ঢাকা ০৫:১২ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

ক্ষমতার অগ্নিপরীক্ষায় বিএনপি: আদর্শিক দোলাচল ও অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:৪৪:০৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৩ বার পড়া হয়েছে

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসের ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার মহাঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। দীর্ঘ দেড় দশকের কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান ঘটিয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) যখন রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুদায়িত্ব গ্রহণ করেছে, তখন তাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে হিমালয়সম চ্যালেঞ্জ। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্যামুয়েল হান্টিংটনের ‘তৃতীয় তরঙ্গ’ গণতন্ত্রের তত্ত্ব অনুযায়ী, কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থার পতনের পর নতুন গণতান্ত্রিক সরকারের জন্য প্রথম ও প্রধান কাজ হলো ‘গণতান্ত্রিক সংহতকরণ’। কিন্তু বিএনপির জন্য এই পথটি মসৃণ নয়; বরং উদার গণতান্ত্রিক আদর্শের দাবিদার হলেও দলের অভ্যন্তরে বিদ্যমান দুর্বল রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও কাঠামোগত দুর্বলতা তাদের যাত্রাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

আদর্শিক সংকট: উদারতাবাদ বনাম লোকরঞ্জনবাদ
বিএনপির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো তাদের আদর্শিক অবস্থান। ঐতিহাসিকভাবে বিএনপি ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’-এর ওপর দাঁড়িয়ে, যা মূলত একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক নাগরিক পরিচয়ের কথা বলে। তবে জুলাই বিপ্লবোত্তর ‘জুলাই সনদ’ এবং সংস্কারের যে নাগরিক আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, তার সঙ্গে বিএনপির চিরাচরিত দক্ষিণপন্থি বা মধ্য-ডানপন্থি অবস্থানের একটি সূক্ষ্ম দ্বন্দ্ব পরিলক্ষিত হচ্ছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ফ্রান্সিস ফুকুয়ামার মতে, রাজনৈতিক দলগুলোকে অবশ্যই ‘পরিচয় সত্তা’ এবং ‘প্রতিষ্ঠান’-এর মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হয়। বিএনপি কি একটি আধুনিক উদার গণতান্ত্রিক দল হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করবে, নাকি আবার এ দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, ধর্মীয় ও জাতিগত আবেগকে পুঁজি করে ‘পপুলিস্ট’ বা লোকরঞ্জনবাদী ধারায় ফিরে যাবে—এই দোলাচল দলটিকে এক ক্রান্তিকালীন সংকটে ফেলেছে। বিশ্বায়ন ও প্রযুক্তির এই মহাবিপ্লবকালে সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদের আদর্শ এই জেন-জি প্রজন্মের কাছে কতটা আবেদন রাখে, সেটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

জুলাই গণঅভ্যুত্থান কেবল ক্ষমতার রদবদল ছিল না; এটি ছিল দীর্ঘস্থায়ী কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে পুঞ্জীভূত ক্ষোভের মহাবিস্ফোরণ। এই গণঅভ্যুত্থান-উত্তর বাংলাদেশে বিএনপি যখন রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্রে আবির্ভূত হয়, তখন তাদের কাঁধে চাপে ইতিহাসের এক অনন্য ও দ্বিমুখী দায়ভার। একদিকে তাদের হতে হচ্ছে একটি রূপান্তরশীল রাষ্ট্রের অভিভাবক, অন্যদিকে নিজেদের প্রমাণ করতে হচ্ছে একটি উদার গণতান্ত্রিক শক্তি হিসেবে। স্যামুয়েল পি. হান্টিংটন তাঁর ‘Political Order in Changing Societies’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন, বিপ্লব-পরবর্তী রাষ্ট্রে সবচেয়ে বড় সংকট হলো রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান বনাম গণআন্দোলনের শক্তির দ্বন্দ্ব। বিপ্লব সাধারণত রাষ্ট্রকে ভেঙে দেয়, কিন্তু নতুন প্রতিষ্ঠান তৈরি করা কঠিন। হান্টিংটনের বর্ণিত সেই সংকটের মোহনাতেই আজ বিএনপি। বিপ্লবের উত্তাল আবেগ আর রাষ্ট্র পরিচালনার যান্ত্রিক শৃঙ্খলার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন দলটির প্রধান চ্যালেঞ্জ।

