মোবাইল অ্যাপ ডাউনলোড করুন
ঢাকা ০৯:০৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৫ অগাস্ট ২০২৬

১০ মাস ধরে টেকনাফ স্থলবন্দর অচল: থমকে গেছে সীমান্ত বাণিজ্য, অনিশ্চিত হাজারো শ্রমিকের জীবন

প্রতিবেশী মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার কারণে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ টেকনাফ স্থলবন্দর টানা ১০ মাস ধরে অচল হয়ে পড়েছে। এর ফলে নাফ নদী দিয়ে পণ্য পরিবহন ও সীমান্ত বাণিজ্য সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। এই অচলাবস্থা একদিকে যেমন দেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, তেমনি কোটি কোটি টাকার ব্যবসায়িক ক্ষতি এবং হাজারেরও বেশি বন্দরশ্রমিকের জীবনে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। বর্তমান সরকার এই সংকট নিরসনে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেবে—এমন প্রত্যাশায় প্রহর গুনছেন বন্দর সংশ্লিষ্ট সবাই।

থমকে গেছে বাণিজ্য, আটকা পড়েছে শত কোটি টাকা
স্থলবন্দর ব্যবসায়ীদের তথ্যমতে, দীর্ঘ ১০ মাস ধরে আমদানি-রপ্তানি বন্ধ থাকায় তাদের শত শত কোটি টাকা মিয়ানমারের ব্যবসায়ীদের কাছে আটকা পড়েছে। গুদামে পড়ে থাকা বিপুল পরিমাণ আমদানিকৃত মালামালও পচে নষ্ট হচ্ছে, যা ব্যবসায়ীদের লোকসানের পাল্লা আরও ভারী করছে। টেকনাফ স্থলবন্দর সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক এহতেশামুল হক বাহাদুর জানান, ব্যবসায়িক কার্যক্রম বন্ধ থাকায় তারা চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন। ব্যাংক ঋণের কিস্তি, অফিসের ভাড়া ও কর্মচারীদের বেতন পরিশোধ করা এখন তাদের জন্য দুঃসাধ্য হয়ে উঠেছে। এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে অনেক ব্যবসায়ী দেউলিয়া হওয়ার উপক্রম হবে বলেও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

মানবেতর জীবনযাপন করছেন হাজারো শ্রমিক
বন্দরকেন্দ্রিক জীবন ও জীবিকা যাদের, সেই শ্রমিকদের অবস্থা এখন সবচেয়ে করুণ। টানা কাজ না থাকায় অনেকেই ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন এবং পরিবার নিয়ে দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন। স্থানীয় এক শ্রমিক, আবুল হাসেম আক্ষেপ করে বলেন, “১০ মাস ধরে কোনো কাজ নেই, সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। ধারদেনা করে দিন কাটছে, সন্তানদের পড়াশোনার খরচ জোগাতে পারছি না। দ্রুত বন্দর চালু না হলে আমাদের টিকে থাকাই অসম্ভব হয়ে পড়বে।” হাজারো শ্রমিক এখন ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় ভুগছেন এবং কাজের সন্ধানে ভিন্ন পেশার দিকে ঝুঁকতে বাধ্য হচ্ছেন।

রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার
একইভাবে, এই অচলাবস্থার কারণে সরকারও বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। পূর্বে এই বন্দর দিয়ে কাঠ, শুঁটকি, আদা, পেঁয়াজসহ বিভিন্ন নিত্যপণ্য নিয়মিত আমদানি হতো, যা সরকারের কোষাগারে উল্লেখযোগ্য রাজস্ব যোগান দিত। বর্তমানে সেই রাজস্ব প্রবাহ সম্পূর্ণ বন্ধ, যা জাতীয় অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলছে।

মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংকটই মূল কারণ
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র সংগঠন ‘আরাকান আর্মি’র হাতে চলে যাওয়ার পর থেকেই সীমান্তে এই অস্থিরতা চরম আকার ধারণ করেছে। নাফ নদীতে নিরাপত্তার ঝুঁকি এবং ওপার থেকে বাধার কারণে পণ্যবাহী ট্রলার বা জাহাজ চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। পরিস্থিতি কবে নাগাদ স্বাভাবিক হবে, সে বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষ থেকেই সুনির্দিষ্ট কোনো ঘোষণা নেই।

কূটনৈতিক উদ্যোগের প্রত্যাশা
ব্যবসায়ী ও বন্দর সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নতুন সরকার চাইলে কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে টেকনাফ স্থলবন্দরের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম দ্রুত স্বাভাবিক করতে পারে। তাদের মতে, এতে একদিকে যেমন স্থানীয় অর্থনীতি চাঙ্গা হবে, তেমনি ব্যবসায়ীরাও বড় ধরনের লোকসানের হাত থেকে রক্ষা পাবেন এবং হাজারো শ্রমিকের জীবিকা ফিরে আসবে। তারা সরকারের কাছে দ্রুত এই সমস্যা সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছেন।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

