নতুন সরকার গঠনের পর জনমনে এক ধরনের স্বস্তি তৈরি হয়েছে। গত কয়েক দিনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কর্মকাণ্ড ও ভূমিকায় জনগণের মধ্যে তৈরি হয়েছে আশাবাদ। বলা হচ্ছে, দেশ পরিচালনায় তারেক রহমান পুরোনো প্রথা ভেঙে নতুন স্বপ্ন ও পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হচ্ছেন। কিন্তু এই স্বপ্ন ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে কী কী বাধা রয়েছে সে আলোচনাও উঠছে। সচেতন জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি পর্যবেক্ষকরা বলছেন, ঘরে-বাইরে মোটা দাগে তিনটি চ্যালেঞ্জ সামলাতে হবে নতুন সরকারকে। প্রথমত, ব্যাংকিং ও অর্থনৈতিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনে ব্যবসায়ী সমাজসহ জনগণের মধ্যে স্বস্তি তৈরির পদক্ষেপ নিতে হবে।
দ্বিতীয়ত, ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রসহ শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো নিজ নিজ স্বার্থ ও লাভের জন্য বাংলাদেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। এ প্রশ্নে দেশগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা এখন অনেকটাই দৃশমান। এমন পরিস্থিতিতে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে দেশগুলোর মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক রক্ষা করে ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি সামাল দিতে হবে সরকারকে। এছাড়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটিয়ে সমাজ তথা দেশকে স্থিতিশীল করাও অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করা হচ্ছে।
১. ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য: ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ বনাম পরাশক্তির চাপ
নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক পরীক্ষা হলো যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারতের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা। বর্তমানে দেশগুলো নিজেদের স্বার্থে বাংলাদেশে প্রভাব বিস্তারে মরিয়া।
- যুক্তরাষ্ট্র: সামরিক কেনাকাটা ও ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলে বাংলাদেশকে পাশে চায়।
- চীন: অবকাঠামো উন্নয়ন ও বিনিয়োগ অব্যাহত রাখতে চায় এবং তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপের বিরোধী।
- ভারত: নিরাপত্তা ও কানেক্টিভিটি ইস্যুতে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে আগ্রহী, তবে শেখ হাসিনার ভারত অবস্থান নিয়ে কিছুটা অস্বস্তি রয়ে গেছে।
- মিয়ানমার ও রোহিঙ্গা: আরাকান আর্মির উত্থান এবং রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে নতুন সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।
বিশেষজ্ঞ মত: সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবিরের মতে, “শক্তিধর দেশগুলোর পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে আমাদের ঢুকে পড়া যাবে না। জাতীয় স্বার্থে সব দলের মধ্যে রাজনৈতিক সহমত প্রয়োজন।”
২. আইনশৃঙ্খলা: স্থিতিশীলতা ফেরানোই প্রধান লক্ষ্য
জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী বিশৃঙ্খলা এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার ‘মব-কালচার’ এখনো পুরোপুরি কাটেনি। চাঁদাবাজি, ছিনতাই এবং রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার রোধ করা সরকারের জন্য অগ্নিপরীক্ষা।
- লুণ্ঠিত অস্ত্র: পুলিশ সদর দপ্তরের মতে, এখনো ১৩ হাজার ৩০টি আগ্নেয়াস্ত্র এবং ২ লাখের বেশি গোলাবারুদ উদ্ধার হয়নি।
- পুলিশ বাহিনীর সংস্কার: দলীয় প্রভাবমুক্ত থেকে পেশাদারত্ব নিশ্চিত করা এবং পুলিশের প্রতি জনআস্থা ফিরিয়ে আনা জরুরি।
- সহিংসতা: নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতায় ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি জেলায় প্রাণহানি ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।
৩. অর্থনীতি: ঋণের বোঝা ও মূল্যস্ফীতির চাপ
পতিত সরকারের আমলের ‘অলিগার্কি’ এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার স্থবিরতায় অর্থনীতি এখন গভীর খাদে।
| অর্থনৈতিক সূচক | বর্তমান অবস্থা (ফেব্রুয়ারি ২০২৬) |
| মোট সরকারি ঋণ | প্রায় ২২ লাখ কোটি টাকা |
| খেলাপি ঋণ | মোট ঋণের প্রায় ৩৬% – ৪০% |
| মূল্যস্ফীতি | ৮.৪৯% (জানুয়ারি ২০২৬) |
| বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ | ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৩০.৫৮ বিলিয়ন ডলার |
- ব্যাংকিং খাত: গত ১৫ বছরে ব্যাংক খাত থেকে ৯২ হাজার কোটি টাকা লুটপাটের তথ্য উঠে এসেছে। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আইনি কাঠামোর মধ্যে এনে শৃঙ্খলা ফেরানোই বড় কাজ।
- রাজস্ব সংকট: কর-জিডিপি অনুপাত ৮ শতাংশের নিচে, যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন। এনবিআর সংস্কার ছাড়া বড় বাজেট বাস্তবায়ন অসম্ভব।
- বিনিয়োগ: উচ্চ সুদহার (১৬-১৭%) এবং ডলার সংকটের কারণে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ স্থবির হয়ে আছে।
উত্তরণের পথ: বিশ্লেষকদের পরামর্শ
সাবেক অর্থ সচিব মাহবুব আহমেদের মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং প্রবৃদ্ধি অর্জন—এই দুইয়ের মধ্যে ব্যালেন্স করাই হবে সরকারের প্রধান মুন্সিয়ানা। ড. মুস্তাফিজুর রহমান (সিপিডি) মনে করেন, বাজার ব্যবস্থাপনা জোরদার করে দরিদ্র মানুষের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষা এবং শিল্পে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করে কর্মসংস্থান বাড়ানোই হবে প্রকৃত সমাধান।
রিপোর্টারের নাম 





















