ঢাকা ০৪:৫৪ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের রায়ে ট্রাম্পের শুল্কনীতিতে ধাক্কা: নতুন পথে মার্কিন বাণিজ্য, বাংলাদেশের সামনে চ্যালেঞ্জ

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৭:৪৪:১১ অপরাহ্ন, শনিবার, ২১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৪ বার পড়া হয়েছে

মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বহুল আলোচিত শুল্কনীতিকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে। এই রায়ের ফলে বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থায় অস্থিরতা তৈরি হলেও, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দ্রুতই ভিন্ন আইনে নতুন করে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন। এতে বাংলাদেশের মতো রপ্তানিমুখী দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য চুক্তির ভবিষ্যৎ আবারও গভীর অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতিকে সামনে রেখে বিশ্বজুড়ে পাল্টা শুল্ক আরোপ শুরু করেন। এর আওতায় বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পও বড় ধরনের সংকটে পড়ে। একপর্যায়ে ৩৫ শতাংশ শুল্কের মুখে পড়ার পর নানা আলোচনা ও দরকষাকষির মাধ্যমে ১৯ শতাংশ শুল্কে একটি বাণিজ্য চুক্তি সই করে বাংলাদেশ। যদিও এই চুক্তিকে দেশের অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা ‘অসম’ ও ‘জবরদস্তিমূলক’ বলে সমালোচনা করেছিলেন, কারণ এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা, সয়াবিন ও বোয়িং বিমান কেনার মতো কঠিন শর্ত বাংলাদেশকে মানতে হয়েছিল।

তবে সম্প্রতি মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি জন রবার্টসের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সেই ‘ইউনিভার্সাল বেসলাইন ট্যারিফ’কে অসাংবিধানিক ও আইনিভাবে অবৈধ ঘোষণা করেছে। আদালত জানায়, ট্রাম্প ‘ইন্টারন্যাশনাল ইমারজেন্সি ইকোনমিক পাওয়ারস অ্যাক্ট’ (আইইইপিএ) ব্যবহার করে যে শুল্ক বসিয়েছিলেন, তা জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাত হলেও আসলে ছিল অর্থনৈতিক জবরদস্তি। এই রায়ের ফলে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের ওপর ট্রাম্প প্রশাসনের আরোপিত পাল্টা শুল্ক চুক্তিগুলো কার্যকারিতা হারাল।

সুপ্রিম কোর্টের রায়ের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই অবশ্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প পিছু না হটে ভিন্ন একটি আইনে নতুন করে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন। হোয়াইট হাউসের একজন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানা গেছে, যুক্তরাজ্য, ভারত এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন দেশগুলোকে এখন থেকে তাদের পূর্বে আলোচনা করা শুল্ক হারের পরিবর্তে ‘ট্রেড অ্যাক্ট ১৯৭৪’-এর ধারা ১২২ এর অধীনে বিশ্বব্যাপী ১০ শতাংশ শুল্কের সম্মুখীন হতে হবে। আপাতদৃষ্টিতে বাংলাদেশের জন্য ১৯ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশ শুল্কে নেমে আসাটা স্বস্তিদায়ক মনে হলেও, এর পেছনে লুকানো আছে দীর্ঘমেয়াদী চ্যালেঞ্জ।

এই নতুন আইনে প্রেসিডেন্টের হাতে ১৫০ দিনের জন্য শুল্ক আরোপের ক্ষমতা থাকে। এই সময়ের মধ্যে মার্কিন কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট দেশ আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ‘আনফেয়ার ট্রেড প্র্যাকটিস’ করছে কিনা তা যাচাই করবে। শ্রমবাজার, শ্রমিকের কর্ম-পরিবেশ, বেতন, পরিবেশ দূষণ, নারীদের কর্ম পরিবেশসহ বিভিন্ন বিষয়ে অনিয়ম তদন্ত করা হবে। যদি কোনো অনিয়ম পাওয়া যায়, তাহলে সংশ্লিষ্ট দেশকে ঘাটতি পূরণের জন্য আরও ১৫০ দিনের সময় দেওয়া হবে, তবে এই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করতে পারে।

দেশের অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই রায় বাংলাদেশের জন্য একটি সুখবর হলেও, ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের মতে, এই মুহূর্তে পুরনো চুক্তি নিয়ে আলোচনার চেষ্টা না করে বাংলাদেশের উচিত চুপ থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া।

