মোবাইল অ্যাপ ডাউনলোড করুন
ঢাকা ০৫:১১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৬ অগাস্ট ২০২৬

থানায় ঘুষের টাকা ফেরত চাইতে গিয়ে রক্তাক্ত মা-মেয়ে

## শিরোনাম: ঘুষের টাকা ফেরত চাওয়ায় মা-মেয়েকে থানায় মারধর, কারাদণ্ড!

কক্সবাজার: পেকুয়া থানায় ঘুষের টাকা ফেরত চাইতে গিয়ে এক কলেজছাত্রী ও তার মা বেধড়ক মারধরের শিকার হয়েছেন। অভিযোগ উঠেছে, থানার ভেতরেই এসআই ও তার সহযোগীরা তাদের আটকে রেখে শারীরিক নির্যাতন চালান। ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) ডেকে এনে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে মা-মেয়েকে এক মাসের কারাদণ্ড দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে।

বিস্তারিত:

বুধবার (গতকাল) বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে কক্সবাজারের পেকুয়া থানায় চাঞ্চল্যকর এই ঘটনা ঘটে। ঘটনার শিকার দুই নারী হলেন চকরিয়া সরকারি কলেজের অর্থনীতির অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী জুবাইদা বেগম (২১) এবং তার মা রেহেনা মোস্তফা রানু (৪২)। তাদের বাড়ি পেকুয়া সদর ইউনিয়নের সরকারি ঘোনা এলাকায়।

প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, মামলার তদন্তের পক্ষে রিপোর্ট দেওয়ার কথা বলে পেকুয়া থানার এসআই পল্লব কুমার ঘোষ ২০ হাজার টাকা ঘুষ নেন। কিন্তু পরবর্তীতে তিনি জুবাইদার বিপক্ষে প্রতিবেদন জমা দেন। এই টাকা ফেরত চাওয়ার জন্যই জুবাইদা ও তার মা থানায় গিয়েছিলেন।

প্রত্যক্ষদর্শী মনজিলা বেগম (৬০) সাংবাদিকদের বলেন, “আমি জুবাইদা ও তার মায়ের সঙ্গে থানায় গিয়েছিলাম। মামলার তদন্ত নিয়ে তাদের কথা বলতে শুনছিলাম। তখন শুনি, এসআই পল্লব ২০ হাজার টাকা নিয়েছেন কিন্তু উল্টো রিপোর্ট দিয়েছেন। তাই জুবাইদা টাকা ফেরত চাইছিল।” তিনি আরও জানান, টাকা ফেরত চাওয়ার সময় এসআই পল্লব হঠাৎ রেগে গিয়ে মা-মেয়েকে চড়-থাপ্পড় মারতে শুরু করেন। পরে মহিলা পুলিশ এসে তাদের মারধর করে থানার গেট পর্যন্ত নিয়ে যায়। এরপর থানার ভেতর থেকে অন্য সবাইকে বের করে দিয়ে মা-মেয়েকে বেধড়ক মারধর করা হয়।

ভুক্তভোগী জুবাইদার খালা আমেনা বেগম জানান, সোনার গয়না বন্ধক রেখে ২০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছিল। এরপরও উল্টো রিপোর্ট দেওয়া হয়। তিনি বলেন, “টাকা ফেরত চাইতে আমার বোন ও ভাগনি থানায় গিয়েছিল। থানার এসআই পল্লব ক্ষিপ্ত হয়ে মা-মেয়েকে মারধর করেন। এতে তারা গুরুতর আহত হন। পরে বিষয়টি আড়াল করতে ইউএনওকে ডেকে এনে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাদের এক মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।”

বৃহস্পতিবার দুপুরে কক্সবাজার জেলা কারাগারে মা ও মেয়ের সঙ্গে দেখা করেন আমেনা বেগম। তিনি জানান, রেহেনা মোস্তফার মুখ ও চোখে গভীর জখমের চিহ্ন রয়েছে। জুবাইদার বাহু, থুতনি ও বুকেও স্পষ্ট আঘাতের দাগ দেখা গেছে। জেলা কারাগারের একটি সূত্রও নিশ্চিত করেছে যে, পুলিশ মা-মেয়েকে কারাগারে আনার সময় তাদের শরীরে আঘাতের চিহ্ন ছিল। প্রথমে তাদের চিকিৎসার জন্য পাঠানো হলেও, পরে ম্যাজিস্ট্রেটের সাক্ষ্য ও সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসাসংক্রান্ত কাগজপত্রের ভিত্তিতে তাদের কারাগারে গ্রহণ করা হয়।

