আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ সনদকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলকে সঙ্গে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান এবং দেশটির শীর্ষ নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে পরিচালিত হত্যাকাণ্ড বিশ্ব রাজনীতিতে এক চরম অস্থিরতার সূচনা করেছে। একই সময়ে ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রপ্রধানকে সস্ত্রীক অপহরণের মতো চাঞ্চল্যকর ঘটনা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের স্থিতিশীলতাকে খাদের কিনারে ঠেলে দিয়েছে। একক কোনো রাষ্ট্রের এমন একতরফা শক্তি প্রয়োগ আধুনিক বিশ্বব্যবস্থায় কেবল সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘনই নয়, বরং এক ভয়াবহ অরাজকতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির মাধ্যমে ‘অন্তহীন যুদ্ধ’ বন্ধের যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, বর্তমান পরিস্থিতি তার সম্পূর্ণ বিপরীত। যদিও তার সময়ে আফগানিস্তান ও ইরাক থেকে সেনা প্রত্যাহার এবং তালেবানের সঙ্গে আলোচনা এক ধরনের যুদ্ধ-বিরোধী আবহ তৈরি করেছিল, কিন্তু ইরানের ক্ষেত্রে তার ‘ম্যাক্সিমাম প্রেসার’ বা সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগের নীতি শুরু থেকেই ছিল মারমুখী। ২০১৮ সালে পারমাণবিক চুক্তি থেকে সরে আসা এবং ২০২০ সালে জেনারেল কাসেম সোলাইমানিকে হত্যার মাধ্যমে যে উত্তেজনার বীজ বপন করা হয়েছিল, তা আজ পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের রূপ নিয়েছে।
দ্বিতীয় মেয়াদে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি আরও বেশি আক্রমণাত্মক হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ভেনেজুয়েলায় শাসন পরিবর্তনের চেষ্টা থেকে শুরু করে কিউবা ও কলম্বিয়ার নেতৃত্বকে হুমকির মুখে ফেলা—সবই এক বৃহৎ সংঘাতের ইঙ্গিত দেয়। ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা এবং দেশটির শীর্ষ নেতৃত্বকে লক্ষ্যবস্তু করার প্রতিক্রিয়ায় তেহরানও পাল্টা আঘাত হেনেছে মার্কিন ও ইসরায়েলি সামরিক ঘাঁটিতে। এই পাল্টা হামলার চক্রে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাধারণ মানুষ। বৈশ্বিক এই সংকটে আরব দেশগুলোর একাংশ ওয়াশিংটনের পক্ষ নিলেও ইরান কার্যত একাই প্রতিরোধ গড়ে তুলছে। চীন ও রাশিয়ার আহ্বান উপেক্ষা করে সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ার ফলে অনেকেই এখন তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কা করছেন।
ইতিহাস সাক্ষী দিচ্ছে, সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে কোনো দেশে শাসন পরিবর্তন করা গেলেও সেখানে টেকসই শান্তি আনা প্রায় অসম্ভব। ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণ করে সাদ্দাম হোসেনকে উৎখাত করা হলেও দেশটি দীর্ঘ গৃহযুদ্ধ ও জঙ্গিবাদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছিল। আফগানিস্তানে দুই দশকের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ এবং ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয়ের পর শেষ পর্যন্ত ক্ষমতা সেই তালেবানের হাতেই ফিরে গেছে। লিবিয়া ও সিরিয়ার বর্তমান চিত্রও একই কথা বলে—রাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙে দেওয়া সহজ, কিন্তু নতুন করে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া।
ইরানের ক্ষেত্রে এই যুদ্ধের ঝুঁকি বহুগুণ বেশি। ৮৫ মিলিয়নের বিশাল জনসংখ্যা, শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র বাহিনী এবং হিজবুল্লাহ, হুথি ও ইরাকি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিশাল নেটওয়ার্ক এই সংঘাতকে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে দিতে পারে। ভৌগোলিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালি’ যদি এই যুদ্ধের কারণে অবরুদ্ধ হয়, তবে বিশ্ববাজারে তেলের দাম আকাশচুম্বী হবে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে যে অর্থনৈতিক মন্দা ও মুদ্রাস্ফীতি দেখা দেবে, তা সামলানো কোনো একক শক্তির পক্ষে সম্ভব হবে না। এছাড়া ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ব্যাপ্তি ও এর সুরক্ষিত অবস্থান এই সংকটকে আরও বেশি সংবেদনশীল করে তুলেছে।
মানবিক ও অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে দেখা যায়, যুদ্ধের কোনো জয়ী পক্ষ নেই। তেহরানের মতো জনবহুল জনপদে বোমাবর্ষণ মানেই লাখ লাখ মানুষের মৃত্যু ও শরণার্থী সংকট। আরব রাষ্ট্রগুলোর জন্য এটি এক চরম সতর্কবার্তা। আজ যদি ইরান আক্রান্ত হয়, তবে কাল যে অন্য কোনো আরব দেশ লক্ষ্যবস্তু হবে না, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। তাই মুসলিম উম্মাহর ঐক্য এবং আঞ্চলিক সংহতিই হতে পারে এই আগ্রাসন রোখার একমাত্র পথ। প্রকৃত নেতৃত্ব কেবল যুদ্ধজয়ে নয়, বরং দূরদর্শিতার মাধ্যমে যুদ্ধ এড়ানোর মধ্যেই নিহিত। শান্তি কোনো দুর্বলতা নয়, বরং এক স্থিতিশীল পৃথিবীর জন্য এটিই সবচেয়ে সাহসী ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত।
রিপোর্টারের নাম 

























