ঢাকা ১২:২২ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৬

গতির মরণফাঁদ পূর্বাচল ৩০০ ফিট: মাসে শতাধিক দুর্ঘটনায় লাশের মিছিল

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১২:৫৩:৫৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ২ বার পড়া হয়েছে

রাজধানীর উপকণ্ঠে আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার অন্যতম আকর্ষণ পূর্বাচল ৩০০ ফিট এক্সপ্রেসওয়ে এখন সাধারণ মানুষের জন্য এক ভয়ংকর আতঙ্কের নাম। দৃষ্টিনন্দন ও প্রশস্ত এই সড়কটি একসময় আধুনিক যাতায়াতের প্রতীক হিসেবে প্রশংসিত হলেও বর্তমানে এটি রূপ নিয়েছে মরণফাঁদে। প্রতিদিনের বেপরোয়া গতি, ট্রাফিক আইনের তোয়াক্কা না করা এবং প্রশাসনের পর্যাপ্ত নজরদারির অভাবে সড়কটিতে এখন লাশের মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে।

এক মাসে শতাধিক দুর্ঘটনা স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রত্যক্ষদর্শীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত এক মাসে এই ৩০০ ফিট সড়কে ছোট-বড় মিলিয়ে অন্তত শতাধিক দুর্ঘটনার ঘটনা ঘটেছে। এতে প্রাণ হারিয়েছেন বহু মানুষ এবং পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন অসংখ্য যাত্রী ও পথচারী। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকৃত দুর্ঘটনার সংখ্যা সরকারি হিসেবের চেয়েও অনেক বেশি। বিশেষ করে রাতের আঁধারে এই সড়কটি যেন অনিয়ন্ত্রিত গতির এক ‘রেস ট্র্যাকে’ পরিণত হয়। দ্রুতগতির গাড়ির ধাক্কায় কেউ হারাচ্ছেন উপার্জনের একমাত্র অবলম্বন, আবার কোনো মা হারাচ্ছেন তাঁর কোলের সন্তান। স্বজন হারানো পরিবারগুলোর আহাজারিতে রূপগঞ্জের আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠছে।

নজরদারি ও শৃঙ্খলার অভাব তদন্তে উঠে এসেছে, এক্সপ্রেসওয়েটিতে নিয়মিত পুলিশি টহল বা কার্যকর ট্রাফিক নজরদারি না থাকায় চালকদের মধ্যে আইন মানার কোনো বালাই নেই। মাঝে মধ্যে পুলিশের ঝটিকা অভিযান চললেও তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই নগণ্য এবং তা স্থায়ী কোনো সমাধান দিতে পারছে না। ফলে চালকরা কোনো ধরনের শৃঙ্খলা ছাড়াই গাড়ি চালাচ্ছেন, যা সাধারণ পথচারীদের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “এই রাস্তায় বের হওয়া মানেই জীবন হাতে নিয়ে বের হওয়া। গাড়িগুলো এত দ্রুত চলে যে রাস্তা পার হওয়া অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের নিয়ে আমরা চরম আতঙ্কে থাকি।” নিয়মিত চলাচলকারী এক চালক জানান, “এখানে না চাইলেও গতির প্রতিযোগিতায় নামতে হয়। স্পিড না তুললে পেছন থেকে অন্য গাড়ি এসে চাপ দেয়।”

বিশেষজ্ঞ ও পুলিশের ভাষ্য সরেজমিনে দেখা গেছে, সড়কটির দীর্ঘ অংশে কোনো স্বয়ংক্রিয় স্পিড মনিটরিং ব্যবস্থা বা স্পিড ক্যামেরা নেই। নেই পর্যাপ্ত সতর্কতামূলক সাইনেজ বা ডিভাইডার মার্কিং। রাতের বেলায় অনেক অংশে আলোকসজ্জা দুর্বল থাকায় দুর্ঘটনা আরও বাড়ছে।

এশিয়ান হাইওয়ে ট্রাফিক পুলিশের কর্মকর্তা সোহেল মিয়া জানান, তাঁরা নিয়মিত মামলা ও আইনগত ব্যবস্থা নিচ্ছেন এবং টহল জোরদার করেছেন। তবে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের সহকারী পুলিশ সুপার মেহেদী ইসলাম বলেন, “আইন প্রয়োগের চেয়েও চালকদের সচেতনতা বেশি জরুরি। নিজের জীবনের মূল্য বুঝলে এমন বেপরোয়া চালনা বন্ধ হবে।”

সমাধানের পথ সচেতন মহলের মতে, ৩০০ ফিট এক্সপ্রেসওয়েকে নিরাপদ করতে হলে অবিলম্বে নিচের পদক্ষেপগুলো নেওয়া প্রয়োজন:

  • ডিজিটাল নজরদারি: দ্রুত স্বয়ংক্রিয় স্পিড ডিটেকশন ক্যামেরা ও ই-চালান ব্যবস্থা চালু করা।
  • স্থায়ী ট্রাফিক পোস্ট: দুর্ঘটনাপ্রবণ পয়েন্টগুলোতে নিয়মিত ট্রাফিক পুলিশ মোতায়েন।
  • নিরাপদ পারাপার: পথচারীদের জন্য পর্যাপ্ত ওভারব্রিজ ও জেব্রা ক্রসিং নিশ্চিত করা।
  • আলোকসজ্জা ও সাইনেজ: রাতের বেলায় পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা ও স্পষ্ট সতর্কবার্তা স্থাপন।

কার্যকর ও সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ না করা হলে এই আধুনিক এক্সপ্রেসওয়ে আগামীতেও সাধারণ মানুষের কাছে দুর্ঘটনার ভয়ংকর প্রতীক হয়েই থাকবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় লিজেন্ডারি সংগীতশিল্পী আশা ভোঁসলেকে শেষ বিদায়

গতির মরণফাঁদ পূর্বাচল ৩০০ ফিট: মাসে শতাধিক দুর্ঘটনায় লাশের মিছিল

আপডেট সময় : ১২:৫৩:৫৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

রাজধানীর উপকণ্ঠে আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার অন্যতম আকর্ষণ পূর্বাচল ৩০০ ফিট এক্সপ্রেসওয়ে এখন সাধারণ মানুষের জন্য এক ভয়ংকর আতঙ্কের নাম। দৃষ্টিনন্দন ও প্রশস্ত এই সড়কটি একসময় আধুনিক যাতায়াতের প্রতীক হিসেবে প্রশংসিত হলেও বর্তমানে এটি রূপ নিয়েছে মরণফাঁদে। প্রতিদিনের বেপরোয়া গতি, ট্রাফিক আইনের তোয়াক্কা না করা এবং প্রশাসনের পর্যাপ্ত নজরদারির অভাবে সড়কটিতে এখন লাশের মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে।

এক মাসে শতাধিক দুর্ঘটনা স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রত্যক্ষদর্শীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত এক মাসে এই ৩০০ ফিট সড়কে ছোট-বড় মিলিয়ে অন্তত শতাধিক দুর্ঘটনার ঘটনা ঘটেছে। এতে প্রাণ হারিয়েছেন বহু মানুষ এবং পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন অসংখ্য যাত্রী ও পথচারী। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকৃত দুর্ঘটনার সংখ্যা সরকারি হিসেবের চেয়েও অনেক বেশি। বিশেষ করে রাতের আঁধারে এই সড়কটি যেন অনিয়ন্ত্রিত গতির এক ‘রেস ট্র্যাকে’ পরিণত হয়। দ্রুতগতির গাড়ির ধাক্কায় কেউ হারাচ্ছেন উপার্জনের একমাত্র অবলম্বন, আবার কোনো মা হারাচ্ছেন তাঁর কোলের সন্তান। স্বজন হারানো পরিবারগুলোর আহাজারিতে রূপগঞ্জের আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠছে।

নজরদারি ও শৃঙ্খলার অভাব তদন্তে উঠে এসেছে, এক্সপ্রেসওয়েটিতে নিয়মিত পুলিশি টহল বা কার্যকর ট্রাফিক নজরদারি না থাকায় চালকদের মধ্যে আইন মানার কোনো বালাই নেই। মাঝে মধ্যে পুলিশের ঝটিকা অভিযান চললেও তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই নগণ্য এবং তা স্থায়ী কোনো সমাধান দিতে পারছে না। ফলে চালকরা কোনো ধরনের শৃঙ্খলা ছাড়াই গাড়ি চালাচ্ছেন, যা সাধারণ পথচারীদের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “এই রাস্তায় বের হওয়া মানেই জীবন হাতে নিয়ে বের হওয়া। গাড়িগুলো এত দ্রুত চলে যে রাস্তা পার হওয়া অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের নিয়ে আমরা চরম আতঙ্কে থাকি।” নিয়মিত চলাচলকারী এক চালক জানান, “এখানে না চাইলেও গতির প্রতিযোগিতায় নামতে হয়। স্পিড না তুললে পেছন থেকে অন্য গাড়ি এসে চাপ দেয়।”

বিশেষজ্ঞ ও পুলিশের ভাষ্য সরেজমিনে দেখা গেছে, সড়কটির দীর্ঘ অংশে কোনো স্বয়ংক্রিয় স্পিড মনিটরিং ব্যবস্থা বা স্পিড ক্যামেরা নেই। নেই পর্যাপ্ত সতর্কতামূলক সাইনেজ বা ডিভাইডার মার্কিং। রাতের বেলায় অনেক অংশে আলোকসজ্জা দুর্বল থাকায় দুর্ঘটনা আরও বাড়ছে।

এশিয়ান হাইওয়ে ট্রাফিক পুলিশের কর্মকর্তা সোহেল মিয়া জানান, তাঁরা নিয়মিত মামলা ও আইনগত ব্যবস্থা নিচ্ছেন এবং টহল জোরদার করেছেন। তবে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের সহকারী পুলিশ সুপার মেহেদী ইসলাম বলেন, “আইন প্রয়োগের চেয়েও চালকদের সচেতনতা বেশি জরুরি। নিজের জীবনের মূল্য বুঝলে এমন বেপরোয়া চালনা বন্ধ হবে।”

সমাধানের পথ সচেতন মহলের মতে, ৩০০ ফিট এক্সপ্রেসওয়েকে নিরাপদ করতে হলে অবিলম্বে নিচের পদক্ষেপগুলো নেওয়া প্রয়োজন:

  • ডিজিটাল নজরদারি: দ্রুত স্বয়ংক্রিয় স্পিড ডিটেকশন ক্যামেরা ও ই-চালান ব্যবস্থা চালু করা।
  • স্থায়ী ট্রাফিক পোস্ট: দুর্ঘটনাপ্রবণ পয়েন্টগুলোতে নিয়মিত ট্রাফিক পুলিশ মোতায়েন।
  • নিরাপদ পারাপার: পথচারীদের জন্য পর্যাপ্ত ওভারব্রিজ ও জেব্রা ক্রসিং নিশ্চিত করা।
  • আলোকসজ্জা ও সাইনেজ: রাতের বেলায় পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা ও স্পষ্ট সতর্কবার্তা স্থাপন।

কার্যকর ও সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ না করা হলে এই আধুনিক এক্সপ্রেসওয়ে আগামীতেও সাধারণ মানুষের কাছে দুর্ঘটনার ভয়ংকর প্রতীক হয়েই থাকবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।