অ্যান্থনি ডাউনসের ‘মিডিয়ান ভোটার থিওরি’ অনুযায়ী, গণতান্ত্রিক দলগুলো সাধারণত মাঝপথের অনুসারী বা ভোটারদের টানতে নিজেদের অবস্থান থেকে সরে আসে। বিএনপিও এর ব্যতিক্রম নয়। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে তাদের এই ভারসাম্য রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। বিপ্লবী শক্তি চায় পুরোনো ব্যবস্থার সম্পূর্ণ বিলোপ। মধ্যবিত্ত সমাজ চায় অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও নাগরিক শান্তি। আর সাম্রাজ্যবাদী ও আধিপত্যবাদী মহল ব্যস্ত মানবাধিকার এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্রের নামে তাদের নিয়ন্ত্রণের লাটাই ঘোরাতে। এই ত্রিভুজমুখী চাপের কারণে বিএনপি একটি আদর্শিক পরিচয় সংকটে ভুগছে। তারা কি একটি বিপ্লবীপন্থি দল হিসেবে নিজেদের পুনর্গঠন করবে, নাকি শুধু একটি নির্বাচনমুখী ঐতিহ্যবাহী দল হিসেবেই থেকে যাবে?

ধর্মীয় মূল্যবোধ ও সেক্যুলারিজমের টানাপোড়েন
বিএনপির জন্য আরেকটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও জটিল চ্যালেঞ্জ হলো—দলের অতি-সেক্যুলার অবস্থানের দিকে ঝুঁকে পড়া এবং এর মাধ্যমে দলের ঐতিহাসিক আদর্শিক ভিত্তি থেকে সরে আসার আশঙ্কা। বিশেষত জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শনে যে ইসলামি মূল্যবোধ, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং জাতীয় সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাষ্ট্রচিন্তা প্রতিফলিত হয়েছিল, সেখান থেকে বিচ্যুতি দলটির জন্য একটি গুরুতর রাজনৈতিক ভুল সিদ্ধান্তে পরিণত হতে পারে। জিয়াউর রহমানের সময়ে সংবিধানে ‘আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ বাক্যাংশ সংযোজন কেবল একটি ধর্মীয় প্রতীক ছিল না; বরং এটি ছিল বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতা, সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় অনুভূতি এবং রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তির একটি রাজনৈতিক স্বীকৃতি। এই বাক্যটি পুনঃস্থাপন করা হলে তা দেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমান জনগোষ্ঠীর কাছে নিঃসন্দেহে ইতিবাচকভাবে গ্রহণযোগ্য হবে এবং বিএনপির ঐতিহ্যগত ভোটব্যাংককে আরও সংহত করবে।

