ব্রিটেনের অভিবাসন এবং সীমান্ত নীতিতে আমূল ও স্থায়ী পরিবর্তনের সূচনা করে নির্দিষ্ট কিছু দেশের ওপর কঠোর ভিসা নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করেছে যুক্তরাজ্য। উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে চিহ্নিত রাষ্ট্রগুলোর নাগরিকদের তাৎক্ষণিকভাবে ব্রিটেনে প্রবেশ নিষিদ্ধ করার ক্ষমতা এখন থেকে স্থায়ী আইনি প্রক্রিয়ায় রূপ নিলো।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ আনুষ্ঠানিকভাবে ব্রিটিশ সীমান্ত এনফোর্সমেন্টের এ নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছেন। বৈধ অভিবাসন ব্যবস্থার অপব্যবহারের অভিযোগে এ প্রথমবারের মতো নির্দিষ্ট কিছু দেশের ওপর ‘ইমারজেন্সি ব্রেক’ বা জরুরি ভিসা স্থগিতাদেশ কার্যকর করা হয়েছে।
৩ মার্চ থেকে কার্যকর হওয়া এ নির্দেশনায় আফগানিস্তান, ক্যামেরুন, মিয়ানমার এবং সুদানের নাগরিকদের জন্য সব ধরনের স্টুডেন্ট ভিসা স্থগিত করা হয়েছে। পাশাপাশি আফগান নাগরিকদের জন্য ওয়ার্ক ভিসাও বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। মূলত বৈধ ভিসাকে ‘ব্যাকডোর’ বা পেছনের দরজা হিসেবে ব্যবহার করে ব্রিটেনে পৌঁছে রাজনৈতিক আশ্রয় (অ্যাসাইলাম) চাওয়ার প্রবণতা বন্ধ করতেই এ নজিরবিহীন পদক্ষেপ।
ভিসা নিষেধাজ্ঞার পরবর্তী তালিকায় কি বাংলাদেশ?
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র থেকে বাংলা ট্রিবিউন জানতে পেরেছে, অনুরূপ বিধিনিষেধ আরোপের জন্য বর্তমানে উচ্চ অগ্রাধিকার ভিত্তিক পর্যালোচনার কেন্দ্রে রয়েছে বাংলাদেশ। প্রাথমিক তালিকায় বাংলাদেশের নাম না থাকলেও, দেশটির স্টুডেন্ট ভিসা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার হার বর্তমানে ২২ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে যা সরকারের নির্ধারিত পাঁচ শতাংশের সহনশীল সীমা অনেক আগেই অতিক্রম করেছে।
এমনকি, নিজেদের স্পন্সরশীপ লাইসেন্স রক্ষার্থে যুক্তরাজ্যের অন্তত নয়টি বড় বিশ্ববিদ্যালয় ইতোমধ্যে বাংলাদেশ থেকে শিক্ষার্থী ভর্তি সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যখন সীমান্তে শৃঙ্খলা ও নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনার অঙ্গীকার করছেন, তখন ধারণা করা হচ্ছে যে আগামী মে মাসের পর্যালোচনার আগে যদি আশ্রয় প্রার্থনার হার উল্লেখযোগ্যভাবে না কমে, তবে পরবর্তী লক্ষ্যবস্তু হতে পারে ঢাকা।
৩০ মাসের ‘অস্থায়ী সুরক্ষা’ বিধি
কয়েক দশকের অভিবাসন আইন থেকে সরে এসে ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্থায়ী শরণার্থী মর্যাদা বা ‘পার্মানেন্ট রিফিউজি স্ট্যাটাস’ বাতিল করেছেন। চলতি সপ্তাহ থেকে কার্যকর হওয়া নতুন নিয়ম অনুযায়ী, যারা রাজনৈতিক আশ্রয় পাবেন তারা এখন থেকে কেবল ৩০ মাসের জন্য একটি অস্থায়ী অনুমতিপত্র পাবেন। প্রতি আড়াই বছর পর পর এ মর্যাদা পর্যালোচনা করা হবে। যদি ওই সময়ের মধ্যে আবেদনকারীর নিজ দেশ ‘নিরাপদ’ হিসেবে বিবেচিত হয়, তবে তাকে অবিলম্বে যুক্তরাজ্য ছাড়তে হবে।
বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মতো দেশগুলো থেকে যারা আশ্রয় ব্যবস্থাকে স্থায়ীভাবে বসবাসের সংক্ষিপ্ত পথ (শর্টকাট) হিসেবে ব্যবহার করতে চান, তাদের নিরুৎসাহিত করতেই এ নীতি।
