ঢাকা ০৭:৪৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৩ মার্চ ২০২৬

বাম্পার ফলনও কৃষকের মুখে হাসি নেই: উৎপাদন খরচের চেয়ে কম বাজারদর, লোকসানের চক্রে আলুচাষি

রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলায় চলতি মৌসুমে আলুর বাম্পার ফলন হলেও বাজারদর অত্যন্ত হতাশাজনক হওয়ায় কৃষকরা গভীর উদ্বেগে দিন পার করছেন। প্রতি কেজি আলু বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৮ থেকে ৯ টাকায়, যেখানে উৎপাদন খরচ গড়ে ১৪ থেকে ১৭ টাকা পর্যন্ত পড়ছে। মৌসুমের শুরুতেই এমন লোকসানের আশঙ্কা চাষিদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে।

রহিমাপুর রামপুরা গ্রামের কৃষক জাহিদুল ইসলাম জানান, গত বছর আলু চাষে তার প্রায় এক লাখ টাকার বেশি ক্ষতি হয়েছে। এবারও যদি একই পরিস্থিতি বজায় থাকে, তবে চাষাবাদ টিকিয়ে রাখা তার জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। তিনি বলেন, শ্রমিক, সার, কীটনাশক এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ মিলিয়ে প্রতি কেজি আলু উৎপাদনে তার ১৪ থেকে ১৬ টাকা পর্যন্ত ব্যয় হচ্ছে।

উপজেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত বছর উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নে ৪,৫৩০ হেক্টর জমিতে আলু চাষ করে ১ লাখ ৪২ হাজার ৯৫ মেট্রিক টন আলু উৎপাদন হয়েছিল। কিন্তু উপজেলায় মাত্র তিনটি হিমাগারের মোট ধারণক্ষমতা ছিল ১৬ হাজার টন। ফলে বিপুল পরিমাণ আলু সংরক্ষণের বাইরে থেকে যায়। অনেক কৃষক বাড়ির উঠান বা অস্থায়ী গুদামে আলু সংরক্ষণ করতে বাধ্য হন, যার একটি বড় অংশ নষ্ট হয়ে যায়। বাধ্য হয়ে শেষ পর্যন্ত কম দামে আলু বিক্রি করে দিতে হয়।

চলতি মৌসুমে আলুর আবাদ কিছুটা কমে ৩,৪৬৩ হেক্টরে নামলেও, কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী ফলন ভালো হয়েছে। তবে উৎপাদন ব্যয়ের তুলনায় বাজারদর কম থাকায় সেই ভালো ফলনই এখন কৃষকের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আলমপুর ইউনিয়নের পীরপাড়া গ্রামের মিলন মিয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “এভাবে লোকসান খেতে খেতে চলতে থাকলে আলুর আবাদ ছেড়ে দিতে হবে। এত কষ্ট করে চাষ করেও যদি ন্যায্য দাম না পাই, আমরা বাঁচব কীভাবে?” কুর্শা কাজীপাড়া গ্রামের চাষি এমদাদুল ইসলামও একই অভিযোগ করে বলেন, বারবার লোকসান হলে তারা আলু চাষ বাদ দিতে বাধ্য হবেন।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ধীবা রানী রায় স্বীকার করেছেন যে, উৎপাদন ভালো হলেও বাজারদর এবং সংরক্ষণ সংকটের কারণে চাষিরা বড় ধরনের লোকসানের শিকার হচ্ছেন। তিনি জানান, বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। হিমাগারের ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি পেলে আলু সংরক্ষণের সুবিধা বাড়বে। পাশাপাশি, এলাকায় আলু চিপস বা আলুজাত খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা গড়ে উঠলে কৃষকরা তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য পাবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

অন্যদিকে, আলুচাষিদের পক্ষ থেকে ন্যূনতম সহায়ক মূল্য নির্ধারণ, সরাসরি সরকারি ক্রয় কার্যক্রম জোরদার করা এবং হিমাগারের ধারণক্ষমতা বৃদ্ধির দাবি জানানো হয়েছে। এসব পদক্ষেপ দ্রুত বাস্তবায়ন না হলে প্রতি বছরই এই একই সংকটের পুনরাবৃত্তি ঘটবে বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

মধ্যপ্রাচ্যের উত্তাপ: শাহজালাল ও শাহ আমানতে ৪ দিনে ১৮২ ফ্লাইট বাতিল, ভোগান্তিতে হাজারো যাত্রী