তবে এখানেই বিএনপির সামনে আরেকটি আদর্শগত দ্বন্দ্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কারণ, দলের বর্তমান নেতৃত্ব—বিশেষত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার ক্ষমতা গ্রহণের পর—যে ‘মহানবীর ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের’ রাজনৈতিক ভাষ্য তুলে ধরছেন, তা একদিকে ইসলামি নৈতিকতা, সামাজিক ন্যায় এবং মানবিক শাসনের ধারণাকে প্রতিফলিত করলেও, অন্যদিকে এটি পশ্চিমা সেক্যুলার উদার গণতন্ত্রের আদর্শের সঙ্গে একটি অন্তর্নিহিত সংঘর্ষ সৃষ্টি করে। পশ্চিমা উদার সেক্যুলারিজম মূলত রাষ্ট্রকে ধর্ম থেকে সম্পূর্ণ আলাদা রাখার নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত। সেখানে ধর্ম ব্যক্তিগত পরিসরের বিষয়, রাষ্ট্রনৈতিক দর্শনের অংশ নয়। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় ধর্ম শুধু ব্যক্তিগত বিশ্বাসে সীমাবদ্ধ নয়; এটি সমাজ, রাজনীতি ও নৈতিক কাঠামোর সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ফলে ‘মদিনা রাষ্ট্রের আদর্শ’ যখন রাজনৈতিক ভাষ্যে আসে, তখন তা ইউরোপীয় সেক্যুলার মডেলের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই সাংঘর্ষিক হয়ে ওঠে। এই প্রেক্ষাপটে বিএনপির সামনে মৌলিক প্রশ্নটি দাঁড়ায়—দলটি কীভাবে ইসলামি মূল্যবোধ, ধর্মপ্রাণ জনগোষ্ঠীর অনুভূতি এবং উদার গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে একটি কার্যকর ভারসাম্য রক্ষা করবে? রাজনৈতিক তত্ত্বের ভাষায়, এটি হলো মূল্যবোধের বহুত্ব বনাম আদর্শিক সংহতির দ্বন্দ্ব। যদি বিএনপি অতিমাত্রায় সেক্যুলার অবস্থান গ্রহণ করে, তবে তারা তাদের ঐতিহাসিক আদর্শিক ভিত্তি ও সামাজিক বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে পড়বে। ইসলামি ন্যায়বিচারের ধারণা সামাজিক ন্যায় ও মানবাধিকারের সঙ্গে সংযুক্ত হবে, কর্তৃত্ববাদী শাসনের যুক্তি হিসেবে নয়। এই ভারসাম্য রক্ষা করতে না পারলে বিএনপি একদিকে তার ধর্মপ্রাণ সমর্থকদের আস্থা হারাতে পারে, অন্যদিকে নিজেকে একটি আধুনিক উদার গণতান্ত্রিক দল হিসেবে প্রতিষ্ঠার সুযোগও নষ্ট করতে পারে। সুতরাং আদর্শগত এই সমন্বয়ই হবে জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে বিএনপির জন্য আরেকটি গভীর ও দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ।

অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা: চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও সহিংসতার রাজনীতি
ক্ষমতা হস্তান্তরের পরপরই বিএনপির একশ্রেণির নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে ওঠা চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব এবং বিরোধী দলের ওপর আক্রমণের অভিযোগগুলো দলের ভাবমূর্তিকে চরম সংকটে ফেলেছে। যখন একটি দল দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থাকে, তখন ক্ষমতায় ফেরার পর কর্মীদের মধ্যে ‘লুণ্ঠনমূলক আচরণ’ দেখা দেওয়ার প্রবণতা থাকে, যাকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ‘রাজনৈতিক রেন্ট-সিকিং’ বলা হয়। বিগত সরকারের দমন-পীড়নের শিকার হওয়ার দোহাই দিয়ে যে সহিংসতা চালানো হচ্ছে, তা উদার গণতন্ত্রের ‘বহুত্ববাদ’ নীতির পরিপন্থী। রবার্ট ডালের ‘পলিআর্কি’ মডেলে বিরোধীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া একটি অপরিহার্য শর্ত। বিএনপি যদি তাদের কর্মীদের এই সহিংস ও আধিপত্যকামী সংস্কৃতি থেকে বের করে আনতে না পারে, তবে জুলাই বিপ্লবের মূল স্পিরিট ‘বৈষম্যহীনতা’ শুধু কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে।

বিএনপির জন্য বর্তমান সময়টি শুধু ক্ষমতায় থাকার নয়, বরং বিশাল জনআকাঙ্ক্ষার প্রত্যাশার চাপে টিকে থাকার এক কঠিন পরীক্ষা। দলটিকে শুধু একটি নির্বাচনমুখী যন্ত্র হিসেবে নয়, বরং একটি জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। দলের ভেতরকার ‘দুর্বৃত্তায়ন’ বন্ধ করা না গেলে এবং আমলাতন্ত্রের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে গণঅভ্যুত্থানের ফসল অন্য কোনো বিরোধী দলের হাতে চলে যাওয়ার প্রচণ্ড ঝুঁকি আছে দলটির জন্য।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