এ বিষয়ে পেকুয়া থানা পুলিশ অবশ্য ভিন্ন দাবি করেছে। পেকুয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খাইরুল আলম বলেছেন, “মা-মেয়ে থানায় এসে পুলিশের ওপর হামলা চালিয়েছে। ঘুষের বিষয়টি সঠিক নয়।” পেকুয়া থানার এসআই পল্লব কুমার ঘোষও মারধর ও ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

অন্যদিকে, কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নাজমুল সাকিব সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, মা-মেয়েসহ কয়েকজন পুলিশ সদস্যকে মারধর করেছে বলে থানা থেকে জানানো হয়েছে। তিনি বলেন, “সিসিটিভি ফুটেজ দেখে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।”

পেকুয়ার ইউএনও মাহবুবুল আলম গণমাধ্যমকে জানান, “তখন পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল। সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে মা-মেয়েকে এক মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।”

তবে, ঘটনাটির সূত্রপাত সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ থেকে বলে জানা গেছে। জুবাইদার বাবা ২০১৩ সালে মারা যান এবং আইন অনুযায়ী তিনি তার বাবার সম্পত্তির উত্তরাধিকারী। সম্পত্তির অংশ চাওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে জুবাইদার দাদার বাড়ির লোকজন তার পিতৃপরিচয় অস্বীকার করে আসছে এবং ইউনিয়ন পরিষদ থেকেও তাকে ওয়ারিশ সনদ দেওয়া হয়নি। পরিবারের অভিযোগ, স্থানীয় নারী ইউপি সদস্য বিজু (জুবাইদার ফুফু) এক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করেছেন। সম্পত্তির অধিকার ফিরে পেতে জুবাইদা আইনের আশ্রয় নিলে মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব পান এসআই পল্লব।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

শরীয়তপুরে জুলাই অভ্যুত্থান দিবসের অনুষ্ঠানে বিশৃঙ্খলা, জুলাই যোদ্ধাদের লাঞ্ছিত করার অভিযোগ

থানায় ঘুষের টাকা ফেরত চাইতে গিয়ে রক্তাক্ত মা-মেয়ে

আপডেট সময় : ১০:২৭:০৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৬ মার্চ ২০২৬

## শিরোনাম: ঘুষের টাকা ফেরত চাওয়ায় মা-মেয়েকে থানায় মারধর, কারাদণ্ড!

কক্সবাজার: পেকুয়া থানায় ঘুষের টাকা ফেরত চাইতে গিয়ে এক কলেজছাত্রী ও তার মা বেধড়ক মারধরের শিকার হয়েছেন। অভিযোগ উঠেছে, থানার ভেতরেই এসআই ও তার সহযোগীরা তাদের আটকে রেখে শারীরিক নির্যাতন চালান। ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) ডেকে এনে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে মা-মেয়েকে এক মাসের কারাদণ্ড দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে।

বিস্তারিত:

বুধবার (গতকাল) বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে কক্সবাজারের পেকুয়া থানায় চাঞ্চল্যকর এই ঘটনা ঘটে। ঘটনার শিকার দুই নারী হলেন চকরিয়া সরকারি কলেজের অর্থনীতির অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী জুবাইদা বেগম (২১) এবং তার মা রেহেনা মোস্তফা রানু (৪২)। তাদের বাড়ি পেকুয়া সদর ইউনিয়নের সরকারি ঘোনা এলাকায়।

প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, মামলার তদন্তের পক্ষে রিপোর্ট দেওয়ার কথা বলে পেকুয়া থানার এসআই পল্লব কুমার ঘোষ ২০ হাজার টাকা ঘুষ নেন। কিন্তু পরবর্তীতে তিনি জুবাইদার বিপক্ষে প্রতিবেদন জমা দেন। এই টাকা ফেরত চাওয়ার জন্যই জুবাইদা ও তার মা থানায় গিয়েছিলেন।