বাম্পার ফলনও কৃষকের মুখে হাসি নেই: উৎপাদন খরচের চেয়ে কম বাজারদর, লোকসানের চক্রে আলুচাষি

আপডেট সময় : ০৬:১১:২৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ মার্চ ২০২৬

রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলায় চলতি মৌসুমে আলুর বাম্পার ফলন হলেও বাজারদর অত্যন্ত হতাশাজনক হওয়ায় কৃষকরা গভীর উদ্বেগে দিন পার করছেন। প্রতি কেজি আলু বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৮ থেকে ৯ টাকায়, যেখানে উৎপাদন খরচ গড়ে ১৪ থেকে ১৭ টাকা পর্যন্ত পড়ছে। মৌসুমের শুরুতেই এমন লোকসানের আশঙ্কা চাষিদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে।

রহিমাপুর রামপুরা গ্রামের কৃষক জাহিদুল ইসলাম জানান, গত বছর আলু চাষে তার প্রায় এক লাখ টাকার বেশি ক্ষতি হয়েছে। এবারও যদি একই পরিস্থিতি বজায় থাকে, তবে চাষাবাদ টিকিয়ে রাখা তার জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। তিনি বলেন, শ্রমিক, সার, কীটনাশক এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ মিলিয়ে প্রতি কেজি আলু উৎপাদনে তার ১৪ থেকে ১৬ টাকা পর্যন্ত ব্যয় হচ্ছে।

উপজেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত বছর উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নে ৪,৫৩০ হেক্টর জমিতে আলু চাষ করে ১ লাখ ৪২ হাজার ৯৫ মেট্রিক টন আলু উৎপাদন হয়েছিল। কিন্তু উপজেলায় মাত্র তিনটি হিমাগারের মোট ধারণক্ষমতা ছিল ১৬ হাজার টন। ফলে বিপুল পরিমাণ আলু সংরক্ষণের বাইরে থেকে যায়। অনেক কৃষক বাড়ির উঠান বা অস্থায়ী গুদামে আলু সংরক্ষণ করতে বাধ্য হন, যার একটি বড় অংশ নষ্ট হয়ে যায়। বাধ্য হয়ে শেষ পর্যন্ত কম দামে আলু বিক্রি করে দিতে হয়।

চলতি মৌসুমে আলুর আবাদ কিছুটা কমে ৩,৪৬৩ হেক্টরে নামলেও, কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী ফলন ভালো হয়েছে। তবে উৎপাদন ব্যয়ের তুলনায় বাজারদর কম থাকায় সেই ভালো ফলনই এখন কৃষকের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আলমপুর ইউনিয়নের পীরপাড়া গ্রামের মিলন মিয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “এভাবে লোকসান খেতে খেতে চলতে থাকলে আলুর আবাদ ছেড়ে দিতে হবে। এত কষ্ট করে চাষ করেও যদি ন্যায্য দাম না পাই, আমরা বাঁচব কীভাবে?” কুর্শা কাজীপাড়া গ্রামের চাষি এমদাদুল ইসলামও একই অভিযোগ করে বলেন, বারবার লোকসান হলে তারা আলু চাষ বাদ দিতে বাধ্য হবেন।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ধীবা রানী রায় স্বীকার করেছেন যে, উৎপাদন ভালো হলেও বাজারদর এবং সংরক্ষণ সংকটের কারণে চাষিরা বড় ধরনের লোকসানের শিকার হচ্ছেন। তিনি জানান, বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। হিমাগারের ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি পেলে আলু সংরক্ষণের সুবিধা বাড়বে। পাশাপাশি, এলাকায় আলু চিপস বা আলুজাত খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা গড়ে উঠলে কৃষকরা তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য পাবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

অন্যদিকে, আলুচাষিদের পক্ষ থেকে ন্যূনতম সহায়ক মূল্য নির্ধারণ, সরাসরি সরকারি ক্রয় কার্যক্রম জোরদার করা এবং হিমাগারের ধারণক্ষমতা বৃদ্ধির দাবি জানানো হয়েছে। এসব পদক্ষেপ দ্রুত বাস্তবায়ন না হলে প্রতি বছরই এই একই সংকটের পুনরাবৃত্তি ঘটবে বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন।