরিশোধিত তেলের রপ্তানি সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে।

এই ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট বা সংকট ব্যবস্থাপনায় সরকার সর্বোচ্চ কৃচ্ছ্রসাধনের নীতি গ্রহণ করেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজের দপ্তরে এসি ও বাতি বন্ধ রেখে মিতব্যয়িতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। মন্ত্রীদের যাতায়াতে গাড়ি ভাগাভাগি করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সরকারি অফিসগুলোতে আলোকসজ্জা পরিহার ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বর্তমান পরিস্থিতিকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের চেয়েও ভয়াবহ হিসেবে উল্লেখ করে দেশবাসীকে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়েছেন।

অর্থনৈতিকভাবেও বাংলাদেশ এক কঠিন সময় পার করছে। রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের ঘাটতি, বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ এবং টানা সাত মাস ধরে রপ্তানি আয় কমে যাওয়া দেশের অর্থনীতিকে দুর্বল করে ফেলেছে। এর ওপর জ্বালানি সংকটের কারণে কৃষি উৎপাদন ও পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা ব্যাহত হলে বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে বাংলাদেশের জন্য সামনের দিনগুলো আরও চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠবে। এই বহুমুখী সংকট কতটা দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করা সম্ভব হয়, তার ওপরই নির্ভর করছে দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের উত্তাপ বাংলাদেশে: জ্বালানি সংকটে রেশনিং ও কৃচ্ছ্রসাধনের কঠিন চ্যালেঞ্জ

আপডেট সময় : ০৮:৫০:৪৭ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৮ মার্চ ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়া যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাবে টালমাটাল বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার। এর সরাসরি আঁচ লেগেছে বাংলাদেশেও। আমদানিতে বিঘ্ন আর অভ্যন্তরীণ মজুত নিয়ে উদ্বেগের মুখে সরকার জ্বালানি তেল বিক্রিতে কঠোর রেশনিং ব্যবস্থা চালু করেছে। রাজধানীসহ সারা দেশে পাম্পগুলোতে তেলের জন্য যানবাহনের দীর্ঘ সারি আর সাধারণ মানুষের মাঝে তৈরি হওয়া উদ্বেগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এই সংকট মোকাবিলায় সরকার এখন কৃচ্ছ্রসাধন ও রেশনিংয়ের মতো কঠোর পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হচ্ছে।

রাজধানীর চিত্র এখন অনেকটাই পাল্টে গেছে। সাহরির পর থেকেই মগবাজার, মহাখালী, খিলক্ষেত কিংবা টঙ্গীর মতো এলাকাগুলোতে পেট্রোল পাম্পের সামনে শত শত যানবাহনের লাইন দেখা যাচ্ছে। ছুটির দিনের ভোরেও এই দীর্ঘ সারির কারণে মূল সড়কে যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। অনেক পাম্পে ‘তেল নেই’ সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে, যা সাধারণ চালকদের ভোগান্তি ও উৎকণ্ঠা বাড়িয়ে দিয়েছে। মূলত মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন-ইসরাইল ও ইরান সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের প্রধান রুট ‘হরমুজ প্রণালি’ কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। বিশ্বের ২০ শতাংশ জ্বালানি পণ্য এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ইরান এই জলপথ বন্ধ করে দেওয়ায় শত শত তেলের ট্যাংকার আটকা পড়েছে, যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের আমদানিতেও। উল্লেখ্য, দেশের গ্যাস চাহিদার ৪৫ শতাংশ এবং জ্বালানি তেলের বড় একটি অংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে।

অভ্যন্তরীণ বাজারে এই সংকটের বড় একটি কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে জনমনে তৈরি হওয়া আতঙ্ক বা ‘প্যানিক বায়িং’। রমজানের নিত্যপণ্যের মতো জ্বালানি তেলের ক্ষেত্রেও সাধারণ মানুষ প্রয়োজনের অতিরিক্ত মজুত করার চেষ্টা করছে। বিপিসির তথ্যমতে, গত এক সপ্তাহে ডিজেল, পেট্রোল ও অকটেনের বিক্রি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে। এই অতিরিক্ত চাহিদা সামাল দিতে না পেরে অনেক পাম্পের মজুত দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পেট্রোলিয়াম করপোরেশন যানবাহনে জ্বালানি সরবরাহের সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, মোটরসাইকেল দৈনিক সর্বোচ্চ ২ লিটার, প্রাইভেট কার ১০ লিটার এবং দূরপাল্লার বাস-ট্রাক ২০০ থেকে ২২০ লিটারের বেশি তেল নিতে পারবে না। এছাড়া তেল কেনার সময় আগের ক্রয়ের রসিদ দেখানোর বাধ্যবাধকতাও আরোপ করা হয়েছে।

জ্বালানি সংকটের প্রভাব কেবল সড়কেই সীমাবদ্ধ নেই, এটি আঘাত হেনেছে শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতেও। গ্যাস সাশ্রয়ের লক্ষ্যে দেশের পাঁচটি সার কারখানার মধ্যে চারটির উৎপাদন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। জাতীয় গ্রিডে এলএনজি সরবরাহ কমিয়ে দেওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে চড়া মূল্যে জ্বালানি কেনার চেষ্টা করা হলেও সরবরাহকারী দেশগুলোর অনীহার কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না। এমনকি চীনও তাদের পরিশোধিত তেলের রপ্তানি সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে।

এই ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট বা সংকট ব্যবস্থাপনায় সরকার সর্বোচ্চ কৃচ্ছ্রসাধনের নীতি গ্রহণ করেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজের দপ্তরে এসি ও বাতি বন্ধ রেখে মিতব্যয়িতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। মন্ত্রীদের যাতায়াতে গাড়ি ভাগাভাগি করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সরকারি অফিসগুলোতে আলোকসজ্জা পরিহার ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বর্তমান পরিস্থিতিকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের চেয়েও ভয়াবহ হিসেবে উল্লেখ করে দেশবাসীকে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়েছেন।

অর্থনৈতিকভাবেও বাংলাদেশ এক কঠিন সময় পার করছে। রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের ঘাটতি, বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ এবং টানা সাত মাস ধরে রপ্তানি আয় কমে যাওয়া দেশের অর্থনীতিকে দুর্বল করে ফেলেছে। এর ওপর জ্বালানি সংকটের কারণে কৃষি উৎপাদন ও পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা ব্যাহত হলে বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে বাংলাদেশের জন্য সামনের দিনগুলো আরও চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠবে। এই বহুমুখী সংকট কতটা দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করা সম্ভব হয়, তার ওপরই নির্ভর করছে দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা।