পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে দেশজুড়ে বইছে কেনাকাটার উৎসব। মুসলমানদের সবচেয়ে বড় এই ধর্মীয় উৎসবকে ঘিরে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত সকলে। এরই মধ্যে প্রাচ্যের ম্যানচেস্টার খ্যাত নরসিংদীর শেখেরচর বাবুরহাট পাইকারি বাজারে জমে উঠেছে ঈদ কেনাবেচা। দেশের প্রায় সিংহভাগ কাপড়ের চাহিদা পূরণকারী এই ঐতিহ্যবাহী হাটে ঈদ উপলক্ষে ক্রেতা-বিক্রেতাদের উপচেপড়া ভিড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
শত বছরের পুরনো এই বাবুরহাটকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে অসংখ্য টেক্সটাইল কারখানা। এসব কারখানায় উৎপাদিত শাড়ি, লুঙ্গি, বেডশিট, গামছা, থান কাপড়, মশারি সহ নানা ধরনের বস্ত্র দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে। সাধারণত সপ্তাহের বৃহস্পতিবার, শুক্রবার ও শনিবার এই তিন দিন বাবুরহাটে দুই থেকে আড়াইশ কোটি টাকার কাপড় কেনাবেচা হয়। তবে রমজান মাস জুড়ে, বিশেষ করে ঈদের আগমনের সাথে সাথে এই বিক্রি হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ব্যবসায়ীরা সুলভ মূল্যে ও উন্নত মানের কাপড় সংগ্রহ করতে ছুটে আসেন এখানে। রমজানের শুরু থেকে দ্বিতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত ব্যবসায়ীরা দম ফেলার ফুরসত পান না। বিক্রেতারা জানান, বিগত সময়ের চেয়ে এবার বেচাবিক্রি অনেক ভালো এবং তাদের মুখে হাসি ফুটেছে। দেশের প্রায় ৭০ ভাগ দেশীয় খুচরা কাপড়ের চাহিদা এই ঐতিহ্যবাহী বাবুরহাটের কাপড় পূরণ করে থাকে। পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে শাড়ি, লুঙ্গি, থ্রি-পিস থেকে শুরু করে রোমাল, টুপি, মোজা – সবকিছুই পাওয়া যায় এখানে।
ঈদের প্রস্তুতির সাথে সাথে বাবুরহাটের প্রতিটি অলিগলি এখন দেশি-বিদেশি ক্রেতা-বিক্রেতাদের পদচারণায় মুখর। সাশ্রয়ী দামে মানসম্মত কাপড় পাওয়ায় পাইকারি ক্রেতাদের পাশাপাশি খুচরা ক্রেতারাও ভিড় জমাচ্ছেন। এতে ব্যবসায়ীরাও ব্যস্ত সময় পার করছেন এবং খুশি। প্রায় পাঁচ হাজার দোকানি বাহারি ডিজাইনের শাড়ি, লুঙ্গি, থ্রি-পিস, বেডশিট, পর্দা, গামছাসহ নানা ধরনের পোশাকের পসরা সাজিয়ে বসেছেন।
গাজীপুরের কাপাশিয়া থেকে কাপড় কিনতে আসা নারী উদ্যোক্তা আফিয়া বেগম বলেন, “নরসিংদীর শেখেরচর বাবুরহাট কাপড়ের জন্য সবচেয়ে জনপ্রিয়। কারণ এক বাজারেই শাড়ি, লুঙ্গি, থ্রি-পিস, বেডশিট, পর্দা, গামছাসহ সব ধরনের কাপড় সুলভ মূল্যে পাওয়া যায়। তাই আমাদের কাছে বাবুরহাটের কাপড়ই প্রথম পছন্দ।”
বাজারের পাকিজা ফেব্রিক্স কালেকশনের উপব্যবস্থাপক মো. আলমগীর হোসেন জানান, “দেশের বর্তমান পরিস্থিতি ভালো হওয়ায় পাইকারি ক্রেতারাও স্বতঃস্ফূর্তভাবে হাটে আসছেন এবং তাদের চাহিদা অনুযায়ী কাপড় নিয়ে যাচ্ছেন। এবার রমজানের প্রথম সপ্তাহে বিক্রি সবচেয়ে বেশি ছিল। এখন পাইকারি বেচাকেনা কিছুটা কমে আসছে। তবে ঈদকে কেন্দ্র করে কাপড়ে বৈচিত্র্য আনা হয়েছে এবং দামও খুব বেশি বাড়ানো হয়নি।”
শেখেরচর (বাবুরহাট) বাজার বণিক সমিতির সভাপতি মো. বোরহান উদ্দিন বলেন, “প্রাচ্যের ম্যানচেস্টার খ্যাত বাবুরহাট শুধু বাংলাদেশ নয়, এশিয়ার অন্যতম সেরা কাপড়ের বাজার। এখানে নিশ্চিত নিরাপত্তা ও সুলভ মূল্যে কাপড় কিনতে দেশের সব জেলার মানুষ আসেন। নতুন সরকার গঠনের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় বড় ব্যবসায়ীরা আস্থা ফিরে পেয়েছেন। ঈদ ছাড়া সপ্তাহে দুই থেকে আড়াইশ কোটি টাকার বিক্রি হয়, আর রমজান মাসে তা হাজার কোটি ছাড়িয়ে যায়। জেলা প্রশাসন, পুলিশ এবং স্থানীয় সংসদ সদস্য নিয়মিত বাজার তদারকি করছেন।”
নরসিংদী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক পরিচালক মোহাম্মদ আল-আমিন রহমান বলেন, “এখানকার শাড়ি, লুঙ্গি ও থান কাপড় শুধু দেশেই নয়, বিদেশেও যাচ্ছে। গুণগত মানের জন্য সারা দেশে এর চাহিদা রয়েছে। তবে বাজারের কিছু সংস্কার প্রয়োজন। সামান্য বৃষ্টিতেই পানি জমে যায় এবং অগ্নিকাণ্ডের মতো দুর্ঘটনায় ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হন।”
রিপোর্টারের নাম 

























