ঢাকা ০৪:৪১ অপরাহ্ন, শনিবার, ০৭ মার্চ ২০২৬

মাদারীপুরে মামলার বলি সেচপাম্প: শুকিয়ে যাচ্ছে ৫০ বিঘা বোরো ধান, পথে বসার শঙ্কায় অর্ধশত কৃষক

মাদারীপুর সদর উপজেলার কালিকাপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ দুধখালী গ্রামে তুচ্ছ একটি মারামারির ঘটনাকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট মামলার জেরে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে সেচপাম্প। এর ফলে পানির অভাবে ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছে প্রায় অর্ধশত বিঘা জমির বোরো ধানের ক্ষেত। প্রচণ্ড খরা ও রোগাক্রান্ত হয়ে ফসল নষ্ট হওয়ায় চরম ক্ষতির মুখে পড়েছেন গ্রামের অর্ধশত কৃষক। দ্রুত প্রশাসনের মাধ্যমে সেচের ব্যবস্থা করে ফসল বাঁচানোর আকুতি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।

দক্ষিণ দুধখালী গ্রামের হাওরের জমিতে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পানির অভাবে মাঠজুড়ে বড় বড় ফাটল ধরেছে, হলুদ বর্ণ ধারণ করে মরে যাচ্ছে ধানের চারা। এমন দৃশ্য দেখে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন নিজাম মুন্সির মা হালিমা খাতুন ও স্ত্রী সোনিয়া আক্তার। অন্যের এক বিঘা জমি বর্গা নিয়ে ধান চাষ করেছিলেন তারা। এই জমির ধান দিয়েই সারা বছর তাদের পুরো পরিবারের আহারের সংস্থান হয়। কিন্তু মারামারির একটি মামলাকে কেন্দ্র করে প্রায় ১২-১৩ দিন আগে জমিতে সেচপাম্প বন্ধ করে দেয় প্রতিপক্ষ। এরপর থেকে আর জমিতে পানি দেওয়া হয়নি, ফলে ফলন্ত ধানক্ষেত এখন পুড়ে যাওয়ার উপক্রম। দ্রুত এই সমস্যার সমাধান করে তাদের ‘সোনার ফসলে’ পানি দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন নিজাম মুন্সির পরিবার।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ২৪ ফেব্রুয়ারি রাত সোয়া ৯টার দিকে দক্ষিণ দুধখালী মুন্সিবাড়ী জামে মসজিদের সংস্কার কাজ নিয়ে স্থানীয় আলমগীর মুন্সির সঙ্গে একই এলাকার সিদ্দিক মুন্সী, কামাল মুন্সিসহ কয়েকজনের বাগবিতণ্ডা ও মারামারির ঘটনা ঘটে। এ ঘটনার জের ধরে পরদিন ২৫ ফেব্রুয়ারি আলমগীর মুন্সি বাদী হয়ে মাদারীপুর সদর থানায় ৮ জনের নাম উল্লেখসহ আরও ৮-৯ জনকে অজ্ঞাত আসামি করে একটি মামলা দায়ের করেন। মামলার পরই আলমগীর মুন্সির লোকজন জোরপূর্বক দক্ষিণ দুধখালী হাওরের প্রায় অর্ধশত বিঘা জমির সেচপাম্পটি ভেঙে ফেলে বলে অভিযোগ করেন কৃষকরা। এরপর থেকে এসব জমিতে পানি দেওয়া বন্ধ হয়ে যায়। যার কারণে তীব্র খরা ও অনাবৃষ্টিতে প্রায় প্রতিটি জমির ধান হলুদ হয়ে মরে যাচ্ছে। প্রতি বছর এসব জমিতে অন্তত এক থেকে দেড় হাজার মণ বোরো ধান উৎপাদন হয়, যা এ বছর পুরোটাই নষ্ট হওয়ার উপক্রম।