রাজনগরে ক্রিকেট খেলা নিয়ে বিরোধ: ছুরিকাঘাতে হিফজ বিভাগের ছাত্র নিহত

ক্ষমতার অগ্নিপরীক্ষায় বিএনপি: আদর্শিক দোলাচল ও অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা

আপডেট সময় : ০৯:৪৪:০৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসের ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার মহাঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। দীর্ঘ দেড় দশকের কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান ঘটিয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) যখন রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুদায়িত্ব গ্রহণ করেছে, তখন তাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে হিমালয়সম চ্যালেঞ্জ। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্যামুয়েল হান্টিংটনের ‘তৃতীয় তরঙ্গ’ গণতন্ত্রের তত্ত্ব অনুযায়ী, কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থার পতনের পর নতুন গণতান্ত্রিক সরকারের জন্য প্রথম ও প্রধান কাজ হলো ‘গণতান্ত্রিক সংহতকরণ’। কিন্তু বিএনপির জন্য এই পথটি মসৃণ নয়; বরং উদার গণতান্ত্রিক আদর্শের দাবিদার হলেও দলের অভ্যন্তরে বিদ্যমান দুর্বল রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও কাঠামোগত দুর্বলতা তাদের যাত্রাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

আদর্শিক সংকট: উদারতাবাদ বনাম লোকরঞ্জনবাদ
বিএনপির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো তাদের আদর্শিক অবস্থান। ঐতিহাসিকভাবে বিএনপি ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’-এর ওপর দাঁড়িয়ে, যা মূলত একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক নাগরিক পরিচয়ের কথা বলে। তবে জুলাই বিপ্লবোত্তর ‘জুলাই সনদ’ এবং সংস্কারের যে নাগরিক আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, তার সঙ্গে বিএনপির চিরাচরিত দক্ষিণপন্থি বা মধ্য-ডানপন্থি অবস্থানের একটি সূক্ষ্ম দ্বন্দ্ব পরিলক্ষিত হচ্ছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ফ্রান্সিস ফুকুয়ামার মতে, রাজনৈতিক দলগুলোকে অবশ্যই ‘পরিচয় সত্তা’ এবং ‘প্রতিষ্ঠান’-এর মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হয়। বিএনপি কি একটি আধুনিক উদার গণতান্ত্রিক দল হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করবে, নাকি আবার এ দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, ধর্মীয় ও জাতিগত আবেগকে পুঁজি করে ‘পপুলিস্ট’ বা লোকরঞ্জনবাদী ধারায় ফিরে যাবে—এই দোলাচল দলটিকে এক ক্রান্তিকালীন সংকটে ফেলেছে। বিশ্বায়ন ও প্রযুক্তির এই মহাবিপ্লবকালে সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদের আদর্শ এই জেন-জি প্রজন্মের কাছে কতটা আবেদন রাখে, সেটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

জুলাই গণঅভ্যুত্থান কেবল ক্ষমতার রদবদল ছিল না; এটি ছিল দীর্ঘস্থায়ী কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে পুঞ্জীভূত ক্ষোভের মহাবিস্ফোরণ। এই গণঅভ্যুত্থান-উত্তর বাংলাদেশে বিএনপি যখন রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্রে আবির্ভূত হয়, তখন তাদের কাঁধে চাপে ইতিহাসের এক অনন্য ও দ্বিমুখী দায়ভার। একদিকে তাদের হতে হচ্ছে একটি রূপান্তরশীল রাষ্ট্রের অভিভাবক, অন্যদিকে নিজেদের প্রমাণ করতে হচ্ছে একটি উদার গণতান্ত্রিক শক্তি হিসেবে। স্যামুয়েল পি. হান্টিংটন তাঁর ‘Political Order in Changing Societies’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন, বিপ্লব-পরবর্তী রাষ্ট্রে সবচেয়ে বড় সংকট হলো রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান বনাম গণআন্দোলনের শক্তির দ্বন্দ্ব। বিপ্লব সাধারণত রাষ্ট্রকে ভেঙে দেয়, কিন্তু নতুন প্রতিষ্ঠান তৈরি করা কঠিন। হান্টিংটনের বর্ণিত সেই সংকটের মোহনাতেই আজ বিএনপি। বিপ্লবের উত্তাল আবেগ আর রাষ্ট্র পরিচালনার যান্ত্রিক শৃঙ্খলার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন দলটির প্রধান চ্যালেঞ্জ।

