ঢাকা ০৭:৩৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

অমর একুশে বইমেলায় বায়োস্কোপের জাদু: অপু ও দিপুর গল্পে মগ্ন শৈশব

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৫:৪৯:২৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ২ বার পড়া হয়েছে

অমর একুশে বইমেলা ২০২৬ এর দ্বিতীয় দিনে বইয়ের সুবাসের পাশাপাশি শিশুদের জন্যও রয়েছে উপচে পড়া আনন্দ। রঙিন বই, মনকাড়া খেলনা আর নানা আয়োজনের ভিড়ে শিশুদের বিশেষ আকর্ষণ হয়ে উঠেছে এক সময়ের জনপ্রিয় বিনোদন মাধ্যম – বায়োস্কোপ। ডিজিটাল ডিভাইসের এই যুগে পুরোনো দিনের সেই বায়োস্কোপ শিশুদের কৌতূহল আর মুগ্ধতার নতুন এক জগৎ উন্মোচন করেছে।

মেলার শিশু কর্নারে ‘কাকতাড়ুয়া পাপেট থিয়েটার’ এর ছোট্ট একটি বায়োস্কোপের সামনে সারাক্ষণই লেগে আছে শিশুদের ভিড়। কৌতূহলী চোখে তারা একে একে উঁকি দিচ্ছে বায়োস্কোপের ছোট গোল জানালায়। ভেতরে কী লুকানো আছে, সেই রহস্য জানতে পারলেই তাদের চোখে-মুখে ফুটে উঠছে এক অন্যরকম আনন্দ। আট বছর বয়সী ইউসুফ আলম আয়ান, মামা রাসেল সরকারের সাথে বাসাবো থেকে মেলায় এসে প্রথমবারের মতো বায়োস্কোপ দেখে মুগ্ধ। বিস্ময়ভরা কণ্ঠে সে জানায়, “আমি প্রথমবার দেখলাম। এর ভেতর ঘুড়ি উড়ছে, চরকি ঘুরছে -খুবই সুন্দর!” বায়োস্কোপ দেখার পর মামাকে ধন্যবাদ জানাতেও ভোলেনি এই শিশু। মেলা থেকে সে কিনেছে ‘চল্লিশ হাদিস; শিশুতোষ গল্প’ নামের একটি বই।

আয়ানের মতোই আরও অনেক শিশু বায়োস্কোপের জাদুতে মেতে উঠেছে। নার্সারির শিক্ষার্থী মানহা জুনাইরা, বাবা সাইফুল ইসলামের সাথে মেলায় এসে বায়োস্কোপ দেখে বলে, “ভেতরে মনে হলো ছবিগুলো নাচছে। গানের মতো নাচছিল।” জুনাইরার ফুফাতো বোন, তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী তাহরিমা আরিশা বায়োস্কোপ দেখে প্রশ্ন করে বসে, “এটা কি ছোট একটা সিনেমা?” তার বিস্ময়, “আমি ভেবেছিলাম ভেতরে শুধু ছবি থাকবে, কিন্তু মনে হলো সবকিছু নড়ছে! খুবই সুন্দর।” বায়োস্কোপ পরিচালনার দায়িত্বে থাকা মোহাম্মদ রবিন হাসিমুখে শিশুদের প্রশ্নের জবাব দিচ্ছেন এবং পুরোনো দিনের এই বিনোদন মাধ্যম সম্পর্কে তাদের ধারণা দিচ্ছেন।

শিশুদের এই মুগ্ধতা দেখে খুশি অভিভাবকরাও। সাইফুল ইসলাম জানান, স্মার্টফোন আর ট্যাবের যুগে এমন পুরোনো বিনোদন দেখে শিশুরা নতুন অভিজ্ঞতা পাচ্ছে। তিনি বলেন, “আমাদের ছোটবেলায় গ্রামে বায়োস্কোপ দেখতাম। আজ আমার সন্তানও সেটা দেখছে। ওকে এটা দেখাতে পেরে খুব ভালো লাগছে।” মেলার এই আয়োজন শিশুদের কল্পনাশক্তিকে আরও রঙিন করে তুলছে, যেখানে কেউ দেখছে পাখি উড়ছে, কেউবা মেলায় নাগরদোলা ঘুরছে।

বইমেলার মূল আকর্ষণ বই হলেও, শিশুদের জন্য ‘কাকতাড়ুয়া পাপেট থিয়েটার’ এর আয়োজনগুলো এক ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে। গল্প পাঠের আসর, ইন্টারেক্টিভ পাপেট শো, পুতুল নাটক ‘অপু ও দিপুর গল্প’ এবং বায়োস্কোপ প্রদর্শন শিশুদের জন্য যেন এক টুকরো আনন্দের জানালা খুলে দিয়েছে। ‘কাকতাড়ুয়া পাপেট থিয়েটার’ এর প্রতিষ্ঠাতা আসাদুজ্জামান আশিক জানান, “পারস্পরিক বন্ধুত্ব, একে অপরকে সহযোগিতা করা, ঝগড়া থেকে বিরত থাকা এবং বই পড়ার বার্তা নিয়েই পুতুল নাটক ‘অপু ও দিপুর গল্প’ প্রদর্শন করা হচ্ছে।” তিনি আরও বলেন, সকাল থেকেই পাঠের আসর, ইন্টারেক্টিভ পাপেট শো, পুতুল নাটক এবং বায়োস্কোপ প্রদর্শন চলছে, যা প্রতিদিন অব্যাহত থাকবে। শিশু পাঠক-দর্শকদের উপস্থিতি নিয়ে আশিক বলেন, “মানুষের উপস্থিতি বেশ ভালো। ভেবেছিলাম রমজান হওয়ায় আরও কম হবে, কিন্তু ভালোই হলো। আশা করি, দিন দিন আরও বাড়বে।” বায়োস্কোপ সম্পর্কে তার মন্তব্য, “ছোট্ট সেই গোল জানালায় চোখ রাখলেই শিশুরা দেখতে পাচ্ছে রঙিন এক কল্পনার দুনিয়া যেখানে ছবিগুলো জীবন্ত হয়ে উঠছে।”

বইমেলায় বইয়ের পাশাপাশি এমন ঐতিহ্যবাহী বিনোদনের উপস্থিতি শিশুদের জন্য এক নতুন আনন্দ আর শেখার সুযোগ তৈরি করেছে, যা তাদের মনে দীর্ঘস্থায়ী ছাপ ফেলবে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

আসামির খোঁজে পাবনার ভাঙ্গুড়ায় পুলিশের অভিযান: স্ত্রী-ভাই-ভাবীকে মারধরের অভিযোগ, আহত ২ হাসপাতালে

অমর একুশে বইমেলায় বায়োস্কোপের জাদু: অপু ও দিপুর গল্পে মগ্ন শৈশব

আপডেট সময় : ০৫:৪৯:২৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

অমর একুশে বইমেলা ২০২৬ এর দ্বিতীয় দিনে বইয়ের সুবাসের পাশাপাশি শিশুদের জন্যও রয়েছে উপচে পড়া আনন্দ। রঙিন বই, মনকাড়া খেলনা আর নানা আয়োজনের ভিড়ে শিশুদের বিশেষ আকর্ষণ হয়ে উঠেছে এক সময়ের জনপ্রিয় বিনোদন মাধ্যম – বায়োস্কোপ। ডিজিটাল ডিভাইসের এই যুগে পুরোনো দিনের সেই বায়োস্কোপ শিশুদের কৌতূহল আর মুগ্ধতার নতুন এক জগৎ উন্মোচন করেছে।

মেলার শিশু কর্নারে ‘কাকতাড়ুয়া পাপেট থিয়েটার’ এর ছোট্ট একটি বায়োস্কোপের সামনে সারাক্ষণই লেগে আছে শিশুদের ভিড়। কৌতূহলী চোখে তারা একে একে উঁকি দিচ্ছে বায়োস্কোপের ছোট গোল জানালায়। ভেতরে কী লুকানো আছে, সেই রহস্য জানতে পারলেই তাদের চোখে-মুখে ফুটে উঠছে এক অন্যরকম আনন্দ। আট বছর বয়সী ইউসুফ আলম আয়ান, মামা রাসেল সরকারের সাথে বাসাবো থেকে মেলায় এসে প্রথমবারের মতো বায়োস্কোপ দেখে মুগ্ধ। বিস্ময়ভরা কণ্ঠে সে জানায়, “আমি প্রথমবার দেখলাম। এর ভেতর ঘুড়ি উড়ছে, চরকি ঘুরছে -খুবই সুন্দর!” বায়োস্কোপ দেখার পর মামাকে ধন্যবাদ জানাতেও ভোলেনি এই শিশু। মেলা থেকে সে কিনেছে ‘চল্লিশ হাদিস; শিশুতোষ গল্প’ নামের একটি বই।

