ঢাকা ১২:৩৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

রাজশাহীর ইফতারে ঐতিহ্যের সুবাস: সাত দশকের জিলাপি ও ফিরনির রাজত্ব

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৮:৪৩:০৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ২ বার পড়া হয়েছে

সময়ের স্রোতে আধুনিকতার ছোঁয়ায় ইফতারের পসরা যখন নানা বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ হচ্ছে, তখনো কিছু ঐতিহ্যবাহী খাবার তার স্বকীয়তা ও স্বাদ নিয়ে টিকে আছে। এমনই এক ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত রাজশাহী মহানগরী, যেখানে সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে ঐতিহ্য ও স্বাদের এক অনন্য মেলবন্ধন আজও অমলিন। বিশেষ করে ইফতারের আয়োজনে স্থানীয়দের কাছে এখানকার জিলাপি ও ফিরনি যেন এক ভিন্ন মাত্রা যোগ করে। আর এই ঐতিহ্যকে ধারণ করে চলেছে নগরীর দুটি নামকরা প্রতিষ্ঠান – বাটার মোড়ের নামহীন জিলাপির দোকান এবং গণকপাড়া মোড়ের রহমানিয়া হোটেলের মাটির পাত্রে পরিবেশিত শাহী ফিরনি।

নামহীন হলেও পরিচিতি আকাশছোঁয়া: বাটার মোড়ের জিলাপি

রাজশাহী মহানগরীর বাটার মোড়ে এমন এক দোকানের দেখা মেলে, যার নেই কোনো সাইনবোর্ড, নেই কোনো পরিচিতি নাম। অথচ ইফতারের সময় ঘনিয়ে এলেই ক্রেতাদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে ওঠে এর চারপাশ। কারিগর সাফাত আলী যখন কড়াই ভর্তি জিলাপি ভাজেন, তখনও ক্রেতাদের চাহিদা মেটানো কঠিন হয়ে পড়ে। কড়াই থেকে সরাসরি গরম গরম জিলাপি পৌঁছে যায় ক্রেতাদের হাতে।

নগরীর ব্যবসায়ী শাজাহান মিঞা জানান, “এদের স্বাদের একটা বিশেষত্ব আছে, সাথে ঐতিহ্যও জড়িয়ে আছে। প্রতি বছর ইফতারের জন্য আমি এখান থেকেই জিলাপি কিনি। আমরা ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি, আমার বাবাও এখান থেকে জিলাপি কিনতেন।”

দোকানটির মালিক শামীম খান জানান, ১৯৫০-এর দশকে তার পিতা সোয়েব উদ্দিন এই ব্যবসা শুরু করেন। তখন দোকানের নাম ছিল ‘রানিবাজার রেস্টুরেন্ট’। সময়ের সাথে সাথে সাইনবোর্ডটি নষ্ট হয়ে গেলেও, বাটার মোড়ের জিলাপি নামেই এটি পরিচিতি লাভ করে। প্রথম কারিগর ছিলেন জামিলী সাহা, পরবর্তীতে তার ছেলে কালীপদ সাহা এই দায়িত্ব নেন। ২০১৭ সালে কালীপদ সাহার মৃত্যুর পর তার শিষ্য সাফাত আলী এই ঐতিহ্যকে ধরে রেখেছেন। বর্তমানে সোয়েব উদ্দিনের চার ছেলে এই দোকান পরিচালনা করছেন। তাদের একজন, হাসিম উদ্দীন বলেন, “ভালো মানের উপকরণ ও সততাই আমাদের এই দীর্ঘদিনের আস্থার মূল কারণ। রমজানে আমাদের বিক্রি কয়েকগুণ বেড়ে যায়। প্রতি কেজি জিলাপি এখন ২২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।”

কারিগর সাফাত আলী জানান, “ওস্তাদ কালীবাবুর কাছ থেকে জিলাপি বানানো শিখেছি। সঠিক উপকরণ, চিনির পরিমাণ এবং ভাজার কৌশল ঠিকঠাক রাখলেই জিলাপি সুন্দর রঙ ধারণ করে, মচমচে ও রসালো হয়।”

মাটির পাত্রে রাজকীয় স্বাদ: রহমানিয়া হোটেলের শাহী ফিরনি

বাটার মোড়ের অদূরে, গণকপাড়া মোড়ে অবস্থিত রহমানিয়া হোটেল অ্যান্ড রেস্তোরাঁ ইফতারের ভিন্ন এক স্বাদের ঠিকানা। ছোট ছোট মাটির পাত্রে সাজানো তাদের ‘শাহী ফিরনি’ এক বিশেষ আকর্ষণ। গরুর খাঁটি দুধ, চালের গুঁড়া, চিনি এবং বিভিন্ন ফলের সমন্বয়ে তৈরি এই ফিরনির যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৫২ সালে। হোটেলের প্রতিষ্ঠাতা আনিছুর রহমান খান এই ফিরনি চালু করেন। তার মৃত্যুর পর তার ছেলে আবদুল বারি খান এবং বর্তমানে নাতি রিয়াজ আহাম্মেদ খান এই ঐতিহ্যবাহী ব্যবসাটি দেখাশোনা করছেন।