ড. জাহিদ হোসেন আরও বলেন, “যে সমস্ত শর্তে আমরা চুক্তি করতে বাধ্য হয়েছি সেগুলো নিয়ে এখন আলোচনা করতে গেলে ট্রাম্প প্রশাসন বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্য কমানোর মতো কঠোর সিদ্ধান্তও নিতে পারে।” তাই বাংলাদেশের শিল্প কারখানাগুলোর কাজের পরিবেশ, পরিবেশগত কমপ্লায়েন্স ঠিক রাখাসহ অভ্যন্তরীণ প্রস্তুতি ভালো থাকলে প্রেক্ষাপট ভিন্ন হতে পারে। ১৫০ দিনের এই তদন্তকালে যেসব বিষয়ে ঘাটতি রয়েছে, সেগুলো ঠিক করা বা যথাযথ উত্তর নিয়ে প্রস্তুত থাকা জরুরি।

বাংলাদেশের নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেমও সম্প্রতি হওয়া চুক্তিকে ‘অসম’ উল্লেখ করে বলেন, “ট্রাম্পের ট্যারিফ শুরু থেকেই আনপ্রেডিক্টাবল, কখন কী হয় বলা যাচ্ছে না। এখন যে ১০ শতাংশ দিয়েছে সেটা আবার কয়দিন থাকে সেটাও তো অনিশ্চিত।”

যদিও এত অল্প সময়ে এতগুলো দেশের তদন্ত শেষ করা মার্কিন প্রশাসনের জন্য কঠিন হতে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান লক্ষ্য চীন ও তার প্রতিদ্বন্দ্বীরা, তবুও বাংলাদেশের জন্য সতর্কতা ও প্রস্তুতি অপরিহার্য। আপাত স্বস্তি পেলেও, ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিতে যেকোনো সময় নতুন মোড় আসতে পারে, যা বাংলাদেশের রপ্তানি খাতকে আবারও অনিশ্চয়তার মুখে ফেলতে পারে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

কনকাকাফ চ্যাম্পিয়ন্স কাপে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কাভানের ঐতিহাসিক অভিষেক

মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের রায়ে ট্রাম্পের শুল্কনীতিতে ধাক্কা: নতুন পথে মার্কিন বাণিজ্য, বাংলাদেশের সামনে চ্যালেঞ্জ

আপডেট সময় : ০৭:৪৪:১১ অপরাহ্ন, শনিবার, ২১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বহুল আলোচিত শুল্কনীতিকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে। এই রায়ের ফলে বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থায় অস্থিরতা তৈরি হলেও, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দ্রুতই ভিন্ন আইনে নতুন করে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন। এতে বাংলাদেশের মতো রপ্তানিমুখী দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য চুক্তির ভবিষ্যৎ আবারও গভীর অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতিকে সামনে রেখে বিশ্বজুড়ে পাল্টা শুল্ক আরোপ শুরু করেন। এর আওতায় বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পও বড় ধরনের সংকটে পড়ে। একপর্যায়ে ৩৫ শতাংশ শুল্কের মুখে পড়ার পর নানা আলোচনা ও দরকষাকষির মাধ্যমে ১৯ শতাংশ শুল্কে একটি বাণিজ্য চুক্তি সই করে বাংলাদেশ। যদিও এই চুক্তিকে দেশের অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা ‘অসম’ ও ‘জবরদস্তিমূলক’ বলে সমালোচনা করেছিলেন, কারণ এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা, সয়াবিন ও বোয়িং বিমান কেনার মতো কঠিন শর্ত বাংলাদেশকে মানতে হয়েছিল।

তবে সম্প্রতি মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি জন রবার্টসের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সেই ‘ইউনিভার্সাল বেসলাইন ট্যারিফ’কে অসাংবিধানিক ও আইনিভাবে অবৈধ ঘোষণা করেছে। আদালত জানায়, ট্রাম্প ‘ইন্টারন্যাশনাল ইমারজেন্সি ইকোনমিক পাওয়ারস অ্যাক্ট’ (আইইইপিএ) ব্যবহার করে যে শুল্ক বসিয়েছিলেন, তা জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাত হলেও আসলে ছিল অর্থনৈতিক জবরদস্তি। এই রায়ের ফলে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের ওপর ট্রাম্প প্রশাসনের আরোপিত পাল্টা শুল্ক চুক্তিগুলো কার্যকারিতা হারাল।

