পবিত্র রমজান মাস উপলক্ষে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছে সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)। দেশজুড়ে এই কার্যক্রম কিছুটা স্বস্তি দিলেও রাজশাহী মহানগরীতে তা ঘিরে দেখা দিয়েছে চরম ভোগান্তি ও অনিয়মের অভিযোগ। ডিলারদের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্ব, সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পণ্য হাতিয়ে নেওয়া এবং সময়মতো ট্রাক না আসার কারণে ঘণ্টার পর ঘণ্টা রোজা রেখে লাইনে দাঁড়িয়েও বহু ক্রেতা খালি হাতে ফিরছেন।
সরেজমিন নগরীর দরগাপাড়া, সাহেববাজার, লক্ষ্মীপুর, বালিয়াপুকুর, শাহমখদুম ও কাদিরগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিদিন ১৫টি পয়েন্টে টিসিবির ট্রাকের সামনে সকাল থেকেই ভিড় জমাচ্ছেন শত শত মানুষ। সকাল ১০টায় পণ্য বিতরণের কথা থাকলেও অধিকাংশ স্থানেই ট্রাক পৌঁছায় বেলা সাড়ে ১১টা থেকে দুপুর ১২টার দিকে। তীব্র রোদে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পর ট্রাক এলেও চাহিদার তুলনায় সরবরাহ অপ্রতুল হওয়ায় অনেকেই পণ্য না পেয়েই হতাশ হয়ে ফিরতে বাধ্য হচ্ছেন।
আগে টিসিবির লাইনে মূলত নিম্নআয়ের মানুষের উপস্থিতি দেখা গেলেও, বর্তমানে মধ্যবিত্ত এমনকি সচ্ছল পরিবারের সদস্যরাও সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য কিনতে লাইনে দাঁড়াচ্ছেন। কেউ কেউ লোকলজ্জার ভয়ে মুখ ঢেকে পণ্য কিনছেন, আবার কেউ গৃহকর্মীকে দিয়ে পণ্য সংগ্রহ করাচ্ছেন। নগরীর কাজলা মোড়ে পণ্য কেনা নুরুল হক বলেন, “আগে টিসিবির লাইনে দাঁড়াতে সংকোচ লাগত, কিন্তু এখন টাকা দিয়ে বাজার করছি, তাই আর সংকোচ হয় না। কিছু পণ্য সাশ্রয়ে কিনতে পারছি- এটাই বড় কথা।”
তবে অভিযোগের পাল্লা ভারী হচ্ছে অব্যবস্থাপনা ও পক্ষপাতিত্বের কারণে। কাদিরগঞ্জ নগরভবনের পশ্চিম পাশে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা নাসরিন বেওয়া ক্ষোভের সঙ্গে জানান, সকাল ৯টা থেকে দাঁড়িয়ে আছেন, কিন্তু ট্রাক এসেছে দুপুর ১২টায়। প্রায় এক হাজার মানুষ জড়ো হলেও লাইনে না দাঁড়িয়েই অনেকে পণ্য পেয়ে যাচ্ছে। সাহেববাজার বড় মসজিদের সামনে থেকে পণ্য কিনতে আসা কামরুল হাসান অভিযোগ করেন, বাজারের তুলনায় টিসিবির পণ্য অনেক সাশ্রয়ী হলেও ডিলারের লোকজন পক্ষপাতিত্ব করছে। একই ব্যক্তিকে একাধিকবার পণ্য নিতে দেখা গেছে, ফলে প্রকৃত ক্রেতারা বঞ্চিত হচ্ছেন।
টিসিবি সূত্রে জানা গেছে, প্রতিটি ট্রাকে ৫৯০ টাকায় পাঁচ ধরনের পণ্যের একটি প্যাকেজ বিক্রি করা হচ্ছে। এতে রয়েছে দুই লিটার ভোজ্যতেল, দুই কেজি মসুর ডাল, এক কেজি চিনি, এক কেজি ছোলা ও আধা কেজি খেজুর। এবার প্রতি ট্রাকে ৪০০ জন ক্রেতাকে পণ্য দেওয়া হচ্ছে, যা গত বছর ছিল ২০০ জন। তবুও চাহিদার তুলনায় সরবরাহ অপ্রতুল হওয়ায় বিশৃঙ্খলা বাড়ছে। অভিযোগ উঠেছে, একটি চক্র একাধিকবার লাইনে দাঁড়িয়ে পণ্য সংগ্রহ করে খোলাবাজারে বেশি দামে বিক্রি করছে। এছাড়া ডিলারের পরিচিতদের অগ্রাধিকার দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। লাইনে দাঁড়ানো নিয়ে ক্রেতাদের মধ্যে হুড়োহুড়ি, ধাক্কাধাক্কি এমনকি হাতাহাতির ঘটনাও ঘটছে।
এ বিষয়ে টিসিবির রাজশাহী অঞ্চলের উপপরিচালক আতিকুর রহমান বলেন, পণ্যের মান ভালো ও দাম কম হওয়ায় একটি চক্র বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করছে। তারা ইচ্ছাকৃতভাবে প্রকৃত ক্রেতাদের বঞ্চিত করছে। তিনি আরও জানান, এই প্রতারক চক্র ঠেকাতে প্রয়োজনীয় বাড়তি জনবল নেই। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সিটি করপোরেশনসহ অন্যান্য সংস্থাকে চিঠি দিয়ে সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। তাদের সহযোগিতা পেলে বিশৃঙ্খলা কিছুটা কমবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। তবে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, শুধু আশ্বাস নয়, এই রমজানে রোজাদারদের ভোগান্তি কমাতে দ্রুত বাস্তব ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হোক।
রিপোর্টারের নাম 

























