ঢাকা ০৯:১৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৩ মার্চ ২০২৬

স্বাধীনতার প্রথম সূর্যোদয়: ২ মার্চ জাতীয় পতাকা দিবস ঘোষণার দাবি

১৯৭১ সালের ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় উড়ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পতাকা। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত ছিল এটি, যা স্বাধীনতার চূড়ান্ত ঘোষণাকে অনিবার্য করে তোলে। এই গৌরবোজ্জ্বল দিনটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘জাতীয় পতাকা দিবস’ হিসেবে ঘোষণার দাবি উঠেছে, যা জাতির আত্মপরিচয় ও সংগ্রামের ইতিহাসকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে সহায়ক হবে।

১ মার্চ ইয়াহিয়া খানের জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণার পর অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে সারা দেশ। বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা সেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় এক বিশাল সমাবেশে সমবেত হয়। এই ঐতিহাসিক সমাবেশে তৎকালীন ডাকসু ভিপি আ স ম আবদুর রব যখন বক্তৃতা করছিলেন, ঠিক তখনই মহানগর ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক শেখ জাহিদ হোসেন একটি বাঁশের মাথায় লাল-সবুজ পতাকা বেঁধে বিশাল মিছিল নিয়ে মঞ্চস্থলে প্রবেশ করেন। সেখানেই আ স ম আবদুর রবের নেতৃত্বে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ কর্তৃক প্রথমবারের মতো উত্তোলন করা হয় স্বাধীন বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত পতাকা। এই পতাকা ছিল সবুজ রং-এ আমাদের সুজলা-সুফলা বাংলাদেশ ও তারুণ্যের প্রতীক, আর লাল বর্ণ ছিল শহীদদের রক্তে রঞ্জিত বাংলাদেশ ও আত্মত্যাগের প্রতিফলন।

তবে এই পতাকার নকশা ও পরিকল্পনা হয়েছিল আরও আগে। ১৯৭০ সালের ৬ জুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের ১১৮ নম্বর কক্ষে ‘নিউক্লিয়াস’-এর প্রতিষ্ঠাতা সিরাজুল আলম খান, আবদুর রাজ্জাক ও কাজী আরেফ আহমেদসহ কয়েকজন ছাত্রলীগ নেতা এক বৈঠকে মিলিত হন। সেই বৈঠকে সিরাজুল আলম খানের প্রস্তাবনায় সবুজ জমিনের ওপর লাল সূর্যের মাঝে হলুদ রঙের বাংলার মানচিত্র খচিত পতাকা তৈরির সিদ্ধান্ত হয়। কামরুল আলম খান খসরু তখন ঢাকা নিউমার্কেটের এক বিহারি দরজির দোকান থেকে বড় এক টুকরো সবুজ কাপড়ের মাঝে লাল একটি বৃত্ত সেলাই করে আনেন। এরপর প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের তিতুমীর হলের ৩১২ নম্বর কক্ষে এনামুল হকের কাছ থেকে অ্যাটলাস নিয়ে ট্রেসিং পেপারে আঁকা হয় স্বাধীন বাংলার মানচিত্র। ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় নেতা কুমিল্লার শিব নারায়ণ দাস নিপুণ হাতে সেই মানচিত্রটি এঁকে দেন লাল বৃত্তের মাঝে।

১৯৭০ সালের ৭ জুন পল্টনে অনুষ্ঠিত এক কুচকাওয়াজে আ স ম আবদুর রব এই পতাকা বঙ্গবন্ধুর হাতে তুলে দেন, যা তিনি ছাত্র-জনতার সামনে প্রদর্শন করেন। এরপর ১৯৭১ সালের ২ মার্চ পতাকা উত্তোলনের ঘটনা সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধকে অনিবার্য করে তোলে এবং স্বাধীনতা যুদ্ধের সামরিক ও রাজনৈতিক পরিকল্পনায় এক নতুন মাত্রা যোগ করে। এটি ছিল বাঙালির স্বাধীন রাষ্ট্রের অস্তিত্বের এক আত্মপ্রকাশ।