রিয়াজ আহাম্মেদ জানান, “শুরুতে এক বাটি ফিরনির দাম ছিল মাত্র চার আনা। এখন ৩৫ টাকা হলেও আমরা মান ও পরিমাণে কোনো আপস করি না। প্রতিটি বাটিতে ১০০ গ্রাম ফিরনি দেওয়ার নিয়ম আজও একই আছে।” তিনি আরও বলেন, “এটা এখন শুধু ব্যবসা নয়, এটা আমাদের দাদার স্মৃতি ও ঐতিহ্য। বাপ-দাদার শুরু করা ফিরনি আজও চালু রেখেছি, কারণ এটি এখন একটি ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। রমজান মাসে আমরা প্রতিদিন প্রায় এক হাজার বাটি পর্যন্ত ফিরনি বিক্রি করে থাকি।”

প্রায় ২০ বছর ধরে এই ফিরনি কিনছেন আসাদুজ্জামান। তিনি বলেন, “ইফতারের আয়োজনে এই ফিরনি না থাকলে যেন কিছুই হয় না। স্বাদ ও ঐতিহ্যের জন্যই আমরা এটা কিনি। এখনকার তরুণ প্রজন্ম হয়তো নতুন খাবারের দিকে আকৃষ্ট হয়, কিন্তু আমাদের মতো বয়োজ্যেষ্ঠদের কাছে এই ফিরনির গুরুত্ব অপরিসীম।”

নগরীর আলুপট্টি এলাকার বাসিন্দা জয়নাল আবেদিন দুই পাত্র ফিরনি কিনলেন। তিনি বলেন, “আরও অনেক কিছু কেনা হয়েছে। কিন্তু ইফতারে ফিরনির একটা আলাদা মূল্য আমার কাছে।”

সাত দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে এসেও রাজশাহীর ইফতার সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছে বাটার মোড়ের জিলাপি ও রহমানিয়ার শাহী ফিরনি। শনিবার বিকেল থেকে শুরু হওয়া এই দুটি দোকানে ক্রেতাদের উপচেপড়া ভিড় প্রমাণ করে, আধুনিকতার ভিড়েও রাজশাহীর বুকে আজও অটুট রয়েছে ঐতিহ্যবাহী এই খাবারের স্বাদ ও মেলবন্ধন।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

কনকাকাফ চ্যাম্পিয়ন্স কাপে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কাভানের ঐতিহাসিক অভিষেক

রাজশাহীর ইফতারে ঐতিহ্যের সুবাস: সাত দশকের জিলাপি ও ফিরনির রাজত্ব

আপডেট সময় : ০৮:৪৩:০৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

সময়ের স্রোতে আধুনিকতার ছোঁয়ায় ইফতারের পসরা যখন নানা বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ হচ্ছে, তখনো কিছু ঐতিহ্যবাহী খাবার তার স্বকীয়তা ও স্বাদ নিয়ে টিকে আছে। এমনই এক ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত রাজশাহী মহানগরী, যেখানে সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে ঐতিহ্য ও স্বাদের এক অনন্য মেলবন্ধন আজও অমলিন। বিশেষ করে ইফতারের আয়োজনে স্থানীয়দের কাছে এখানকার জিলাপি ও ফিরনি যেন এক ভিন্ন মাত্রা যোগ করে। আর এই ঐতিহ্যকে ধারণ করে চলেছে নগরীর দুটি নামকরা প্রতিষ্ঠান – বাটার মোড়ের নামহীন জিলাপির দোকান এবং গণকপাড়া মোড়ের রহমানিয়া হোটেলের মাটির পাত্রে পরিবেশিত শাহী ফিরনি।

নামহীন হলেও পরিচিতি আকাশছোঁয়া: বাটার মোড়ের জিলাপি

রাজশাহী মহানগরীর বাটার মোড়ে এমন এক দোকানের দেখা মেলে, যার নেই কোনো সাইনবোর্ড, নেই কোনো পরিচিতি নাম। অথচ ইফতারের সময় ঘনিয়ে এলেই ক্রেতাদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে ওঠে এর চারপাশ। কারিগর সাফাত আলী যখন কড়াই ভর্তি জিলাপি ভাজেন, তখনও ক্রেতাদের চাহিদা মেটানো কঠিন হয়ে পড়ে। কড়াই থেকে সরাসরি গরম গরম জিলাপি পৌঁছে যায় ক্রেতাদের হাতে।

নগরীর ব্যবসায়ী শাজাহান মিঞা জানান, “এদের স্বাদের একটা বিশেষত্ব আছে, সাথে ঐতিহ্যও জড়িয়ে আছে। প্রতি বছর ইফতারের জন্য আমি এখান থেকেই জিলাপি কিনি। আমরা ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি, আমার বাবাও এখান থেকে জিলাপি কিনতেন।”