অ্যান্থনি ডাউনসের ‘মিডিয়ান ভোটার থিওরি’ অনুযায়ী, গণতান্ত্রিক দলগুলো সাধারণত মাঝপথের অনুসারী বা ভোটারদের টানতে নিজেদের অবস্থান থেকে সরে আসে। বিএনপিও এর ব্যতিক্রম নয়। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে তাদের এই ভারসাম্য রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। বিপ্লবী শক্তি চায় পুরোনো ব্যবস্থার সম্পূর্ণ বিলোপ। মধ্যবিত্ত সমাজ চায় অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও নাগরিক শান্তি। আর সাম্রাজ্যবাদী ও আধিপত্যবাদী মহল ব্যস্ত মানবাধিকার এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্রের নামে তাদের নিয়ন্ত্রণের লাটাই ঘোরাতে। এই ত্রিভুজমুখী চাপের কারণে বিএনপি একটি আদর্শিক পরিচয় সংকটে ভুগছে। তারা কি একটি বিপ্লবীপন্থি দল হিসেবে নিজেদের পুনর্গঠন করবে, নাকি শুধু একটি নির্বাচনমুখী ঐতিহ্যবাহী দল হিসেবেই থেকে যাবে?

ধর্মীয় মূল্যবোধ ও সেক্যুলারিজমের টানাপোড়েন
বিএনপির জন্য আরেকটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও জটিল চ্যালেঞ্জ হলো—দলের অতি-সেক্যুলার অবস্থানের দিকে ঝুঁকে পড়া এবং এর মাধ্যমে দলের ঐতিহাসিক আদর্শিক ভিত্তি থেকে সরে আসার আশঙ্কা। বিশেষত জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শনে যে ইসলামি মূল্যবোধ, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং জাতীয় সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাষ্ট্রচিন্তা প্রতিফলিত হয়েছিল, সেখান থেকে বিচ্যুতি দলটির জন্য একটি গুরুতর রাজনৈতিক ভুল সিদ্ধান্তে পরিণত হতে পারে। জিয়াউর রহমানের সময়ে সংবিধানে ‘আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ বাক্যাংশ সংযোজন কেবল একটি ধর্মীয় প্রতীক ছিল না; বরং এটি ছিল বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতা, সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় অনুভূতি এবং রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তির একটি রাজনৈতিক স্বীকৃতি। এই বাক্যটি পুনঃস্থাপন করা হলে তা দেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমান জনগোষ্ঠীর কাছে নিঃসন্দেহে ইতিবাচকভাবে গ্রহণযোগ্য হবে এবং বিএনপির ঐতিহ্যগত ভোটব্যাংককে আরও সংহত করবে।

