কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী ও স্থানীয় ক্ষুদ্র কৃষকদের জীবনমান উন্নয়নে ৬.৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ১০৫ কোটি জাপানি ইয়েন) অনুদান দিয়েছে জাপান সরকার। এই অর্থ জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি)-এর মাধ্যমে ব্যয় হবে।
এই অনুদানের মূল লক্ষ্য রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য অত্যাবশ্যকীয় খাদ্য সহায়তা অব্যাহত রাখা এবং অন্তঃসত্ত্বা, দুগ্ধদানকারী মা ও পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করা। পাশাপাশি, কক্সবাজারের আশপাশের স্থানীয় ক্ষুদ্র কৃষকদের জীবনমান উন্নয়ন এবং প্রতিকূলতা মোকাবিলায় সক্ষমতা বাড়াতে ‘অ্যাগ্রিগেশন সেন্টার’ মডেলের মাধ্যমে সহায়তা দেওয়া হবে। এসব কেন্দ্রের মাধ্যমে কৃষকরা তাদের উৎপাদিত পণ্য সহজে স্থানীয় বাজারে সরবরাহ করতে পারবেন, যা মানবিক সহায়তা কার্যক্রমেও ব্যবহৃত হবে। এর ফলে তাজা শাকসবজি, ডিম ও চালসহ স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত খাদ্যপণ্য রোহিঙ্গা পরিবারগুলোর কাছেও পৌঁছানো সম্ভব হবে।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশে নিযুক্ত জাপানের মান্যবর রাষ্ট্রদূত সাইদা শিনিচি বলেন, “বাংলাদেশে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে রোহিঙ্গা শরণার্থী ও তাদের আশ্রয়দাতা স্থানীয় সম্প্রদায়ের পাশে থাকতে জাপান প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ডব্লিউএফপির সঙ্গে এই অংশীদারত্বের মাধ্যমে আমরা খাদ্য নিরাপত্তা, উন্নত পুষ্টি এবং রোহিঙ্গা পরিবারগুলোর সামগ্রিক কল্যাণে অবদান রাখতে চাই। একইসঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন ও বাজারে প্রবেশ সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় স্থানীয় বাংলাদেশিদের খাদ্য নিরাপত্তা জোরদার করাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।”
ডব্লিউএফপির চলমান কর্মসূচির আওতায় রোহিঙ্গা পরিবারগুলো প্রতি মাসে খাদ্য ভাউচার পায়, যার মাধ্যমে তারা নির্দিষ্ট বিক্রয়কেন্দ্র থেকে চাল, ডাল, তেলসহ প্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য এবং তাজা শাকসবজি ও প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার সংগ্রহ করতে পারে। পুষ্টি কর্মসূচির অধীনে গর্ভবতী ও দুগ্ধদানকারী মা এবং শিশুদের অপুষ্টি প্রতিরোধ ও চিকিৎসায় বিশেষ পুষ্টিপণ্য বিতরণ, শিশুদের বৃদ্ধি পর্যবেক্ষণ এবং পুষ্টি বিষয়ক শিক্ষা প্রদান করা হয়।
স্থানীয় সম্প্রদায়ের জন্য এই অর্থায়ন বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষি অবকাঠামো মেরামতে ব্যবহৃত হবে, যা কৃষকদের স্বাভাবিক উৎপাদন ও সরবরাহ কার্যক্রম পুনরায় চালু করতে সাহায্য করবে। অ্যাগ্রিগেশন সেন্টারগুলোতে কোল্ড স্টোরেজ এবং আধুনিক খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধা স্থাপন করা হবে, যা স্থানীয় খাদ্যের মান ও বাজারমূল্য বাড়াতে সহায়ক হবে।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের শুরু থেকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সহিংসতা বৃদ্ধির ফলে নতুন করে প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গা কক্সবাজারে আশ্রয় নিয়েছে, যা সেখানে মোট রোহিঙ্গা জনসংখ্যাকে প্রায় ১২ লাখে উন্নীত করেছে। এই পরিস্থিতিতে মানবিক চাহিদা বাড়লেও আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে আসছে। ডব্লিউএফপি জানিয়েছে, ২০২৬ সালের জন্য ১৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের ঘাটতি পূরণ না হলে আগামী এপ্রিল থেকে রোহিঙ্গাদের খাদ্য ও পুষ্টি সহায়তায় বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটতে পারে।
ডব্লিউএফপি বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত কান্ট্রি ডিরেক্টর সিমোন পারচমেন্ট বলেন, “কক্সবাজারে মানবিক চাহিদা যখন অত্যন্ত বেশি, ঠিক সেই সময়ে জাপান সরকারের এই সহায়তা সময়োপযোগী ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রোহিঙ্গা ও স্থানীয় বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীর প্রতি জাপানের দীর্ঘদিনের সমর্থনের জন্য আমরা গভীরভাবে কৃতজ্ঞ। অন্যান্য দাতাদেরও আমরা আহ্বান জানাই, যেন তারা এগিয়ে এসে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জীবন, সুস্থতা ও মর্যাদা রক্ষায় সহায়তা করেন।”
২০১৭ সালের আগস্টে রোহিঙ্গা সংকট শুরুর পর থেকে জাপান বাংলাদেশে মানবিক কার্যক্রমে ধারাবাহিকভাবে সহায়তা দিয়ে আসছে। সর্বশেষ এই অনুদানসহ ডব্লিউএফপি, অন্যান্য জাতিসংঘ সংস্থা ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর জন্য জাপানের মোট সহায়তার পরিমাণ ২৬০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়েছে।
রিপোর্টারের নাম 






