জার্মানির নদীগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে: পানির স্তর নেমেছে রেকর্ড তলানিতে

১০ মাস ধরে টেকনাফ স্থলবন্দর অচল: থমকে গেছে সীমান্ত বাণিজ্য, অনিশ্চিত হাজারো শ্রমিকের জীবন

আপডেট সময় : ০৬:১২:০৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ মার্চ ২০২৬

প্রতিবেশী মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার কারণে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ টেকনাফ স্থলবন্দর টানা ১০ মাস ধরে অচল হয়ে পড়েছে। এর ফলে নাফ নদী দিয়ে পণ্য পরিবহন ও সীমান্ত বাণিজ্য সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। এই অচলাবস্থা একদিকে যেমন দেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, তেমনি কোটি কোটি টাকার ব্যবসায়িক ক্ষতি এবং হাজারেরও বেশি বন্দরশ্রমিকের জীবনে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। বর্তমান সরকার এই সংকট নিরসনে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেবে—এমন প্রত্যাশায় প্রহর গুনছেন বন্দর সংশ্লিষ্ট সবাই।

থমকে গেছে বাণিজ্য, আটকা পড়েছে শত কোটি টাকা
স্থলবন্দর ব্যবসায়ীদের তথ্যমতে, দীর্ঘ ১০ মাস ধরে আমদানি-রপ্তানি বন্ধ থাকায় তাদের শত শত কোটি টাকা মিয়ানমারের ব্যবসায়ীদের কাছে আটকা পড়েছে। গুদামে পড়ে থাকা বিপুল পরিমাণ আমদানিকৃত মালামালও পচে নষ্ট হচ্ছে, যা ব্যবসায়ীদের লোকসানের পাল্লা আরও ভারী করছে। টেকনাফ স্থলবন্দর সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক এহতেশামুল হক বাহাদুর জানান, ব্যবসায়িক কার্যক্রম বন্ধ থাকায় তারা চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন। ব্যাংক ঋণের কিস্তি, অফিসের ভাড়া ও কর্মচারীদের বেতন পরিশোধ করা এখন তাদের জন্য দুঃসাধ্য হয়ে উঠেছে। এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে অনেক ব্যবসায়ী দেউলিয়া হওয়ার উপক্রম হবে বলেও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

মানবেতর জীবনযাপন করছেন হাজারো শ্রমিক
বন্দরকেন্দ্রিক জীবন ও জীবিকা যাদের, সেই শ্রমিকদের অবস্থা এখন সবচেয়ে করুণ। টানা কাজ না থাকায় অনেকেই ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন এবং পরিবার নিয়ে দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন। স্থানীয় এক শ্রমিক, আবুল হাসেম আক্ষেপ করে বলেন, “১০ মাস ধরে কোনো কাজ নেই, সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। ধারদেনা করে দিন কাটছে, সন্তানদের পড়াশোনার খরচ জোগাতে পারছি না। দ্রুত বন্দর চালু না হলে আমাদের টিকে থাকাই অসম্ভব হয়ে পড়বে।” হাজারো শ্রমিক এখন ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় ভুগছেন এবং কাজের সন্ধানে ভিন্ন পেশার দিকে ঝুঁকতে বাধ্য হচ্ছেন।

রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার
একইভাবে, এই অচলাবস্থার কারণে সরকারও বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। পূর্বে এই বন্দর দিয়ে কাঠ, শুঁটকি, আদা, পেঁয়াজসহ বিভিন্ন নিত্যপণ্য নিয়মিত আমদানি হতো, যা সরকারের কোষাগারে উল্লেখযোগ্য রাজস্ব যোগান দিত। বর্তমানে সেই রাজস্ব প্রবাহ সম্পূর্ণ বন্ধ, যা জাতীয় অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলছে।

মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংকটই মূল কারণ
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র সংগঠন ‘আরাকান আর্মি’র হাতে চলে যাওয়ার পর থেকেই সীমান্তে এই অস্থিরতা চরম আকার ধারণ করেছে। নাফ নদীতে নিরাপত্তার ঝুঁকি এবং ওপার থেকে বাধার কারণে পণ্যবাহী ট্রলার বা জাহাজ চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। পরিস্থিতি কবে নাগাদ স্বাভাবিক হবে, সে বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষ থেকেই সুনির্দিষ্ট কোনো ঘোষণা নেই।

কূটনৈতিক উদ্যোগের প্রত্যাশা
ব্যবসায়ী ও বন্দর সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নতুন সরকার চাইলে কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে টেকনাফ স্থলবন্দরের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম দ্রুত স্বাভাবিক করতে পারে। তাদের মতে, এতে একদিকে যেমন স্থানীয় অর্থনীতি চাঙ্গা হবে, তেমনি ব্যবসায়ীরাও বড় ধরনের লোকসানের হাত থেকে রক্ষা পাবেন এবং হাজারো শ্রমিকের জীবিকা ফিরে আসবে। তারা সরকারের কাছে দ্রুত এই সমস্যা সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছেন।