ঢাকা ১১:১৮ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০২ মার্চ ২০২৬

নবনির্বাচিত সরকারের কাছে উপকূলবাসীর আকুতি: টেকসই উন্নয়নের প্রত্যাশা

দেশের বিস্তীর্ণ উপকূলীয় অঞ্চল, যেখানে লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন-জীবিকা প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত, আজ এক নতুন সরকারের কাছে তাদের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও বঞ্চনার অবসানের আশা নিয়ে তাকিয়ে আছে। সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাটের মতো জেলাগুলো নিয়ে গঠিত দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের এই জনপদ, প্রায় ৫০ লাখেরও বেশি মানুষের আবাসস্থল। এরা মূলত নদ-নদী ও সুন্দরের উপর নির্ভরশীল। ঝড়-জলোচ্ছ্বাস, রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকা এই মানুষগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবের শিকার। দেশের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া অধিকাংশ প্রাকৃতিক দুর্যোগের ভয়াবহতা সবচেয়ে বেশি আঘাত হেনেছে এখানেই। অবশ্য, সুন্দরবনের প্রাকৃতিক প্রাচীর অনেক ক্ষেত্রে এই অঞ্চলকে রক্ষা করেছে। অর্থনীতির জন্য অপার সম্ভাবনাময় এই জনপদ দীর্ঘকাল ধরে দেশের উন্নয়নে অবদান রাখলেও, নানা দিক থেকে তারা পিছিয়ে আছে। জলাবদ্ধতা, সুপেয় পানির অভাব, এবং স্বাস্থ্যসেবার মতো মৌলিক সমস্যাগুলো তাদের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। বছরের পর বছর ধরে এই সমস্যাগুলোর কোনো স্থায়ী সমাধান না হওয়ায়, অনেক পরিবার তাদের ভিটেমাটি ছেড়ে শহরের দিকে পাড়ি জমাতে বাধ্য হচ্ছে। এর ফলে একদিকে যেমন জাতীয় অর্থনীতিতে এই অঞ্চলের অবদান হ্রাস পাচ্ছে, তেমনি শহর জীবনে নতুন করে নানা সংকট সৃষ্টি হচ্ছে।

পূর্ববর্তী সরকারগুলোর আমলে উপকূলীয় অঞ্চলের উন্নয়নে বেশ কিছু মেগা প্রকল্প গ্রহণ করা হলেও, সেগুলোর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নানা জটিলতায় বাধাগ্রস্ত হয়েছে। কিছু প্রকল্প জনগণের জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে শুরু হলেও, মাঠ পর্যায়ে তা আশানুরূপ ফল দেয়নি। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম ও গাফিলতির কারণে অনেক প্রকল্পের কাজ ধীর গতিতে চলছে। এই জাতীয় সমস্যাগুলো থেকে উত্তরণ এখন সময়ের দাবি। নতুন সরকার, যার নেতৃত্বে আছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, উপকূলবাসীর জন্য নতুন আশার আলো নিয়ে এসেছে। তাদের প্রত্যাশা, এই সরকার উপকূলীয় অঞ্চলের সমস্যা সমাধানে আরও আন্তরিক হবে। টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ, লোনা পানির আগ্রাসন থেকে কৃষিজমি রক্ষা, এবং সুপেয় পানির সংকট নিরসনে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই অঞ্চলের মানুষের স্থানান্তরের হার বৃদ্ধি পেয়েছে। এর প্রধান কারণ হলো জীবিকা হারানো। অতীতে নদীতে জাল ফেললেই পর্যাপ্ত মাছ মিলত, কিন্তু বর্তমানে তা দুর্লভ। কিছু অসাধু চক্র নদীতে বিষ প্রয়োগ করে মাছ ধরছে, যা জলজ পরিবেশকে দূষিত করছে এবং মাছের বংশবৃদ্ধি মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করছে। এই অনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে ভবিষ্যতে মৎস্য সম্পদ আরও হ্রাস পাবে। সুন্দরবনের উপর নির্ভরশীল বনজীবীদের জীবনও হুমকির মুখে। সম্প্রতি বনদস্যুদের তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে। মধু বা গোলপাতা সংগ্রহের মতো বৈধ কাজেও তারা বনজীবীদের মুক্তিপণের জন্য জিম্মি করছে, যা অনেক পরিবারকে নিঃস্ব করে দিচ্ছে। কর্মসংস্থানের অভাব এবং লোনা পানির আগ্রাসনের কারণে কৃষকরাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। আগে যেখানে বছরে দুই-তিনবার ফসল ফলানো যেত, এখন তা সম্ভব হচ্ছে না। আমন ও আউশ ধানের উৎপাদন প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে, যা কৃষি উৎপাদনকে ব্যাহত করছে এবং কৃষিজমির পরিমাণও হ্রাস করছে। এসব সমস্যার স্থায়ী সমাধানে বর্তমান সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সক্রিয় ভূমিকা পালন করা অপরিহার্য। তাদের জীবন-জীবিকা নিরাপদ করতে এবং কর্মসংস্থান বাড়াতে নতুন প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে, তবে অবশ্যই তা যেন পরিবেশ ও স্থানীয় পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।

সরকারের পরিবর্তন হলেও, উপকূলীয় অঞ্চলের স্বাস্থ্যসেবার তেমন কোনো উন্নয়ন পরিলক্ষিত হয় না। লক্ষ লক্ষ মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি অবহেলিত থেকে যাচ্ছে। বিশেষ করে, নারীরা লোনা পানিতে দীর্ঘক্ষণ কাজ করার ফলে জরায়ু ও প্রজনন অঙ্গের বিভিন্ন সংক্রমণে ভুগছেন। উন্নতমানের হাসপাতাল বা জরুরি চিকিৎসার জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা এখানে নেই। সন্তান প্রসবের ক্ষেত্রে গর্ভবতী নারীরা উচ্চঝুঁকিতে থাকেন। দুর্গম অঞ্চলে দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছানোর জন্য উন্নত রাস্তা বা অ্যাম্বুলেন্স ব্যবস্থার অভাবও প্রকট। অর্থনৈতিকভাবে অসচ্ছল পরিবারগুলো তাদের সন্তানদের শিক্ষাদীক্ষার ব্যবস্থা করতে পারছে না। এসব অঞ্চলে জীবনমুখী ও কারিগরি শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। দুর্গম দ্বীপ বা ম্যানগ্রোভ অঞ্চলে নৌকায় পরিচালিত স্কুল বা ভ্রাম্যমাণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কার্যকর সমাধান হতে পারে।

এই অঞ্চলের মানুষ আশা করে, বর্তমান সরকার তাদের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও সমস্যাগুলো সমাধানে দ্রুত পদক্ষেপ নেবে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো উপকূলকে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির মূলধারায় ফিরিয়ে আনতে কাজ করবে। জেলেদের জীবনে সুদিন ফিরিয়ে আনতে এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে নজর দেবে। সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত করে বনজীবীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। পাশাপাশি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে উপকূলীয় মানুষের জীবনমানের আমূল পরিবর্তন আনবে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ফুলবাড়ী মডেল প্রেসক্লাবের ২য় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত: সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিকতার অঙ্গীকার

নবনির্বাচিত সরকারের কাছে উপকূলবাসীর আকুতি: টেকসই উন্নয়নের প্রত্যাশা

আপডেট সময় : ০৯:২৮:১৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২ মার্চ ২০২৬

দেশের বিস্তীর্ণ উপকূলীয় অঞ্চল, যেখানে লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন-জীবিকা প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত, আজ এক নতুন সরকারের কাছে তাদের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও বঞ্চনার অবসানের আশা নিয়ে তাকিয়ে আছে। সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাটের মতো জেলাগুলো নিয়ে গঠিত দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের এই জনপদ, প্রায় ৫০ লাখেরও বেশি মানুষের আবাসস্থল। এরা মূলত নদ-নদী ও সুন্দরের উপর নির্ভরশীল। ঝড়-জলোচ্ছ্বাস, রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকা এই মানুষগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবের শিকার। দেশের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া অধিকাংশ প্রাকৃতিক দুর্যোগের ভয়াবহতা সবচেয়ে বেশি আঘাত হেনেছে এখানেই। অবশ্য, সুন্দরবনের প্রাকৃতিক প্রাচীর অনেক ক্ষেত্রে এই অঞ্চলকে রক্ষা করেছে। অর্থনীতির জন্য অপার সম্ভাবনাময় এই জনপদ দীর্ঘকাল ধরে দেশের উন্নয়নে অবদান রাখলেও, নানা দিক থেকে তারা পিছিয়ে আছে। জলাবদ্ধতা, সুপেয় পানির অভাব, এবং স্বাস্থ্যসেবার মতো মৌলিক সমস্যাগুলো তাদের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। বছরের পর বছর ধরে এই সমস্যাগুলোর কোনো স্থায়ী সমাধান না হওয়ায়, অনেক পরিবার তাদের ভিটেমাটি ছেড়ে শহরের দিকে পাড়ি জমাতে বাধ্য হচ্ছে। এর ফলে একদিকে যেমন জাতীয় অর্থনীতিতে এই অঞ্চলের অবদান হ্রাস পাচ্ছে, তেমনি শহর জীবনে নতুন করে নানা সংকট সৃষ্টি হচ্ছে।

পূর্ববর্তী সরকারগুলোর আমলে উপকূলীয় অঞ্চলের উন্নয়নে বেশ কিছু মেগা প্রকল্প গ্রহণ করা হলেও, সেগুলোর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নানা জটিলতায় বাধাগ্রস্ত হয়েছে। কিছু প্রকল্প জনগণের জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে শুরু হলেও, মাঠ পর্যায়ে তা আশানুরূপ ফল দেয়নি। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম ও গাফিলতির কারণে অনেক প্রকল্পের কাজ ধীর গতিতে চলছে। এই জাতীয় সমস্যাগুলো থেকে উত্তরণ এখন সময়ের দাবি। নতুন সরকার, যার নেতৃত্বে আছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, উপকূলবাসীর জন্য নতুন আশার আলো নিয়ে এসেছে। তাদের প্রত্যাশা, এই সরকার উপকূলীয় অঞ্চলের সমস্যা সমাধানে আরও আন্তরিক হবে। টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ, লোনা পানির আগ্রাসন থেকে কৃষিজমি রক্ষা, এবং সুপেয় পানির সংকট নিরসনে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই অঞ্চলের মানুষের স্থানান্তরের হার বৃদ্ধি পেয়েছে। এর প্রধান কারণ হলো জীবিকা হারানো। অতীতে নদীতে জাল ফেললেই পর্যাপ্ত মাছ মিলত, কিন্তু বর্তমানে তা দুর্লভ। কিছু অসাধু চক্র নদীতে বিষ প্রয়োগ করে মাছ ধরছে, যা জলজ পরিবেশকে দূষিত করছে এবং মাছের বংশবৃদ্ধি মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করছে। এই অনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে ভবিষ্যতে মৎস্য সম্পদ আরও হ্রাস পাবে। সুন্দরবনের উপর নির্ভরশীল বনজীবীদের জীবনও হুমকির মুখে। সম্প্রতি বনদস্যুদের তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে। মধু বা গোলপাতা সংগ্রহের মতো বৈধ কাজেও তারা বনজীবীদের মুক্তিপণের জন্য জিম্মি করছে, যা অনেক পরিবারকে নিঃস্ব করে দিচ্ছে। কর্মসংস্থানের অভাব এবং লোনা পানির আগ্রাসনের কারণে কৃষকরাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। আগে যেখানে বছরে দুই-তিনবার ফসল ফলানো যেত, এখন তা সম্ভব হচ্ছে না। আমন ও আউশ ধানের উৎপাদন প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে, যা কৃষি উৎপাদনকে ব্যাহত করছে এবং কৃষিজমির পরিমাণও হ্রাস করছে। এসব সমস্যার স্থায়ী সমাধানে বর্তমান সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সক্রিয় ভূমিকা পালন করা অপরিহার্য। তাদের জীবন-জীবিকা নিরাপদ করতে এবং কর্মসংস্থান বাড়াতে নতুন প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে, তবে অবশ্যই তা যেন পরিবেশ ও স্থানীয় পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।

সরকারের পরিবর্তন হলেও, উপকূলীয় অঞ্চলের স্বাস্থ্যসেবার তেমন কোনো উন্নয়ন পরিলক্ষিত হয় না। লক্ষ লক্ষ মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি অবহেলিত থেকে যাচ্ছে। বিশেষ করে, নারীরা লোনা পানিতে দীর্ঘক্ষণ কাজ করার ফলে জরায়ু ও প্রজনন অঙ্গের বিভিন্ন সংক্রমণে ভুগছেন। উন্নতমানের হাসপাতাল বা জরুরি চিকিৎসার জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা এখানে নেই। সন্তান প্রসবের ক্ষেত্রে গর্ভবতী নারীরা উচ্চঝুঁকিতে থাকেন। দুর্গম অঞ্চলে দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছানোর জন্য উন্নত রাস্তা বা অ্যাম্বুলেন্স ব্যবস্থার অভাবও প্রকট। অর্থনৈতিকভাবে অসচ্ছল পরিবারগুলো তাদের সন্তানদের শিক্ষাদীক্ষার ব্যবস্থা করতে পারছে না। এসব অঞ্চলে জীবনমুখী ও কারিগরি শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। দুর্গম দ্বীপ বা ম্যানগ্রোভ অঞ্চলে নৌকায় পরিচালিত স্কুল বা ভ্রাম্যমাণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কার্যকর সমাধান হতে পারে।

এই অঞ্চলের মানুষ আশা করে, বর্তমান সরকার তাদের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও সমস্যাগুলো সমাধানে দ্রুত পদক্ষেপ নেবে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো উপকূলকে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির মূলধারায় ফিরিয়ে আনতে কাজ করবে। জেলেদের জীবনে সুদিন ফিরিয়ে আনতে এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে নজর দেবে। সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত করে বনজীবীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। পাশাপাশি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে উপকূলীয় মানুষের জীবনমানের আমূল পরিবর্তন আনবে।