তবে এখানেই বিএনপির সামনে আরেকটি আদর্শগত দ্বন্দ্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কারণ, দলের বর্তমান নেতৃত্ব—বিশেষত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার ক্ষমতা গ্রহণের পর—যে ‘মহানবীর ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের’ রাজনৈতিক ভাষ্য তুলে ধরছেন, তা একদিকে ইসলামি নৈতিকতা, সামাজিক ন্যায় এবং মানবিক শাসনের ধারণাকে প্রতিফলিত করলেও, অন্যদিকে এটি পশ্চিমা সেক্যুলার উদার গণতন্ত্রের আদর্শের সঙ্গে একটি অন্তর্নিহিত সংঘর্ষ সৃষ্টি করে। পশ্চিমা উদার সেক্যুলারিজম মূলত রাষ্ট্রকে ধর্ম থেকে সম্পূর্ণ আলাদা রাখার নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত। সেখানে ধর্ম ব্যক্তিগত পরিসরের বিষয়, রাষ্ট্রনৈতিক দর্শনের অংশ নয়। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় ধর্ম শুধু ব্যক্তিগত বিশ্বাসে সীমাবদ্ধ নয়; এটি সমাজ, রাজনীতি ও নৈতিক কাঠামোর সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ফলে ‘মদিনা রাষ্ট্রের আদর্শ’ যখন রাজনৈতিক ভাষ্যে আসে, তখন তা ইউরোপীয় সেক্যুলার মডেলের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই সাংঘর্ষিক হয়ে ওঠে। এই প্রেক্ষাপটে বিএনপির সামনে মৌলিক প্রশ্নটি দাঁড়ায়—দলটি কীভাবে ইসলামি মূল্যবোধ, ধর্মপ্রাণ জনগোষ্ঠীর অনুভূতি এবং উদার গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে একটি কার্যকর ভারসাম্য রক্ষা করবে? রাজনৈতিক তত্ত্বের ভাষায়, এটি হলো মূল্যবোধের বহুত্ব বনাম আদর্শিক সংহতির দ্বন্দ্ব। যদি বিএনপি অতিমাত্রায় সেক্যুলার অবস্থান গ্রহণ করে, তবে তারা তাদের ঐতিহাসিক আদর্শিক ভিত্তি ও সামাজিক বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে পড়বে। ইসলামি ন্যায়বিচারের ধারণা সামাজিক ন্যায় ও মানবাধিকারের সঙ্গে সংযুক্ত হবে, কর্তৃত্ববাদী শাসনের যুক্তি হিসেবে নয়। এই ভারসাম্য রক্ষা করতে না পারলে বিএনপি একদিকে তার ধর্মপ্রাণ সমর্থকদের আস্থা হারাতে পারে, অন্যদিকে নিজেকে একটি আধুনিক উদার গণতান্ত্রিক দল হিসেবে প্রতিষ্ঠার সুযোগও নষ্ট করতে পারে। সুতরাং আদর্শগত এই সমন্বয়ই হবে জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে বিএনপির জন্য আরেকটি গভীর ও দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ।

অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা: চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও সহিংসতার রাজনীতি
ক্ষমতা হস্তান্তরের পরপরই বিএনপির একশ্রেণির নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে ওঠা চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব এবং বিরোধী দলের ওপর আক্রমণের অভিযোগগুলো দলের ভাবমূর্তিকে চরম সংকটে ফেলেছে। যখন একটি দল দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থাকে, তখন ক্ষমতায় ফেরার পর কর্মীদের মধ্যে ‘লুণ্ঠনমূলক আচরণ’ দেখা দেওয়ার প্রবণতা থাকে, যাকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ‘রাজনৈতিক রেন্ট-সিকিং’ বলা হয়। বিগত সরকারের দমন-পীড়নের শিকার হওয়ার দোহাই দিয়ে যে সহিংসতা চালানো হচ্ছে, তা উদার গণতন্ত্রের ‘বহুত্ববাদ’ নীতির পরিপন্থী। রবার্ট ডালের ‘পলিআর্কি’ মডেলে বিরোধীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া একটি অপরিহার্য শর্ত। বিএনপি যদি তাদের কর্মীদের এই সহিংস ও আধিপত্যকামী সংস্কৃতি থেকে বের করে আনতে না পারে, তবে জুলাই বিপ্লবের মূল স্পিরিট ‘বৈষম্যহীনতা’ শুধু কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে।

বিএনপির জন্য বর্তমান সময়টি শুধু ক্ষমতায় থাকার নয়, বরং বিশাল জনআকাঙ্ক্ষার প্রত্যাশার চাপে টিকে থাকার এক কঠিন পরীক্ষা। দলটিকে শুধু একটি নির্বাচনমুখী যন্ত্র হিসেবে নয়, বরং একটি জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। দলের ভেতরকার ‘দুর্বৃত্তায়ন’ বন্ধ করা না গেলে এবং আমলাতন্ত্রের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে গণঅভ্যুত্থানের ফসল অন্য কোনো বিরোধী দলের হাতে চলে যাওয়ার প্রচণ্ড ঝুঁকি আছে দলটির জন্য।