দোকানটির মালিক শামীম খান জানান, ১৯৫০-এর দশকে তার পিতা সোয়েব উদ্দিন এই ব্যবসা শুরু করেন। তখন দোকানের নাম ছিল ‘রানিবাজার রেস্টুরেন্ট’। সময়ের সাথে সাথে সাইনবোর্ডটি নষ্ট হয়ে গেলেও, বাটার মোড়ের জিলাপি নামেই এটি পরিচিতি লাভ করে। প্রথম কারিগর ছিলেন জামিলী সাহা, পরবর্তীতে তার ছেলে কালীপদ সাহা এই দায়িত্ব নেন। ২০১৭ সালে কালীপদ সাহার মৃত্যুর পর তার শিষ্য সাফাত আলী এই ঐতিহ্যকে ধরে রেখেছেন। বর্তমানে সোয়েব উদ্দিনের চার ছেলে এই দোকান পরিচালনা করছেন। তাদের একজন, হাসিম উদ্দীন বলেন, “ভালো মানের উপকরণ ও সততাই আমাদের এই দীর্ঘদিনের আস্থার মূল কারণ। রমজানে আমাদের বিক্রি কয়েকগুণ বেড়ে যায়। প্রতি কেজি জিলাপি এখন ২২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।”

কারিগর সাফাত আলী জানান, “ওস্তাদ কালীবাবুর কাছ থেকে জিলাপি বানানো শিখেছি। সঠিক উপকরণ, চিনির পরিমাণ এবং ভাজার কৌশল ঠিকঠাক রাখলেই জিলাপি সুন্দর রঙ ধারণ করে, মচমচে ও রসালো হয়।”

মাটির পাত্রে রাজকীয় স্বাদ: রহমানিয়া হোটেলের শাহী ফিরনি

বাটার মোড়ের অদূরে, গণকপাড়া মোড়ে অবস্থিত রহমানিয়া হোটেল অ্যান্ড রেস্তোরাঁ ইফতারের ভিন্ন এক স্বাদের ঠিকানা। ছোট ছোট মাটির পাত্রে সাজানো তাদের ‘শাহী ফিরনি’ এক বিশেষ আকর্ষণ। গরুর খাঁটি দুধ, চালের গুঁড়া, চিনি এবং বিভিন্ন ফলের সমন্বয়ে তৈরি এই ফিরনির যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৫২ সালে। হোটেলের প্রতিষ্ঠাতা আনিছুর রহমান খান এই ফিরনি চালু করেন। তার মৃত্যুর পর তার ছেলে আবদুল বারি খান এবং বর্তমানে নাতি রিয়াজ আহাম্মেদ খান এই ঐতিহ্যবাহী ব্যবসাটি দেখাশোনা করছেন।

রিয়াজ আহাম্মেদ জানান, “শুরুতে এক বাটি ফিরনির দাম ছিল মাত্র চার আনা। এখন ৩৫ টাকা হলেও আমরা মান ও পরিমাণে কোনো আপস করি না। প্রতিটি বাটিতে ১০০ গ্রাম ফিরনি দেওয়ার নিয়ম আজও একই আছে।” তিনি আরও বলেন, “এটা এখন শুধু ব্যবসা নয়, এটা আমাদের দাদার স্মৃতি ও ঐতিহ্য। বাপ-দাদার শুরু করা ফিরনি আজও চালু রেখেছি, কারণ এটি এখন একটি ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। রমজান মাসে আমরা প্রতিদিন প্রায় এক হাজার বাটি পর্যন্ত ফিরনি বিক্রি করে থাকি।”

প্রায় ২০ বছর ধরে এই ফিরনি কিনছেন আসাদুজ্জামান। তিনি বলেন, “ইফতারের আয়োজনে এই ফিরনি না থাকলে যেন কিছুই হয় না। স্বাদ ও ঐতিহ্যের জন্যই আমরা এটা কিনি। এখনকার তরুণ প্রজন্ম হয়তো নতুন খাবারের দিকে আকৃষ্ট হয়, কিন্তু আমাদের মতো বয়োজ্যেষ্ঠদের কাছে এই ফিরনির গুরুত্ব অপরিসীম।”

নগরীর আলুপট্টি এলাকার বাসিন্দা জয়নাল আবেদিন দুই পাত্র ফিরনি কিনলেন। তিনি বলেন, “আরও অনেক কিছু কেনা হয়েছে। কিন্তু ইফতারে ফিরনির একটা আলাদা মূল্য আমার কাছে।”

সাত দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে এসেও রাজশাহীর ইফতার সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছে বাটার মোড়ের জিলাপি ও রহমানিয়ার শাহী ফিরনি। শনিবার বিকেল থেকে শুরু হওয়া এই দুটি দোকানে ক্রেতাদের উপচেপড়া ভিড় প্রমাণ করে, আধুনিকতার ভিড়েও রাজশাহীর বুকে আজও অটুট রয়েছে ঐতিহ্যবাহী এই খাবারের স্বাদ ও মেলবন্ধন।