## ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের পথে অন্তরায়
ঢাকা: মুসলিম বিশ্বের ঐক্যের আহ্বান আজ এক বিদ্রূপে পরিণত হয়েছে। যেখানে সংহতির কথা বলা হচ্ছে, সেখানে মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে ঘটছে রক্তক্ষয়ী সংঘাত। পবিত্র রমজান মাসে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যেকার সাম্প্রতিক সংঘর্ষ মুসলিম ঐক্যের ধারণাকে আরও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। গত অর্ধ শতাব্দী ধরে মুসলিম দেশগুলোর মধ্যকার এই সংঘাত কেবল ঐক্যের পথকেই সুগম করেনি, বরং তা ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
ঐক্যের বদলে সংঘাতের চিত্র
বিগত ৫০ বছরে যত যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে, তার অধিকাংশই ঘটেছে মুসলিম দেশগুলোর অভ্যন্তরে অথবা মুসলিম দেশগুলোর ওপর অমুসলিম পরাশক্তির আক্রমণে। উভয় ক্ষেত্রেই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মুসলমানরা। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা এবং পরবর্তী ১০ মাসের যুদ্ধ মুসলিম ভাইদের ওপর মুসলিমদের অত্যাচারের এক মর্মান্তিক দৃষ্টান্ত। সেই একই পাকিস্তান আজ আরেক মুসলিম দেশ আফগানিস্তানের সঙ্গে সংঘাতে লিপ্ত। অথচ ইসলামে এক মুসলিম কর্তৃক অন্য মুসলিমকে সামান্যতম কষ্ট দেওয়ারও অনুমতি নেই, সেখানে হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি তো দূরের কথা। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘ঈমানদারগণ পরস্পরের ভাই।’ (সুরা হুজুরাত, আয়াত-১০)।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও বেদনাবিধুর স্মৃতি
মুসলিম উম্মাহর বেদনাদায়ক পরিণতির অনেক উদাহরণ আমাদের সামনে রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলো ইসরাইলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিজ দেশে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করতে দিয়েছে, অথচ ইসরাইল বছরের পর বছর ধরে ফিলিস্তিনিদের ওপর নির্মম নির্যাতন চালিয়ে আসছে। ১৯৮০ সালের ইরান-ইরাক যুদ্ধ, যা দীর্ঘ আট বছর ধরে চলেছিল, লক্ষাধিক মুসলিমের প্রাণহানি ঘটিয়েছিল। এই যুদ্ধ সীমান্ত বিরোধের অজুহাতে শুরু হয়েছিল।
যুদ্ধ শেষ হওয়ার মাত্র দুই বছরের মাথায় ইরাক কুয়েত দখল করে নেয়, যা প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধের জন্ম দেয়। পরবর্তীতে ২০০৩ সালে ইরাকের ওপর মার্কিন আগ্রাসন দেশটির অর্থনীতি ও সমাজব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দেয়। এই ঘটনাগুলো মূলত ইসরাইলের প্রভাব বিস্তারে সহায়তা করেছে।
ইয়েমেনে সৌদি আরব ও হুথি বিদ্রোহীদের মধ্যেকার দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতও মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের জন্য এক গভীর ক্ষত। এই পরিস্থিতিতে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যেকার যুদ্ধ মুসলিম ঐক্যের জন্য এক দুঃসংবাদ। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই দুই দেশের যুদ্ধের পরপরই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যৌথভাবে ইরানে আক্রমণ করেছে, যা এই সংঘাতকে আরও জটিল করে তুলেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ইন্ধনের প্রশ্ন
আফগানিস্তানের তালেবান নেতৃবৃন্দের ইরান আক্রান্ত হলে তাদের পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণার পর পাকিস্তান-আফগানিস্তান যুদ্ধের নেপথ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো ইন্ধন আছে কিনা, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানকে সমর্থন দিয়েছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ইসরাইল ও সৌদি আরবের চাপে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে আক্রমণ চালিয়েছে বলে খবর প্রকাশিত হচ্ছে।
সীমান্ত বিরোধ এবং টিটিপি ও বালুচ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ নিয়ে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে উত্তেজনা চলছিল। আফগানিস্তানের তালেবান সরকার ব্রিটিশ নির্ধারিত সীমারেখা না মানার পাশাপাশি পাকিস্তানের পশতু ভাষাভাষী অঞ্চলকে আফগানিস্তানের অংশ বলে দাবি করে আসছে।
কুরআন ও হাদিসের আলোকে ঐক্যের অপরিহার্যতা
মহান আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘ঈমানদাররা পরস্পরের ভাই।’ (সুরা হুজুরাত, আয়াত-১০)। তাই দুই মুসলিম দেশের মধ্যকার যুদ্ধ ও রক্তপাত সম্পূর্ণ অবৈধ ও হারাম। হাদিস শরিফে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘একজন মুসলমান অন্য মুসলমানের ভাই। সে তার ওপর কোনো রূপ অত্যাচার করতে পারে না এবং অন্য কারো করুণার ওপর ছেড়েও দিতে পারে না। যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের কোনো প্রয়োজন মেটাতে ব্যস্ত থাকে, আল্লাহ তার প্রয়োজন মিটিয়ে দেন। যে ব্যক্তি তার মুসলমান ভাইয়ের সংকট মোচনে সাহায্য করে, আল্লাহ তাকে তার সংকটসমূহ বিচার দিবসে মোচন করবেন। এবং যে ব্যক্তি কোনো মুসলমানের দোষ গোপন করবে, আল্লাহ বিচার দিবসে তার দোষ গোপন করবেন।’ (বুখারি, হাদিস-২৪৪২)।
রাসুল (সা.) আরো বলেছেন, ‘পরিপূর্ণ ঈমানদার না হয়ে তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না; আর পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা না থাকলে তোমরা পরিপূর্ণ ঈমানদার হতে পারবে না।’ (মুসলিম, হাদিস-৫৪)। ‘পাপ হিসেবে এটাই যথেষ্ট যে, একজন মুসলমান তার ভাইকে উপেক্ষার চোখে দেখে। একজন মুসলমানের জীবন, সম্পদ ও সম্মান অপর মুসলমানের জন্য সম্পূর্ণরূপে অলঙ্ঘনীয় এবং পবিত্র।’ (মুসলিম, হাদিস-২৫৬৪)।
ঐক্য এখন সময়ের দাবি
ব্যক্তি, সমষ্টি ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে এই বিধান অমান্য করার ফলেই মুসলিম উম্মাহর ঐক্য আজ কেবল একটি আপ্তবাক্য হিসেবেই রয়ে গেছে। শুধু দুই মুসলিম দেশের মধ্যকার যুদ্ধ নয়, বরং মুসলিম দেশগুলোর শাসকরা যখন অন্যায়ভাবে জনগণের ওপর অত্যাচার-নির্যাতন চালায় এবং ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে হত্যাকাণ্ড পরিচালনা করে, তাও আল্লাহর বিধান অনুযায়ী হারাম। বাংলাদেশে জুলাই বিপ্লবের সময় আমরা এর কিছু চিত্র দেখেছি।
তাই, এই প্রেক্ষাপটে মুসলিম উম্মাহর ঐক্য আজ অত্যন্ত জরুরি। এই ঐক্য কেবল শান্তি ও সমৃদ্ধিই আনবে না, বরং মুসলিম বিশ্বকে বহিঃশক্তির ষড়যন্ত্র থেকে রক্ষা করবে।
রিপোর্টারের নাম 

