পতাকা উত্তোলনের পরদিন ৩ মার্চ পল্টন ময়দানে স্বাধীনতাকামী ছাত্র-জনতার বিশাল সমাবেশে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান সিরাজ ‘স্বাধীনতার ইশতেহার’ পাঠ করেন। এই ইশতেহারে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা, জাতীয় সংগীত (‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’), জাতীয় পতাকা নির্ধারণ, ‘জয়বাংলা’ স্লোগান ও আন্দোলনের কর্মসূচিসহ বঙ্গবন্ধুকে বাংলাদেশের সর্বাধিনায়ক ঘোষণা করা হয়। অনুষ্ঠানে স্বাধীনতার পক্ষের চার ছাত্রনেতা আ স ম আবদুর রব, নূরে আলম সিদ্দিকী, শাহজাহান সিরাজ এবং আব্দুল কুদ্দুস মাখন শপথ বাক্য পাঠ করেন। শপথ শেষে ‘জয় বাংলা’ বাহিনীর ডেপুটি চীফ কামরুল আলম খান খসরু আনুষ্ঠানিকভাবে গান ফায়ার করেন এবং জাতীয় সংগীত পরিবেশিত হয়।

বাঙালির এই মুক্তিযুদ্ধ ছিলো মূলত একটি রাজনৈতিক ‘জনযুদ্ধ’। ১৯৬২ সাল থেকে সিরাজুল আলম খানের নেতৃত্বে অপ্রকাশ্যে স্বাধীনতার জন্য যে আন্দোলন সংগ্রাম পরিচালিত হয়, জাতির মনন প্রস্তুত করা হয়, ছাত্র-যুবকদের সশস্ত্র যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করা, অস্ত্র সংগ্রহ, ‘জয় বাংলা বাহিনী’ গঠন, ২ মার্চ স্বাধীন বাংলার মানচিত্র খচিত পতাকা উত্তোলন, ৩ মার্চ বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতিতেই স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ এবং ৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ—সবই ছিল অগ্নিঝরা মার্চের কীর্তি। ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধর-বাংলাদেশ স্বাধীন কর’, ‘তোমার আমার ঠিকানা পদ্মা-মেঘনা-যমুনা’, ‘জয়বাংলা’ স্লোগানসহ জাতির অস্তিত্বের নির্যাস হয়ে উঠেছিল এই আন্দোলন।

১৯৭১ সালের ১ মার্চ পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান বেতার ভাষণে ৩ মার্চ তারিখে গণপরিষদের অধিবেশন বাতিল করলে ছাত্র-জনতা বিক্ষুব্ধ হয়ে রাস্তায় নেমে পড়ে। এ সময় বঙ্গবন্ধু হোটেল পূর্বাণীতে পার্লামেন্টারী দলের বৈঠক করছিলেন। বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা সেখানে গিয়ে উপস্থিত হলে তিনি আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন। শুরু হয় স্বাধীনতার জন্য প্রত্যক্ষ আন্দোলন। ‘নিউক্লিয়াস’-এর পূর্ব সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে গড়ে উঠে ‘স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে ‘আমি যদি হুকুম দিবার নাও পারি, প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ, প্রতিরোধ গড়ে তোলা’র আহ্বান জানান। ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম-এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ জয়বাংলা বলেই বঙ্গবন্ধু তাঁর ভাষণ শেষ করেন।

২৩ মার্চ পাকিস্তানের প্রজাতন্ত্র দিবসের পরিবর্তে ‘বিএলএফ’ ও ‘স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদে’র পক্ষ থেকে প্রতিরোধ দিবস পালিত হয় এবং সারা দেশের ঘরে ঘরে স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলিত হয়। ছাত্রসমাজ ভোরে বঙ্গবন্ধুর বাড়ির ছাদে, হাইকোর্ট ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পতাকা উড়িয়ে দেয়। দুপুরে ‘জয় বাংলা বাহিনী’র পক্ষে ছাত্রসমাজ বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে গিয়ে তাঁর হাতে স্বাধীন বাংলার পতাকা তুলে দেয় এবং বঙ্গবন্ধুর গাড়িতে এক পাশে কালো পতাকা, অন্য পাশে বাংলাদেশের পতাকা বেঁধে দেয়।

একটি রাষ্ট্রের অভ্যুদয়, রাজনৈতিক সংগ্রাম জাতির সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফসল। ইতিহাস বিকৃতি, বিভাজন, সংঘাত-সংঘর্ষ ও মিথ্যাচার একটি জাতির ধ্বংসের প্রধান হাতিয়ার। তাই ২ মার্চের মতো ঐতিহাসিক দিনগুলোকে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্মরণ ও পালন করা জরুরি, যা আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রকৃত ইতিহাসকে সুরক্ষিত রাখবে এবং নতুন প্রজন্মকে সঠিক পথে পরিচালিত করবে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

লাহোর-করাচির আকাশে বাণিজ্যিক ফ্লাইট চলাচল বন্ধ ঘোষণা

স্বাধীনতার প্রথম সূর্যোদয়: ২ মার্চ জাতীয় পতাকা দিবস ঘোষণার দাবি

আপডেট সময় : ০৭:৪৮:২১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ মার্চ ২০২৬

১৯৭১ সালের ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় উড়ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পতাকা। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত ছিল এটি, যা স্বাধীনতার চূড়ান্ত ঘোষণাকে অনিবার্য করে তোলে। এই গৌরবোজ্জ্বল দিনটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘জাতীয় পতাকা দিবস’ হিসেবে ঘোষণার দাবি উঠেছে, যা জাতির আত্মপরিচয় ও সংগ্রামের ইতিহাসকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে সহায়ক হবে।

১ মার্চ ইয়াহিয়া খানের জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণার পর অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে সারা দেশ। বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা সেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় এক বিশাল সমাবেশে সমবেত হয়। এই ঐতিহাসিক সমাবেশে তৎকালীন ডাকসু ভিপি আ স ম আবদুর রব যখন বক্তৃতা করছিলেন, ঠিক তখনই মহানগর ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক শেখ জাহিদ হোসেন একটি বাঁশের মাথায় লাল-সবুজ পতাকা বেঁধে বিশাল মিছিল নিয়ে মঞ্চস্থলে প্রবেশ করেন। সেখানেই আ স ম আবদুর রবের নেতৃত্বে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ কর্তৃক প্রথমবারের মতো উত্তোলন করা হয় স্বাধীন বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত পতাকা। এই পতাকা ছিল সবুজ রং-এ আমাদের সুজলা-সুফলা বাংলাদেশ ও তারুণ্যের প্রতীক, আর লাল বর্ণ ছিল শহীদদের রক্তে রঞ্জিত বাংলাদেশ ও আত্মত্যাগের প্রতিফলন।

তবে এই পতাকার নকশা ও পরিকল্পনা হয়েছিল আরও আগে। ১৯৭০ সালের ৬ জুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের ১১৮ নম্বর কক্ষে ‘নিউক্লিয়াস’-এর প্রতিষ্ঠাতা সিরাজুল আলম খান, আবদুর রাজ্জাক ও কাজী আরেফ আহমেদসহ কয়েকজন ছাত্রলীগ নেতা এক বৈঠকে মিলিত হন। সেই বৈঠকে সিরাজুল আলম খানের প্রস্তাবনায় সবুজ জমিনের ওপর লাল সূর্যের মাঝে হলুদ রঙের বাংলার মানচিত্র খচিত পতাকা তৈরির সিদ্ধান্ত হয়। কামরুল আলম খান খসরু তখন ঢাকা নিউমার্কেটের এক বিহারি দরজির দোকান থেকে বড় এক টুকরো সবুজ কাপড়ের মাঝে লাল একটি বৃত্ত সেলাই করে আনেন। এরপর প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের তিতুমীর হলের ৩১২ নম্বর কক্ষে এনামুল হকের কাছ থেকে অ্যাটলাস নিয়ে ট্রেসিং পেপারে আঁকা হয় স্বাধীন বাংলার মানচিত্র। ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় নেতা কুমিল্লার শিব নারায়ণ দাস নিপুণ হাতে সেই মানচিত্রটি এঁকে দেন লাল বৃত্তের মাঝে।

১৯৭০ সালের ৭ জুন পল্টনে অনুষ্ঠিত এক কুচকাওয়াজে আ স ম আবদুর রব এই পতাকা বঙ্গবন্ধুর হাতে তুলে দেন, যা তিনি ছাত্র-জনতার সামনে প্রদর্শন করেন। এরপর ১৯৭১ সালের ২ মার্চ পতাকা উত্তোলনের ঘটনা সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধকে অনিবার্য করে তোলে এবং স্বাধীনতা যুদ্ধের সামরিক ও রাজনৈতিক পরিকল্পনায় এক নতুন মাত্রা যোগ করে। এটি ছিল বাঙালির স্বাধীন রাষ্ট্রের অস্তিত্বের এক আত্মপ্রকাশ।