প্রত্যক্ষদর্শী মনজিলা বেগম (৬০) সাংবাদিকদের বলেন, “আমি জুবাইদা ও তার মায়ের সঙ্গে থানায় গিয়েছিলাম। মামলার তদন্ত নিয়ে তাদের কথা বলতে শুনছিলাম। তখন শুনি, এসআই পল্লব ২০ হাজার টাকা নিয়েছেন কিন্তু উল্টো রিপোর্ট দিয়েছেন। তাই জুবাইদা টাকা ফেরত চাইছিল।” তিনি আরও জানান, টাকা ফেরত চাওয়ার সময় এসআই পল্লব হঠাৎ রেগে গিয়ে মা-মেয়েকে চড়-থাপ্পড় মারতে শুরু করেন। পরে মহিলা পুলিশ এসে তাদের মারধর করে থানার গেট পর্যন্ত নিয়ে যায়। এরপর থানার ভেতর থেকে অন্য সবাইকে বের করে দিয়ে মা-মেয়েকে বেধড়ক মারধর করা হয়।

ভুক্তভোগী জুবাইদার খালা আমেনা বেগম জানান, সোনার গয়না বন্ধক রেখে ২০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছিল। এরপরও উল্টো রিপোর্ট দেওয়া হয়। তিনি বলেন, “টাকা ফেরত চাইতে আমার বোন ও ভাগনি থানায় গিয়েছিল। থানার এসআই পল্লব ক্ষিপ্ত হয়ে মা-মেয়েকে মারধর করেন। এতে তারা গুরুতর আহত হন। পরে বিষয়টি আড়াল করতে ইউএনওকে ডেকে এনে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাদের এক মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।”

বৃহস্পতিবার দুপুরে কক্সবাজার জেলা কারাগারে মা ও মেয়ের সঙ্গে দেখা করেন আমেনা বেগম। তিনি জানান, রেহেনা মোস্তফার মুখ ও চোখে গভীর জখমের চিহ্ন রয়েছে। জুবাইদার বাহু, থুতনি ও বুকেও স্পষ্ট আঘাতের দাগ দেখা গেছে। জেলা কারাগারের একটি সূত্রও নিশ্চিত করেছে যে, পুলিশ মা-মেয়েকে কারাগারে আনার সময় তাদের শরীরে আঘাতের চিহ্ন ছিল। প্রথমে তাদের চিকিৎসার জন্য পাঠানো হলেও, পরে ম্যাজিস্ট্রেটের সাক্ষ্য ও সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসাসংক্রান্ত কাগজপত্রের ভিত্তিতে তাদের কারাগারে গ্রহণ করা হয়।

এ বিষয়ে পেকুয়া থানা পুলিশ অবশ্য ভিন্ন দাবি করেছে। পেকুয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খাইরুল আলম বলেছেন, “মা-মেয়ে থানায় এসে পুলিশের ওপর হামলা চালিয়েছে। ঘুষের বিষয়টি সঠিক নয়।” পেকুয়া থানার এসআই পল্লব কুমার ঘোষও মারধর ও ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

অন্যদিকে, কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নাজমুল সাকিব সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, মা-মেয়েসহ কয়েকজন পুলিশ সদস্যকে মারধর করেছে বলে থানা থেকে জানানো হয়েছে। তিনি বলেন, “সিসিটিভি ফুটেজ দেখে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।”

পেকুয়ার ইউএনও মাহবুবুল আলম গণমাধ্যমকে জানান, “তখন পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল। সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে মা-মেয়েকে এক মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।”

তবে, ঘটনাটির সূত্রপাত সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ থেকে বলে জানা গেছে। জুবাইদার বাবা ২০১৩ সালে মারা যান এবং আইন অনুযায়ী তিনি তার বাবার সম্পত্তির উত্তরাধিকারী। সম্পত্তির অংশ চাওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে জুবাইদার দাদার বাড়ির লোকজন তার পিতৃপরিচয় অস্বীকার করে আসছে এবং ইউনিয়ন পরিষদ থেকেও তাকে ওয়ারিশ সনদ দেওয়া হয়নি। পরিবারের অভিযোগ, স্থানীয় নারী ইউপি সদস্য বিজু (জুবাইদার ফুফু) এক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করেছেন। সম্পত্তির অধিকার ফিরে পেতে জুবাইদা আইনের আশ্রয় নিলে মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব পান এসআই পল্লব।