আয়ানের মতোই আরও অনেক শিশু বায়োস্কোপের জাদুতে মেতে উঠেছে। নার্সারির শিক্ষার্থী মানহা জুনাইরা, বাবা সাইফুল ইসলামের সাথে মেলায় এসে বায়োস্কোপ দেখে বলে, “ভেতরে মনে হলো ছবিগুলো নাচছে। গানের মতো নাচছিল।” জুনাইরার ফুফাতো বোন, তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী তাহরিমা আরিশা বায়োস্কোপ দেখে প্রশ্ন করে বসে, “এটা কি ছোট একটা সিনেমা?” তার বিস্ময়, “আমি ভেবেছিলাম ভেতরে শুধু ছবি থাকবে, কিন্তু মনে হলো সবকিছু নড়ছে! খুবই সুন্দর।” বায়োস্কোপ পরিচালনার দায়িত্বে থাকা মোহাম্মদ রবিন হাসিমুখে শিশুদের প্রশ্নের জবাব দিচ্ছেন এবং পুরোনো দিনের এই বিনোদন মাধ্যম সম্পর্কে তাদের ধারণা দিচ্ছেন।

শিশুদের এই মুগ্ধতা দেখে খুশি অভিভাবকরাও। সাইফুল ইসলাম জানান, স্মার্টফোন আর ট্যাবের যুগে এমন পুরোনো বিনোদন দেখে শিশুরা নতুন অভিজ্ঞতা পাচ্ছে। তিনি বলেন, “আমাদের ছোটবেলায় গ্রামে বায়োস্কোপ দেখতাম। আজ আমার সন্তানও সেটা দেখছে। ওকে এটা দেখাতে পেরে খুব ভালো লাগছে।” মেলার এই আয়োজন শিশুদের কল্পনাশক্তিকে আরও রঙিন করে তুলছে, যেখানে কেউ দেখছে পাখি উড়ছে, কেউবা মেলায় নাগরদোলা ঘুরছে।

বইমেলার মূল আকর্ষণ বই হলেও, শিশুদের জন্য ‘কাকতাড়ুয়া পাপেট থিয়েটার’ এর আয়োজনগুলো এক ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে। গল্প পাঠের আসর, ইন্টারেক্টিভ পাপেট শো, পুতুল নাটক ‘অপু ও দিপুর গল্প’ এবং বায়োস্কোপ প্রদর্শন শিশুদের জন্য যেন এক টুকরো আনন্দের জানালা খুলে দিয়েছে। ‘কাকতাড়ুয়া পাপেট থিয়েটার’ এর প্রতিষ্ঠাতা আসাদুজ্জামান আশিক জানান, “পারস্পরিক বন্ধুত্ব, একে অপরকে সহযোগিতা করা, ঝগড়া থেকে বিরত থাকা এবং বই পড়ার বার্তা নিয়েই পুতুল নাটক ‘অপু ও দিপুর গল্প’ প্রদর্শন করা হচ্ছে।” তিনি আরও বলেন, সকাল থেকেই পাঠের আসর, ইন্টারেক্টিভ পাপেট শো, পুতুল নাটক এবং বায়োস্কোপ প্রদর্শন চলছে, যা প্রতিদিন অব্যাহত থাকবে। শিশু পাঠক-দর্শকদের উপস্থিতি নিয়ে আশিক বলেন, “মানুষের উপস্থিতি বেশ ভালো। ভেবেছিলাম রমজান হওয়ায় আরও কম হবে, কিন্তু ভালোই হলো। আশা করি, দিন দিন আরও বাড়বে।” বায়োস্কোপ সম্পর্কে তার মন্তব্য, “ছোট্ট সেই গোল জানালায় চোখ রাখলেই শিশুরা দেখতে পাচ্ছে রঙিন এক কল্পনার দুনিয়া যেখানে ছবিগুলো জীবন্ত হয়ে উঠছে।”

বইমেলায় বইয়ের পাশাপাশি এমন ঐতিহ্যবাহী বিনোদনের উপস্থিতি শিশুদের জন্য এক নতুন আনন্দ আর শেখার সুযোগ তৈরি করেছে, যা তাদের মনে দীর্ঘস্থায়ী ছাপ ফেলবে।