পতাকা উত্তোলনের পরদিন ৩ মার্চ পল্টন ময়দানে স্বাধীনতাকামী ছাত্র-জনতার বিশাল সমাবেশে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান সিরাজ ‘স্বাধীনতার ইশতেহার’ পাঠ করেন। এই ইশতেহারে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা, জাতীয় সংগীত (‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’), জাতীয় পতাকা নির্ধারণ, ‘জয়বাংলা’ স্লোগান ও আন্দোলনের কর্মসূচিসহ বঙ্গবন্ধুকে বাংলাদেশের সর্বাধিনায়ক ঘোষণা করা হয়। অনুষ্ঠানে স্বাধীনতার পক্ষের চার ছাত্রনেতা আ স ম আবদুর রব, নূরে আলম সিদ্দিকী, শাহজাহান সিরাজ এবং আব্দুল কুদ্দুস মাখন শপথ বাক্য পাঠ করেন। শপথ শেষে ‘জয় বাংলা’ বাহিনীর ডেপুটি চীফ কামরুল আলম খান খসরু আনুষ্ঠানিকভাবে গান ফায়ার করেন এবং জাতীয় সংগীত পরিবেশিত হয়।

বাঙালির এই মুক্তিযুদ্ধ ছিলো মূলত একটি রাজনৈতিক ‘জনযুদ্ধ’। ১৯৬২ সাল থেকে সিরাজুল আলম খানের নেতৃত্বে অপ্রকাশ্যে স্বাধীনতার জন্য যে আন্দোলন সংগ্রাম পরিচালিত হয়, জাতির মনন প্রস্তুত করা হয়, ছাত্র-যুবকদের সশস্ত্র যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করা, অস্ত্র সংগ্রহ, ‘জয় বাংলা বাহিনী’ গঠন, ২ মার্চ স্বাধীন বাংলার মানচিত্র খচিত পতাকা উত্তোলন, ৩ মার্চ বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতিতেই স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ এবং ৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ—সবই ছিল অগ্নিঝরা মার্চের কীর্তি। ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধর-বাংলাদেশ স্বাধীন কর’, ‘তোমার আমার ঠিকানা পদ্মা-মেঘনা-যমুনা’, ‘জয়বাংলা’ স্লোগানসহ জাতির অস্তিত্বের নির্যাস হয়ে উঠেছিল এই আন্দোলন।

১৯৭১ সালের ১ মার্চ পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান বেতার ভাষণে ৩ মার্চ তারিখে গণপরিষদের অধিবেশন বাতিল করলে ছাত্র-জনতা বিক্ষুব্ধ হয়ে রাস্তায় নেমে পড়ে। এ সময় বঙ্গবন্ধু হোটেল পূর্বাণীতে পার্লামেন্টারী দলের বৈঠক করছিলেন। বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা সেখানে গিয়ে উপস্থিত হলে তিনি আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন। শুরু হয় স্বাধীনতার জন্য প্রত্যক্ষ আন্দোলন। ‘নিউক্লিয়াস’-এর পূর্ব সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে গড়ে উঠে ‘স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে ‘আমি যদি হুকুম দিবার নাও পারি, প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ, প্রতিরোধ গড়ে তোলা’র আহ্বান জানান। ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম-এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ জয়বাংলা বলেই বঙ্গবন্ধু তাঁর ভাষণ শেষ করেন।

২৩ মার্চ পাকিস্তানের প্রজাতন্ত্র দিবসের পরিবর্তে ‘বিএলএফ’ ও ‘স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদে’র পক্ষ থেকে প্রতিরোধ দিবস পালিত হয় এবং সারা দেশের ঘরে ঘরে স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলিত হয়। ছাত্রসমাজ ভোরে বঙ্গবন্ধুর বাড়ির ছাদে, হাইকোর্ট ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পতাকা উড়িয়ে দেয়। দুপুরে ‘জয় বাংলা বাহিনী’র পক্ষে ছাত্রসমাজ বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে গিয়ে তাঁর হাতে স্বাধীন বাংলার পতাকা তুলে দেয় এবং বঙ্গবন্ধুর গাড়িতে এক পাশে কালো পতাকা, অন্য পাশে বাংলাদেশের পতাকা বেঁধে দেয়।

একটি রাষ্ট্রের অভ্যুদয়, রাজনৈতিক সংগ্রাম জাতির সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফসল। ইতিহাস বিকৃতি, বিভাজন, সংঘাত-সংঘর্ষ ও মিথ্যাচার একটি জাতির ধ্বংসের প্রধান হাতিয়ার। তাই ২ মার্চের মতো ঐতিহাসিক দিনগুলোকে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্মরণ ও পালন করা জরুরি, যা আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রকৃত ইতিহাসকে সুরক্ষিত রাখবে এবং নতুন প্রজন্মকে সঠিক পথে পরিচালিত করবে।