কৃষক নিজাম মুন্সির স্ত্রী সোনিয়া আক্তার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমরা স্বামী-স্ত্রী মিলে পরের এক বিঘা জমি বর্গা নিয়ে আবাদ করেছি। ধানও বেশ ভালো হয়েছিল। কিন্তু গত ১২-১৩ দিন ধরে পানি দিতে না পারায় সব ধান মরে যাচ্ছে। আর কয়েকদিন এমন থাকলে ধানের আর কোনো আশা থাকবে না। মামলা-হামলা হতেই পারে, কিন্তু তাই বলে ধানের পানি দেওয়া কেন বন্ধ করে দিল? এটা আমাদের পেটে লাথি মারার শামিল। আমরা প্রশাসনের কাছে এর বিচার চাই।”

একই গ্রামের আরেক কৃষক কামাল মুন্সি বলেন, “মামলার পর সেচপাম্পটি ভেঙে ফেলা হয়েছে। উল্টো আমাদের চাষিদের নামে মামলা দিয়ে গ্রামছাড়া করা হয়েছে, যে কারণে আমরা জমিতে আসতেও পারি না, সেচপাম্পও মেরামত করতে পারি না। এভাবে ফলন্ত ধানগুলোকে মেরে ফেলা হচ্ছে। আমাদের মুখে ভাত দেওয়ার আর কোনো ব্যবস্থা রইলো না। পুলিশ প্রশাসনের কাছে দাবি, মামলা হলে আদালতে বিচার হোক, কিন্তু ধানের পানি দেওয়ার ব্যবস্থা করা হোক।”

এ বিষয়ে মাদারীপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল কালাম আজাদ বলেন, “মামলা হলেই যে সেচপাম্প বন্ধ করে দেবে, বিষয়টি এমন নয়। সেচপাম্প বন্ধের ঘটনাটি আমার জানা নেই। তবে যেভাবেই হোক ধানের ক্ষতি যেন না হয়, সে বিষয়ে আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি। ফসল নষ্ট করার অধিকার কারোই নেই। যারা এই কাজ করেছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

এদিকে, মামলার বাদী আলমগীর হোসেন এ বিষয়ে গণমাধ্যমে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি দাবি করেছেন, বিষয়টি পুলিশ ও আদালত বুঝবে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

কায়রোর মুইজ স্ট্রিট: রমজানের রাতে প্রাণবন্ত ঐতিহ্যের মেলা

মাদারীপুরে মামলার বলি সেচপাম্প: শুকিয়ে যাচ্ছে ৫০ বিঘা বোরো ধান, পথে বসার শঙ্কায় অর্ধশত কৃষক

আপডেট সময় : ০২:৪১:০৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ৭ মার্চ ২০২৬

মাদারীপুর সদর উপজেলার কালিকাপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ দুধখালী গ্রামে তুচ্ছ একটি মারামারির ঘটনাকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট মামলার জেরে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে সেচপাম্প। এর ফলে পানির অভাবে ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছে প্রায় অর্ধশত বিঘা জমির বোরো ধানের ক্ষেত। প্রচণ্ড খরা ও রোগাক্রান্ত হয়ে ফসল নষ্ট হওয়ায় চরম ক্ষতির মুখে পড়েছেন গ্রামের অর্ধশত কৃষক। দ্রুত প্রশাসনের মাধ্যমে সেচের ব্যবস্থা করে ফসল বাঁচানোর আকুতি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।

