ঢাকা ০৪:২৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৫ মার্চ ২০২৬

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষিকা হত্যা: দপ্তরেই নির্মম বলি, নেপথ্যে বদলি বিতর্ক?

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০২:৪৪:১৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ মার্চ ২০২৬
  • ২ বার পড়া হয়েছে

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে (ইবি) নিজ দপ্তরে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন এক নারী শিক্ষিকা। বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদভুক্ত সমাজকল্যাণ বিভাগের সভাপতি, সহকারী অধ্যাপক আসমা সাদিয়া রুনাকে গত বুধবার (৪ মার্চ) বিকেলে গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় অভিযুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারী ফজলুর রহমানও ওই কক্ষেই আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। এই মর্মান্তিক ঘটনা ইবি ক্যাম্পাসজুড়ে শোক ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে, একইসাথে দেশজুড়ে উঠেছে প্রশ্ন—কেন একজন শিক্ষিকাকে নিজ কর্মস্থলে এমন নৃশংসতার শিকার হতে হলো?

বিশ্ববিদ্যালয়ের থিওলজি অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ অনুষদ ভবনের দ্বিতীয় তলায় আসমা সাদিয়ার অফিস কক্ষে বিকাল ৪টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। সে সময় বিভাগের চেয়ারম্যানের কক্ষ থেকে চিৎকারের শব্দ শুনে ভবনের নিচে দায়িত্বরত আনসার সদস্য ও কয়েকজন শিক্ষার্থী দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যান। তারা কক্ষের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ দেখতে পান। পরে দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে তারা আসমা সাদিয়াকে রক্তাক্ত অবস্থায় মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখেন। একই সময় অভিযুক্ত কর্মচারী ফজলুর রহমানকে নিজের গলায় ছুরি চালাতে দেখেন তারা। খবর পেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল বডি ও ইবি থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে দুজনকে উদ্ধার করে ইবি মেডিক্যালে পাঠায়। অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাদের কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়, যেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক আসমা সাদিয়াকে মৃত ঘোষণা করেন। কর্মচারী ফজলুর রহমান বর্তমানে আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

নিহত আসমা সাদিয়া রুনার এমন মর্মান্তিক মৃত্যুতে দেশজুড়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। কেন একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষিকা নিজ কার্যালয়ে এমন নৃশংসতার শিকার হলেন, সে প্রশ্ন এখন সবার মুখে মুখে। অভিযুক্ত ফজলুর রহমান বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ডে-লেবার কর্মচারী, যিনি দীর্ঘদিন ধরে সমাজকল্যাণ বিভাগে কর্মরত ছিলেন।

প্রাথমিক তদন্ত ও বিভিন্ন সূত্রের তথ্যে জানা গেছে, নিহত শিক্ষিকা আসমা সাদিয়া রুনার সঙ্গে কর্মচারী ফজলুর রহমানের দীর্ঘদিনের রেষারেষি ছিল। বেতন ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে তাদের মধ্যে একাধিকবার বাগবিতণ্ডা হয়। মাসখানেক আগে ফজলুর ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের কারণে বিভাগীয় কমিটির সিদ্ধান্তে তাকে সমাজকল্যাণ বিভাগ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে বদলি করা হয়। তবে সমাজকল্যাণ বিভাগের প্রতিষ্ঠাকালীন কর্মচারী হওয়ায় ফজলুর এই বদলি মেনে নিতে পারেননি। এই বদলিকে কেন্দ্র করেই ক্ষিপ্ত হয়ে ফজলুর রহমান এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে থাকতে পারেন বলে ধারণা করছেন বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্টরা।

সমাজকল্যাণ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শ্যাম সুন্দর সরকার জানান, “বিভাগীয় সভাপতির সঙ্গে খারাপ আচরণের কারণে তাকে বদলি করা হয়েছিল। শুধু বদলির কারণে হত্যার মতো ঘটনা ঘটবে, তা আমরা ভাবতেও পারিনি।” অপর শিক্ষক হাবিবুর রহমান বলেন, ফজলু প্রায় ৮ বছর ধরে বিভাগে থোক বরাদ্দে অস্থায়ী ভিত্তিতে কাজ করছিলেন এবং প্রায়ই সবার সঙ্গে খারাপ আচরণ করতেন।

ইবি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাসুদ রানা জানান, ঘটনা জানতে পেরে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে দুজনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠায়। ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে পুলিশ কাজ শুরু করেছে। ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে এবং আশপাশের সিসি ক্যামেরার ফুটেজও পরীক্ষা করা হচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. শাহীনুজ্জামান বলেন, “আমরা খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়েছিলাম। কর্মচারী ছেলেটি স্থানীয় এবং বদমেজাজি হিসেবে পরিচিত। নানা অভিযোগের কারণে তাকে অন্য বিভাগে বদলি করা হয়েছিল বলে শুনেছি।”

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নকীব মোহাম্মদ নসরুল্লাহ বলেন, “আমরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। পুলিশ ও পিবিআই তদন্ত করছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে এবং এর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনের চেষ্টা করা হবে। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা জোরদার করেছি।”

কুষ্টিয়া জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) জসীম উদ্দিন এই হত্যাকাণ্ডকে অত্যন্ত মর্মান্তিক উল্লেখ করে বলেন, “প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, কক্ষের ভেতরের দুজনের একজনই অপরজনকে হত্যা করেছে। অধিকতর তদন্তে বিস্তারিত জানা যাবে।” এই ঘটনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং কর্মচারীদের সঙ্গে শিক্ষকদের সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে। ক্যাম্পাসজুড়ে এখন থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ঢাবি ছাত্রদলের দুই নেতাকে অব্যাহতি: শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ কেন্দ্রীয় কমিটির

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষিকা হত্যা: দপ্তরেই নির্মম বলি, নেপথ্যে বদলি বিতর্ক?

