## একুশের মূল চেতনা কি হারিয়ে যাচ্ছে?
ভাষা শহিদ দিবস এখন এক ভিন্ন রূপে, স্মৃতির মিনার কি ফিকে হয়ে আসছে?
একুশে ফেব্রুয়ারি, আমাদের জাতীয় জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। ভাষা শহিদদের আত্মত্যাগের স্মরণে পালিত এই দিনটি এক সময় ছিল গভীর শ্রদ্ধা, বিনম্র স্মরণ এবং অধিকার আদায়ের এক অদম্য প্রত্যয়ের প্রতীক। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায়, বিশেষ করে গত দুই দশকে, একুশের সেই ঐতিহ্যবাহী রূপটি যেন অনেকটাই হারিয়ে যেতে বসেছে। আজকের এই আয়োজন, এই জাঁকজমক, এই হৈ-হট্টগোল কি তবে হারিয়ে যাওয়া একুশেরই প্রতিচ্ছবি?
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি, ঢাকার রাজপথে মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার দাবিতে মিছিলরত নিরস্ত্র আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালানো হয়। এই মর্মান্তিক ঘটনাটি ছিল সদ্য স্বাধীন দেশে নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠার এক জ্বলন্ত উদাহরণ। সেই রক্তে ভেজা মাটি থেকেই জন্ম নেয় একুশের চেতনা, যা কেবল ভাষার অধিকার নয়, বরং সকল ন্যায্য অধিকার আদায়ের এক অভেদ্য মন্ত্র। ভাষা শহিদদের সন্তান হিসেবে, সেই চেতনা যেন রক্তে মিশে আছে। ছোটবেলা থেকেই খালি পায়ে আজিমপুর কবরস্থানে গিয়ে শহীদদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করা, তারপর শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন—এই ছিল একুশের প্রথা। সেই মিনার ছিল কেবল ইটের গাঁথুনি নয়, বরং জাতির পথপ্রদর্শক, মঙ্গলময় মূল্যবোধের এক আলোকবর্তিকা।
কিন্তু আজকের একুশে যেন বড়ই ভিন্ন। যেখানে ছিল ভাবগম্ভীর স্মরণ, সেখানে আজ পদক বিতরণ আর তা অর্জনের প্রতিযোগিতা। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের নামে প্রায়শই দেখা যায় অনভিপ্রেত দৃশ্য, যা সেই সময়ের আন্তরিকতা ও শোকের পরিবেশ থেকে বহু দূরে। যে ঐতিহ্যবাহী একুশে আমাদের একাত্মতা ও অধিকার আদায়ের প্রেরণা জুগিয়েছিল, তা যেন এখন এক প্রাণহীন খোলস মাত্র। এতে নানা রঙ মেখে উৎসব করা হচ্ছে, কিন্তু তার মূল সুর, তার গভীর অর্থ—তা কি হারিয়ে যাচ্ছে?
এই হারানো ঐতিহ্য আমাদের জাতীয় অস্তিত্বের জন্য এক গভীর সংকট। মহাসমুদ্রে নোঙর হারানো জাহাজের মতো, এই ঐতিহ্য হারিয়ে গেলে জাতিও তার দিশা হারাবে। ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই, পলাশীর প্রান্তরে যেমন জাতির অবহেলা ও বিভেদ তাদের পরাধীনতার অতল গহ্বরে নিক্ষেপ করেছিল, তেমনই আজ আমরা অপসংস্কৃতির আবর্তে হাবুডুবু খেয়ে আমাদের শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছি। নববর্ষ, ঈদ, মহররম, এমনকি মাতৃভাষা দিবস—সবই কমবেশি তার মূল অর্থ ও তাৎপর্য হারাচ্ছে।
ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক পরিচয় রক্ষার এই লড়াই কেবল বাংলাদেশেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং পশ্চিমবঙ্গ, আসামের বরাক উপত্যকা এবং ত্রিপুরার মতো বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চলে এর প্রভাব দেখা যায়। তবে, বিশেষত ১৯৭১ সালে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে, একুশে পালনের মূল ধারা থেকে আমরা অনেক দূরে সরে এসেছি। এর মূল কারণ হিসেবে দেখা যেতে পারে, বিভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতির প্রভাব, যা একই ভাষায় কথা বলা মানুষের মধ্যেও ভিন্ন ভিন্ন মূল্যবোধ তৈরি করেছে।
ইসলামের মূল শিক্ষা ‘ইনসাফ’ বা ন্যায়বিচার—এই মূল্যবোধ থেকেই একুশের চেতনা উৎসারিত। এই ‘ইনসাফ’ কেবল ভাষার অধিকার নয়, বরং সকল প্রকার ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার আহ্বান। কোরআন শরীফে আল্লাহ মানুষকে ভাষা শিখিয়েছেন এবং বিভিন্ন ভাষার ভিন্নতাকে তাঁর নিদর্শন বলেছেন। এই শিক্ষা আমাদের বাংলা ভাষার মর্যাদা ও অধিকার রক্ষায় উদ্বুদ্ধ করে। কিন্তু সেই মূল চেতনা আজ কতটা প্রতিফলিত হচ্ছে, তা প্রশ্নসাপেক্ষ।
প্রতিটি পার্বণই আমাদের সমাজের অবচেতনার চাহিদার প্রতিচ্ছবি। ঐতিহ্যবাহী পার্বণগুলোকে যদি তার মূল উৎস ও মূল্যবোধের আলোকে বিশ্লেষণ করে পালন করা যায়, তবে তা জাতির সংস্কৃতির অমূল্য সম্পদ হয়ে টিকে থাকবে। অন্যথায়, তা কেবল এক খোলসসর্বস্ব অপসংস্কৃতির প্রহসনে পরিণত হবে। তাই, প্রয়োজন হারিয়ে যাওয়া একুশের মূল চেতনাকে ফিরিয়ে আনা, যাতে স্মৃতির মিনার কেবল ইট-পাথরের কাঠামো না হয়ে, আমাদের অধিকার ও মর্যাদার এক চিরন্তন আলোকবর্তিকা হয়ে জ্বলে থাকে।
রিপোর্টারের নাম 



















