তুরস্ক, ভারত, রাশিয়া কিংবা চীন, দেশগুলোর সঙ্গে ইরানের দীর্ঘদিনের মিত্রতা ও কৌশলগত সম্পর্ক থাকলেও বর্তমান যুদ্ধে তেহরানের পাশে কাউকেই দেখা যাচ্ছে না। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞায় একঘরে হয়ে থাকা ইরান বছরের পর বছর ধরে যাদের সঙ্গে কূটনৈতিক, বাণিজ্যিক ও সামরিক সম্পর্ক বজায় রেখেছিল, এখন হামলার মুখে দাঁড়িয়ে তাদের কাছ থেকে কেবল মৌখিক আশ্বাসের বেশি কিছু পাচ্ছে না দেশটি। বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি এখন ইরানের জন্য এক ‘নিঃসঙ্গ যুদ্ধ’।
চীন ইরানের তেলের বড় ক্রেতা, আবার উত্তর কোরিয়া, ভেনেজুয়েলা ও রাশিয়া সামরিক প্রযুক্তির ক্ষেত্রে ইরানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী। কিন্তু বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি হামলার মুখে এই অংশীদারদের কেউই তেহরানকে রক্ষায় সরাসরি এগিয়ে আসেনি। উল্টো তুরস্কের মতো প্রতিবেশী দেশগুলো এখন ঝুঁকির মুখে। বুধবার ন্যাটো জানায়, ইরান থেকে ছোড়া একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তুরস্কের আকাশসীমার দিকে যাওয়ার সময় তারা সেটি গুলি করে ভূপাতিত করেছে। যদিও বৃহস্পতিবার ইরান এই হামলার কথা অস্বীকার করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের পররাষ্ট্রনীতি মূলত আদর্শিক এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীকেন্দ্রিক হওয়ায় রাষ্ট্রের পর্যায়ে সত্যিকারের ‘বিপদের বন্ধু’ গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে দেশটি। ফলে মিত্র থাকলেও এই কঠিন সময়ে ইরানকে একাই লড়তে হচ্ছে।
ইস্তাম্বুলভিত্তিক থিংক ট্যাংক এদাম-এর পরিচালক সিনান উলজেন বলেন, যারা ভেবেছিলেন পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে একটি নতুন অক্ষশক্তি তৈরি হচ্ছে, তাদের জন্য এটি একটি রূঢ় বাস্তবতা। রাশিয়া, চীন, ইরান ও উত্তর কোরিয়া; এই চার দেশের একটি যখন আজ অবরুদ্ধ, তখন দেখা যাচ্ছে এই জোটের আসলে কোনও কার্যকর অর্থ নেই।’
ইরান বছরের পর বছর ধরে লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং গাজার হামাসের মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর পেছনে বিনিয়োগ করেছে। কিন্তু ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধে এই গোষ্ঠীগুলো এখন চরমভাবে বিপর্যস্ত। ইয়েমেনের হুথি বা ইরাকের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো লোহিত সাগরে বা মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালালেও, তা ইরানের ভেতরে চলা যুদ্ধের গতিপথ পরিবর্তনের জন্য যথেষ্ট নয়।
ভারতের সঙ্গে ইরানের বাণিজ্যিক সম্পর্ক থাকলেও নয়া দিল্লি কৌশলী অবস্থান নিয়েছে। ভারত ইরানের চাবাহার বন্দরে বিনিয়োগ করেছে সত্য, কিন্তু একই সঙ্গে দেশটি ইসরায়েলের বৃহত্তম অস্ত্র ক্রেতা (২০২০-২৪ সময়ে ইসরায়েলের মোট অস্ত্র বিক্রির ৩৪ শতাংশ)। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যুদ্ধের ঠিক আগেই ইসরায়েল সফর করেছেন। বিশ্লেষক কবির তানেজা বলেন, ভারতের পররাষ্ট্রনীতি স্পষ্ট- তারা অন্যের ঝামেলায় জড়াবে না।’
অন্যদিকে, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোয়ান ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুতে শোক প্রকাশ এবং হামলার নিন্দা জানালেও মূলত নিজ দেশের স্থিতিশীলতা নিয়ে চিন্তিত। সিরিয়া বা ইরাকের মতো ইরানের অস্থিতিশীলতা যেন তুরস্কে ছড়িয়ে না পড়ে, সেটাই এখন আঙ্কারার মূল লক্ষ্য।
রাশিয়া গত এক দশক ধরে ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত। দুই দেশ মিলে সিরিয়ার বাশার আল-আসাদ সরকারকে টিকিয়ে রেখেছিল এবং ইউক্রেন যুদ্ধেও রাশিয়া ইরানের ড্রোন ব্যবহার করেছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে তাদের মধ্যে বড় ধরনের সহযোগিতা চুক্তি হলেও তাতে একে অপরকে সামরিকভাবে রক্ষার কোনও বাধ্যবাধকতা রাখা হয়নি। রাশিয়া বর্তমানে ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে নিজেদের পরিস্থিতি জটিল করতে চাচ্ছে না।
একইভাবে চীন কেবল ইরানের তেলের বড় ক্রেতা হিসেবেই রয়ে গেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের চীন সফরের আগে বেইজিংয়ের আপাতত সংযমের আহ্বান জানানো ছাড়া আর কোনও পদক্ষেপ নেওয়ার সম্ভাবনা কম।
সূত্র: নিউ ইয়র্ক টাইমস
রিপোর্টারের নাম 





















