ঢাকা ০৪:৫৫ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

ভাষা: মিশ্রণ, বৈচিত্র্য ও বিবর্তনের এক অবিরাম যাত্রা

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৭:০১:১৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ২১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৩ বার পড়া হয়েছে

ভাষা কেবল শব্দসমষ্টি নয়, এটি একটি জাতির আত্মপরিচয়, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ধারক। বাংলা ভাষা এর ব্যতিক্রম নয়। হাজারো বছরের বিবর্তনের ধারায় বাংলা ভাষা গ্রহণ করেছে ভিন্ন ভিন্ন ভাষার শব্দ, ব্যাকরণের ছাঁচ এবং ভাবপ্রকাশের নানা ভঙ্গি। এই গ্রহণ-বর্জন, মিশ্রণ ও রূপান্তরই ভাষাকে করেছে সমৃদ্ধ ও প্রাণবন্ত।

ঔপনিবেশিক শাসনের প্রভাবে যেমন বাংলা ভাষায় ইংরেজি শব্দের অনুপ্রবেশ ঘটেছে, তেমনি ধর্মীয় সূত্রে আরবি শব্দের ব্যবহারও স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বায়নের এই যুগে হিন্দি, কোরিয়ান, সিঙ্গাপুরি, চাইনিজ, জাপানি সহ নানা ভাষার শব্দ আমাদের দৈনন্দিন ভাষায় মিশে যাচ্ছে। এই মিশ্রণ কেবল ভাষার ঔপনিবেশিক প্রভাব বা সাম্রাজ্যবাদের ফল নয়, বরং এটি মানুষের জ্ঞান অর্জন, পারস্পরিক যোগাযোগ এবং জীবিকা নির্বাহের এক স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। ভাষাবিজ্ঞানী নোয়াম চমস্কির মতে, মানুষের ভাষা শেখার এক সহজাত ক্ষমতা রয়েছে, যাকে তিনি ‘ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যাকুইজিশন ডিভাইস’ (LAD) বলেছেন। মনোবিজ্ঞানী স্টিফেন ক্রাশেনের ‘মনিটর মডেল’ অনুযায়ী, কোনো বিশেষ ভাষা শেখার তীব্র আকাঙ্ক্ষা থাকলে তা সহজে আয়ত্ত করা সম্ভব।

ভাষা কেবল একটি নির্দিষ্ট গণ্ডিতে আবদ্ধ নয়। সমাজে এর ব্যবহারিক রূপ বিভিন্ন। ‘কোড মিক্সিং’ বা একাধিক ভাষার মিশ্রণ আমাদের মুখের ভাষায় এক অনিবার্য বাস্তবতা। যেমন, “উই আর লুকিং ফর শত্রুজ”—এই বাক্যটি আমাদের পরিচিত। সমাজভাষাবিজ্ঞান এই ভাষিক মিশ্রণ ও তার বিবিধ ব্যবহার নিয়ে আলোচনা করে। বাংলা ভাষারও রয়েছে নিজস্ব আঞ্চলিক রূপ, যা প্রমিত বাংলার সঙ্গে মিশে এক নতুন মাত্রা যোগ করে। ভাষাবিদ ফার্দিনান্দ দ্য সোস্যুরের ভাষায়, এই ভিন্ন ভিন্ন রূপগুলো সবই বৃহত্তর ‘লাং’ বা ভাষার অন্তর্ভুক্ত। একটি ভাষার বৈচিত্র্যই তার শক্তি। আঞ্চলিক, লিঙ্গীয় ও পেশাগত নানা স্বর যখন ভাষার শরীরে প্রতিফলিত হয়, তখন তা ভাষাকে আরও প্রকাশক্ষম করে তোলে। সামাজিক মাধ্যমের প্রসারের ফলে ভাষার এই বৈচিত্র্য আরও স্পষ্ট হচ্ছে। শুদ্ধতাবাদীরা ভাষার ক্ষয় নিয়ে উদ্বিগ্ন হলেও, একটি ভাষার স্থিতিস্থাপকতা তার টিকে থাকার সামর্থ্যেরই পরিচায়ক।

লেখক তাঁর নিজস্ব প্রতিভার মাধ্যমে সমাজের মানুষের মুখের ভাষাকে সাহিত্যে তুলে আনেন। কথক তাঁর ব্যক্তিত্বের সঙ্গে মিলিয়ে সমাজ বা গোষ্ঠীর ভাষাকে ব্যবহার করেন। সোস্যুর একে ‘প্যারোল’ বলেছেন—অর্থাৎ, সমাজের ভাষার ভাণ্ডার থেকে ব্যক্তির নিজস্ব ভঙ্গিতে ভাষাচয়ন ও ব্যবহার। সমাজ যেমন ব্যক্তিকে ভাষা দেয়, তেমনি ব্যক্তিও তার সৃজনশীলতার মাধ্যমে ভাষাকে নতুন রূপ দেয়। শেক্সপিয়ার ও মিলটনের মতো সাহিত্যিকরা তাঁদের লেখায় ইংরেজি ভাষায় নতুন শব্দ যোগ করে ভাষার ভাণ্ডার সমৃদ্ধ করেছেন। একুশের চেতনা আমাদের অন্তর্ভুক্তিমূলক ভাষারুচি ও চেতনা বিকাশের আহ্বান জানায়। ভাষিক মৌলবাদ আখেরে বিপজ্জনক হতে পারে, তাই ভাষায়-ভাষায়, মানুষে-মানুষে পারস্পরিক লেনদেন ও আদান-প্রদানকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

