ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ শীর্ষস্থানীয় অর্ধশতাধিক সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বকে হত্যার পর ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের ধারণা ছিল, তেহরানের পতন এখন কেবল সময়ের ব্যাপার। মার্কিন ও ইসরাইলি নীতিনির্ধারকরা ভেবেছিলেন, প্রচণ্ড হামলায় বিপর্যস্ত হয়ে ইরান দ্রুত আত্মসমর্পণ করবে কিংবা অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহে সরকার ক্ষমতাচ্যুত হবে। কিন্তু যুদ্ধের দ্বিতীয় সপ্তাহে এসে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। প্রবল চাপের মুখেও নতি স্বীকার না করে অসীম সাহসিকতার সঙ্গে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে পাঁচ হাজার বছরের প্রাচীন সভ্যতার এই দেশটি।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই অসম যুদ্ধ আজ দ্বিতীয় সপ্তাহে পদার্পণ করেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরান তার আত্মমর্যাদা রক্ষায় সর্বশক্তি দিয়ে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। নিউ ইয়র্ক টাইমসের আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক ঈশান থারুরের মতে, শীর্ষ নেতৃত্বকে হত্যার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল একটি বড় ধরনের ‘কৌশলগত জুয়া’ খেলেছে। এই হামলায় আঞ্চলিক অস্থিরতা বাড়লেও যুদ্ধে শেষ পর্যন্ত কারা জয়ী হবে, তা নিয়ে বড় ধরনের সংশয় দেখা দিয়েছে। থারুর মনে করেন, তেহরান হয়তো প্রথাগত যুদ্ধে সরাসরি জয়ী হতে পারবে না, তবে তারা এই সংঘাতের আঁচ পুরো মধ্যপ্রাচ্যসহ প্রতিপক্ষের শিবিরে ছড়িয়ে দেওয়ার সক্ষমতা রাখে।
ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র দাবি করছে যে, তাদের বিমান হামলায় ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং সামরিক সক্ষমতা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানি কর্তৃপক্ষ আলোচনার প্রস্তাব দিলেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। তবে যুদ্ধের ময়দান বলছে অন্য কথা। ইসরাইলের অভ্যন্তরে এবং মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে নিয়মিত বিরতিতে ড্রোন ও মিসাইল হামলা চালিয়ে যাচ্ছে তেহরান। এতে প্রতিপক্ষ শিবিরে এক ধরনের নাজেহাল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ ড. এইচ এ হেলারের মতে, ইরান সরাসরি সম্মুখ সমরের চেয়ে যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করার কৌশল নিয়েছে। তাদের লক্ষ্য হলো প্রতিপক্ষের ওপর অর্থনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করা। ফ্রান্সের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ নিকোল গ্রাজেউস্কিও একই মত পোষণ করেন। তিনি জানান, ইরানের ড্রোন ও মিসাইল হামলার লক্ষ্য কেবল ক্ষয়ক্ষতি করা নয়, বরং প্রতিপক্ষের অস্ত্র ভাণ্ডার ও মনোবল ক্ষয় করা। এই কৌশলের ফলে ইসরাইলের বিশাল জনগোষ্টী এখন ঘরবাড়ি ছেড়ে বাঙ্কারে আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছে।
প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের তথ্যমতে, ইরানের ভাণ্ডারে এখনো আড়াই হাজারের বেশি অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং প্রায় ৮০ হাজার ড্রোন রয়েছে। গত আট দিনে তারা এই বিশাল মজুতের সামান্যই ব্যবহার করেছে। এছাড়া হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার মাধ্যমে ইরান বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করেছে। বিশ্বের ২০ শতাংশ জ্বালানি তেল এই পথ দিয়ে সরবরাহ হয়, যা বর্তমানে কার্যত বন্ধ।
সামরিক সক্ষমতার দিক থেকে ইরান মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম শক্তিশালী দেশ। ‘মিলিটারি ব্যালেন্স ২০২৫’-এর তথ্য অনুযায়ী, ইরানের প্রায় ছয় লাখ ১০ হাজার নিয়মিত সেনা রয়েছে, যার মধ্যে এলিট ফোর্স আইআরজিসির সংখ্যাই প্রায় দুই লাখ। এর বাইরে হুতি, হিজবুল্লাহ ও হামাসের মতো অভিজ্ঞ আঞ্চলিক মিত্ররা ইরানের পক্ষে এই লড়াইয়ে সক্রিয় রয়েছে।
আন্তর্জাতিক মহলেও এই যুদ্ধ নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ এই আক্রমণকে ‘অবৈধ’ ও ‘বড় ভুল’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রেডরিখ মেৎস সতর্ক করে বলেছেন, ইরানকে প্রক্সি যুদ্ধের ক্ষেত্র বানানো হলে বৈশ্বিক নিরাপত্তা চরম ঝুঁকিতে পড়বে। এদিকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান প্রতিবেশী দেশগুলোকে আশ্বস্ত করে বলেছেন, তাদের ভূখণ্ড ব্যবহার করে হামলা না চালানো হলে তারা নিরাপদ থাকবে।
পরিশেষে, নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ওয়াশিংটন ও তেল আবিব ইরানকে মূল্যায়নে বড় ধরনের ভুল করেছে। ইরান কেবল একটি রাষ্ট্র নয়, বরং এটি একটি আদর্শিক ও জাতীয়তাবাদী চেতনার ধারক। কয়েক দশকের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে ইরানের মতো এত সুসংগঠিত সামরিক শক্তির মুখোমুখি হতে হয়নি। আন্তর্জাতিক বৈধতাহীন এই যুদ্ধ প্রতিপক্ষের জন্য শেষ পর্যন্ত আত্মঘাতী হয়ে উঠতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
রিপোর্টারের নাম 
