আপডেট সময় : ০২:৪৪:১৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ মার্চ ২০২৬

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে (ইবি) নিজ দপ্তরে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন এক নারী শিক্ষিকা। বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদভুক্ত সমাজকল্যাণ বিভাগের সভাপতি, সহকারী অধ্যাপক আসমা সাদিয়া রুনাকে গত বুধবার (৪ মার্চ) বিকেলে গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় অভিযুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারী ফজলুর রহমানও ওই কক্ষেই আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। এই মর্মান্তিক ঘটনা ইবি ক্যাম্পাসজুড়ে শোক ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে, একইসাথে দেশজুড়ে উঠেছে প্রশ্ন—কেন একজন শিক্ষিকাকে নিজ কর্মস্থলে এমন নৃশংসতার শিকার হতে হলো?

বিশ্ববিদ্যালয়ের থিওলজি অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ অনুষদ ভবনের দ্বিতীয় তলায় আসমা সাদিয়ার অফিস কক্ষে বিকাল ৪টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। সে সময় বিভাগের চেয়ারম্যানের কক্ষ থেকে চিৎকারের শব্দ শুনে ভবনের নিচে দায়িত্বরত আনসার সদস্য ও কয়েকজন শিক্ষার্থী দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যান। তারা কক্ষের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ দেখতে পান। পরে দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে তারা আসমা সাদিয়াকে রক্তাক্ত অবস্থায় মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখেন। একই সময় অভিযুক্ত কর্মচারী ফজলুর রহমানকে নিজের গলায় ছুরি চালাতে দেখেন তারা। খবর পেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল বডি ও ইবি থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে দুজনকে উদ্ধার করে ইবি মেডিক্যালে পাঠায়। অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাদের কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়, যেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক আসমা সাদিয়াকে মৃত ঘোষণা করেন। কর্মচারী ফজলুর রহমান বর্তমানে আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

নিহত আসমা সাদিয়া রুনার এমন মর্মান্তিক মৃত্যুতে দেশজুড়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। কেন একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষিকা নিজ কার্যালয়ে এমন নৃশংসতার শিকার হলেন, সে প্রশ্ন এখন সবার মুখে মুখে। অভিযুক্ত ফজলুর রহমান বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ডে-লেবার কর্মচারী, যিনি দীর্ঘদিন ধরে সমাজকল্যাণ বিভাগে কর্মরত ছিলেন।

প্রাথমিক তদন্ত ও বিভিন্ন সূত্রের তথ্যে জানা গেছে, নিহত শিক্ষিকা আসমা সাদিয়া রুনার সঙ্গে কর্মচারী ফজলুর রহমানের দীর্ঘদিনের রেষারেষি ছিল। বেতন ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে তাদের মধ্যে একাধিকবার বাগবিতণ্ডা হয়। মাসখানেক আগে ফজলুর ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের কারণে বিভাগীয় কমিটির সিদ্ধান্তে তাকে সমাজকল্যাণ বিভাগ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে বদলি করা হয়। তবে সমাজকল্যাণ বিভাগের প্রতিষ্ঠাকালীন কর্মচারী হওয়ায় ফজলুর এই বদলি মেনে নিতে পারেননি। এই বদলিকে কেন্দ্র করেই ক্ষিপ্ত হয়ে ফজলুর রহমান এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে থাকতে পারেন বলে ধারণা করছেন বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্টরা।

সমাজকল্যাণ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শ্যাম সুন্দর সরকার জানান, “বিভাগীয় সভাপতির সঙ্গে খারাপ আচরণের কারণে তাকে বদলি করা হয়েছিল। শুধু বদলির কারণে হত্যার মতো ঘটনা ঘটবে, তা আমরা ভাবতেও পারিনি।” অপর শিক্ষক হাবিবুর রহমান বলেন, ফজলু প্রায় ৮ বছর ধরে বিভাগে থোক বরাদ্দে অস্থায়ী ভিত্তিতে কাজ করছিলেন এবং প্রায়ই সবার সঙ্গে খারাপ আচরণ করতেন।

ইবি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাসুদ রানা জানান, ঘটনা জানতে পেরে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে দুজনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠায়। ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে পুলিশ কাজ শুরু করেছে। ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে এবং আশপাশের সিসি ক্যামেরার ফুটেজও পরীক্ষা করা হচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. শাহীনুজ্জামান বলেন, “আমরা খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়েছিলাম। কর্মচারী ছেলেটি স্থানীয় এবং বদমেজাজি হিসেবে পরিচিত। নানা অভিযোগের কারণে তাকে অন্য বিভাগে বদলি করা হয়েছিল বলে শুনেছি।”

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নকীব মোহাম্মদ নসরুল্লাহ বলেন, “আমরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। পুলিশ ও পিবিআই তদন্ত করছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে এবং এর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনের চেষ্টা করা হবে। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা জোরদার করেছি।”

কুষ্টিয়া জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) জসীম উদ্দিন এই হত্যাকাণ্ডকে অত্যন্ত মর্মান্তিক উল্লেখ করে বলেন, “প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, কক্ষের ভেতরের দুজনের একজনই অপরজনকে হত্যা করেছে। অধিকতর তদন্তে বিস্তারিত জানা যাবে।” এই ঘটনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং কর্মচারীদের সঙ্গে শিক্ষকদের সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে। ক্যাম্পাসজুড়ে এখন থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।