সুপ্রিম কোর্টের রায়ের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই অবশ্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প পিছু না হটে ভিন্ন একটি আইনে নতুন করে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন। হোয়াইট হাউসের একজন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানা গেছে, যুক্তরাজ্য, ভারত এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন দেশগুলোকে এখন থেকে তাদের পূর্বে আলোচনা করা শুল্ক হারের পরিবর্তে ‘ট্রেড অ্যাক্ট ১৯৭৪’-এর ধারা ১২২ এর অধীনে বিশ্বব্যাপী ১০ শতাংশ শুল্কের সম্মুখীন হতে হবে। আপাতদৃষ্টিতে বাংলাদেশের জন্য ১৯ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশ শুল্কে নেমে আসাটা স্বস্তিদায়ক মনে হলেও, এর পেছনে লুকানো আছে দীর্ঘমেয়াদী চ্যালেঞ্জ।

এই নতুন আইনে প্রেসিডেন্টের হাতে ১৫০ দিনের জন্য শুল্ক আরোপের ক্ষমতা থাকে। এই সময়ের মধ্যে মার্কিন কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট দেশ আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ‘আনফেয়ার ট্রেড প্র্যাকটিস’ করছে কিনা তা যাচাই করবে। শ্রমবাজার, শ্রমিকের কর্ম-পরিবেশ, বেতন, পরিবেশ দূষণ, নারীদের কর্ম পরিবেশসহ বিভিন্ন বিষয়ে অনিয়ম তদন্ত করা হবে। যদি কোনো অনিয়ম পাওয়া যায়, তাহলে সংশ্লিষ্ট দেশকে ঘাটতি পূরণের জন্য আরও ১৫০ দিনের সময় দেওয়া হবে, তবে এই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করতে পারে।

দেশের অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই রায় বাংলাদেশের জন্য একটি সুখবর হলেও, ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের মতে, এই মুহূর্তে পুরনো চুক্তি নিয়ে আলোচনার চেষ্টা না করে বাংলাদেশের উচিত চুপ থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া।

ড. জাহিদ হোসেন আরও বলেন, “যে সমস্ত শর্তে আমরা চুক্তি করতে বাধ্য হয়েছি সেগুলো নিয়ে এখন আলোচনা করতে গেলে ট্রাম্প প্রশাসন বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্য কমানোর মতো কঠোর সিদ্ধান্তও নিতে পারে।” তাই বাংলাদেশের শিল্প কারখানাগুলোর কাজের পরিবেশ, পরিবেশগত কমপ্লায়েন্স ঠিক রাখাসহ অভ্যন্তরীণ প্রস্তুতি ভালো থাকলে প্রেক্ষাপট ভিন্ন হতে পারে। ১৫০ দিনের এই তদন্তকালে যেসব বিষয়ে ঘাটতি রয়েছে, সেগুলো ঠিক করা বা যথাযথ উত্তর নিয়ে প্রস্তুত থাকা জরুরি।

বাংলাদেশের নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেমও সম্প্রতি হওয়া চুক্তিকে ‘অসম’ উল্লেখ করে বলেন, “ট্রাম্পের ট্যারিফ শুরু থেকেই আনপ্রেডিক্টাবল, কখন কী হয় বলা যাচ্ছে না। এখন যে ১০ শতাংশ দিয়েছে সেটা আবার কয়দিন থাকে সেটাও তো অনিশ্চিত।”

যদিও এত অল্প সময়ে এতগুলো দেশের তদন্ত শেষ করা মার্কিন প্রশাসনের জন্য কঠিন হতে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান লক্ষ্য চীন ও তার প্রতিদ্বন্দ্বীরা, তবুও বাংলাদেশের জন্য সতর্কতা ও প্রস্তুতি অপরিহার্য। আপাত স্বস্তি পেলেও, ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিতে যেকোনো সময় নতুন মোড় আসতে পারে, যা বাংলাদেশের রপ্তানি খাতকে আবারও অনিশ্চয়তার মুখে ফেলতে পারে।