ডিজিটাল সীমান্ত ও তাৎক্ষণিক কার্যকরীকরণ
যুক্তরাজ্যের ইমিগ্রেশন সিস্টেম সম্পূর্ণ ডিজিটাল পদ্ধতিতে রূপান্তরের সঙ্গে সঙ্গেই এ কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হলো। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির শেষ নাগাদ সব ধরনের কাগুজে ভিসা বা ফিজিক্যাল ডকুমেন্টের পরিবর্তে ‘ই-ভিসা’ চালু করা হয়েছে। এর ফলে হোম অফিস এখন যেকোনও দেশের নাগরিকদের প্রবেশাধিকার রিয়েল-টাইমে বা এক ক্লিকেই ‘বন্ধ’ করে দেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করেছে।
এ ডিজিটাল ‘কিল সুইচ’ ব্যবহার করেই চার দেশের আবেদন প্রক্রিয়া ফ্রিজ বা স্থগিত করা হয়েছে। সরকারি তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে আসা এক লাখ আশ্রয়প্রার্থীর প্রায় ৪০ শতাংশই বৈধ ভিসায় ব্রিটেনে ঢুকেছিলেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ পরিসংখ্যানটি শূন্যে নামিয়ে আনতে বদ্ধপরিকর।
আবেদনকারীদের জন্য পরবর্তী বার্তা
উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের যেসব শিক্ষার্থী ও কর্মীর আবেদন বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে, কোনও আপিলের সুযোগ ছাড়াই তাদের আবেদন সরাসরি বাতিল হয়ে যাবে। হোম অফিস নিশ্চিত করেছে, নিরাপত্তা ও যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া সংস্কারের জন্য এ স্থগিতাদেশ অন্তত ১২ মাস বহাল থাকবে। আর বর্তমানে যুক্তরাজ্যে অবস্থানরতদের ক্ষেত্রে এখন থেকে ‘আর্নড সেটেলমেন্ট’ বা যোগ্যতার ভিত্তিতে স্থায়ী বসবাসের সুযোগ দেওয়ার নীতিতে জোর দেওয়া হচ্ছে।
অর্থাৎ, দীর্ঘমেয়াদী অবস্থানের কারণে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বসবাসের অধিকার পাওয়ার দিন শেষ। এখন থেকে অর্থনৈতিক অবদান এবং অভিবাসন আইন মান্য করার স্বচ্ছ রেকর্ডের ভিত্তিতেই কেবল পরবর্তী রেসিডেন্সি বিবেচনা করা হবে।
বর্তমানে চারটি দেশকে লক্ষ্য করে এই স্থগিতাদেশ দেওয়া হলেও হোম অফিসের পারফরম্যান্স ডেটা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে একটি বড় ‘গ্রে লিস্ট’ তালিকা তৈরি হচ্ছে। এ তালিকায় পরবর্তী ঝুঁকিতে রয়েছে বাংলাদেশ, পাকিস্তান এবং নাইজেরিয়া।
হোয়াইট হলের অভ্যন্তরীণ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ১৮ মাসে স্টুডেন্ট পারমিটে যুক্তরাজ্যে এসে অন্তত ১২ হাজার বাংলাদেশি রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়েছেন, যা আগের তুলনায় ৪৪ শতাংশ বেশি। একইভাবে পাকিস্তানের স্টুডেন্ট টু অ্যাসাইলাম কনভার্সন রেট ২০২৬-এর শুরুতে রেকর্ড ২৮ শতাংশে পৌঁছেছে। নাইজেরিয়ার ক্ষেত্রে ‘ডিপেন্ডেন্ট’ বা নির্ভরশীলদের ভিসার অপব্যবহার নিয়ে তীব্র চাপ তৈরি হয়েছে।
এ ব্যাপারে মন্তব্য করতে গিয়ে লন্ডনের চ্যান্সেরি সলিসিটর্সের কর্ণধার ব্যারিস্টার মো. ইকবাল হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “ডিজিটাল কিল সুইচ সক্রিয় থাকায়, দ্বিতীয় প্রান্তিকের তথ্যে যদি অভিবাসন ব্যবস্থার অপব্যবহার না কমে, তবে স্থগিতাদেশের তালিকায় যেতে কিছু দেশের জন্য মাত্র ২৪ ঘণ্টার একটি নোটিশ কার্যকর করতে পারে হোম অফিস। কারণ, এখন তারা তাৎক্ষণিকভাবে নীতি পরিবর্তন করছে।”
রিপোর্টারের নাম 

