দক্ষিণ দুধখালী গ্রামের হাওরের জমিতে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পানির অভাবে মাঠজুড়ে বড় বড় ফাটল ধরেছে, হলুদ বর্ণ ধারণ করে মরে যাচ্ছে ধানের চারা। এমন দৃশ্য দেখে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন নিজাম মুন্সির মা হালিমা খাতুন ও স্ত্রী সোনিয়া আক্তার। অন্যের এক বিঘা জমি বর্গা নিয়ে ধান চাষ করেছিলেন তারা। এই জমির ধান দিয়েই সারা বছর তাদের পুরো পরিবারের আহারের সংস্থান হয়। কিন্তু মারামারির একটি মামলাকে কেন্দ্র করে প্রায় ১২-১৩ দিন আগে জমিতে সেচপাম্প বন্ধ করে দেয় প্রতিপক্ষ। এরপর থেকে আর জমিতে পানি দেওয়া হয়নি, ফলে ফলন্ত ধানক্ষেত এখন পুড়ে যাওয়ার উপক্রম। দ্রুত এই সমস্যার সমাধান করে তাদের ‘সোনার ফসলে’ পানি দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন নিজাম মুন্সির পরিবার।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ২৪ ফেব্রুয়ারি রাত সোয়া ৯টার দিকে দক্ষিণ দুধখালী মুন্সিবাড়ী জামে মসজিদের সংস্কার কাজ নিয়ে স্থানীয় আলমগীর মুন্সির সঙ্গে একই এলাকার সিদ্দিক মুন্সী, কামাল মুন্সিসহ কয়েকজনের বাগবিতণ্ডা ও মারামারির ঘটনা ঘটে। এ ঘটনার জের ধরে পরদিন ২৫ ফেব্রুয়ারি আলমগীর মুন্সি বাদী হয়ে মাদারীপুর সদর থানায় ৮ জনের নাম উল্লেখসহ আরও ৮-৯ জনকে অজ্ঞাত আসামি করে একটি মামলা দায়ের করেন। মামলার পরই আলমগীর মুন্সির লোকজন জোরপূর্বক দক্ষিণ দুধখালী হাওরের প্রায় অর্ধশত বিঘা জমির সেচপাম্পটি ভেঙে ফেলে বলে অভিযোগ করেন কৃষকরা। এরপর থেকে এসব জমিতে পানি দেওয়া বন্ধ হয়ে যায়। যার কারণে তীব্র খরা ও অনাবৃষ্টিতে প্রায় প্রতিটি জমির ধান হলুদ হয়ে মরে যাচ্ছে। প্রতি বছর এসব জমিতে অন্তত এক থেকে দেড় হাজার মণ বোরো ধান উৎপাদন হয়, যা এ বছর পুরোটাই নষ্ট হওয়ার উপক্রম।

কৃষক নিজাম মুন্সির স্ত্রী সোনিয়া আক্তার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমরা স্বামী-স্ত্রী মিলে পরের এক বিঘা জমি বর্গা নিয়ে আবাদ করেছি। ধানও বেশ ভালো হয়েছিল। কিন্তু গত ১২-১৩ দিন ধরে পানি দিতে না পারায় সব ধান মরে যাচ্ছে। আর কয়েকদিন এমন থাকলে ধানের আর কোনো আশা থাকবে না। মামলা-হামলা হতেই পারে, কিন্তু তাই বলে ধানের পানি দেওয়া কেন বন্ধ করে দিল? এটা আমাদের পেটে লাথি মারার শামিল। আমরা প্রশাসনের কাছে এর বিচার চাই।”

একই গ্রামের আরেক কৃষক কামাল মুন্সি বলেন, “মামলার পর সেচপাম্পটি ভেঙে ফেলা হয়েছে। উল্টো আমাদের চাষিদের নামে মামলা দিয়ে গ্রামছাড়া করা হয়েছে, যে কারণে আমরা জমিতে আসতেও পারি না, সেচপাম্পও মেরামত করতে পারি না। এভাবে ফলন্ত ধানগুলোকে মেরে ফেলা হচ্ছে। আমাদের মুখে ভাত দেওয়ার আর কোনো ব্যবস্থা রইলো না। পুলিশ প্রশাসনের কাছে দাবি, মামলা হলে আদালতে বিচার হোক, কিন্তু ধানের পানি দেওয়ার ব্যবস্থা করা হোক।”

এ বিষয়ে মাদারীপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল কালাম আজাদ বলেন, “মামলা হলেই যে সেচপাম্প বন্ধ করে দেবে, বিষয়টি এমন নয়। সেচপাম্প বন্ধের ঘটনাটি আমার জানা নেই। তবে যেভাবেই হোক ধানের ক্ষতি যেন না হয়, সে বিষয়ে আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি। ফসল নষ্ট করার অধিকার কারোই নেই। যারা এই কাজ করেছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

এদিকে, মামলার বাদী আলমগীর হোসেন এ বিষয়ে গণমাধ্যমে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি দাবি করেছেন, বিষয়টি পুলিশ ও আদালত বুঝবে।