ভাষা ও রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ: এক ভিন্ন প্রেক্ষাপট

ফেব্রুয়ারি মাস ভাষাপ্রেমের মাস হিসেবে পরিচিত। এই সময়কালে সাইনবোর্ডে বাংলা ভাষার ব্যবহার নিশ্চিত করতে জরিমানা ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার যে উদ্যোগ দেখা যায়, তা ভাষাপ্রেমের কতটা আন্তরিক প্রকাশ, নাকি তা কেবল ক্ষমতা প্রদর্শন বা জনস্বার্থের আড়ালে অন্য কোনো উদ্দেশ্য—তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। প্রকৃত ভাষাপ্রেম হলে এর উদ্যোগ ও আয়োজন আরও ব্যাপক ও ভিন্নতর হতো বলে ধারণা করা যায়।

ফেব্রুয়ারি এলেই এক ধরনের ‘অপর’ তৈরির চেষ্টা চলে। জনমনে এমন ধারণা তৈরি করার চেষ্টা করা হয় যে, বাংলা ছাড়া অন্য কোনো ভাষার শব্দ ব্যবহার করা উচিত নয়। অথচ, একাধিক ভাষার মিশ্রণ, যাকে সমাজভাষাবিজ্ঞান ‘কোড মিক্সিং’ বলে, তা আধুনিক বিশ্বের এক অনিবার্য বাস্তবতা। কথা বা লেখায় বাংলা, ইংরেজি, আরবি, উর্দু, প্রমিত-অপ্রমিত শব্দাবলির ব্যবহার স্বাভাবিক। এই স্বাভাবিকতাকে মেনে নেওয়াই প্রকৃত ভাষাপ্রেম। শব্দের মধ্যে দেশি-বিদেশি বিভাজন করে এক ধরনের কৃত্রিম আত্মপ্রসাদ লাভ করা হয়। অথচ, ‘লোন ওয়ার্ড’ বা ধার করা শব্দ একটি ভাষার নিজস্ব শব্দ হয়ে যায়। আবুল মনসুর আহমদের মতে, যে শব্দ সাধারণ মানুষ বোঝে ও ব্যবহার করে, সেটাই বাংলা শব্দ। রিকশাচালক থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ পর্যন্ত ‘ইনসাফ’ শব্দটি ব্যবহার করেন, যা ফারসি হলেও বাংলা ভাষায় মিশে গেছে।

বঙ্গে সংস্কৃত শব্দের প্রতি যেমন প্রেম দেখা যায়, তেমনি বিদ্বেষও। অথচ, অনেক ক্ষেত্রে সংস্কৃত ব্যাকরণের নিয়ম ছাড়া নতুন শব্দ গঠন করা দুষ্কর। অন্যদিকে, কিছু গোষ্ঠী আরবি-ফারসিকে ‘বিধর্মী’ ভাষা বলে বাংলা থেকে দূরে রাখতে চান। ভাষার ক্ষেত্রে এই ধরনের সংকীর্ণতা ভাষার অগ্রগতির পথে অন্তরায়। আবার, আঞ্চলিক ভাষা দিয়ে গদ্য রচনার অতি নিরীক্ষাপ্রবণতা ভাষাকে দুরূহ করে তোলে, যা সাধারণ পাঠকের পক্ষে বোঝা কঠিন।

বানান, বুদ্ধিজীবিতা এবং মধ্যপন্থা

অনেকের কাছে ভাষা জ্ঞান মানেই বানান জ্ঞান। আবার, কেউ কেউ বানানের প্রচলিত নিয়ম ভেঙে বিপ্লব ঘটাতে চান। এই দুই চরমপন্থার মাঝে রয়েছে এক মধ্যপন্থা। ইসলামপন্থী লেখক এবং কিছু তরুণ প্রজন্ম এই মধ্যপন্থা অবলম্বন করে। বানানের প্রচলিত নিয়মের প্রতি তাঁরা অন্ধ না হয়ে প্রকাশের সহজতা, বোধগম্যতা এবং বিষয়বস্তুর ওপর বেশি জোর দেন। তাঁদের লেখায় বাংলা, আরবি, ফারসি, উর্দু ও ইংরেজির সুমিত মিশ্রণ গদ্যকে গতিময় ও সংবেদী করে তোলে।

বানানের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ঘরানা দেখা যায়। প্রসঙ্গবাদী ঘরানা বিভিন্ন অর্থে একই বানানে লেখা শব্দের পার্থক্য বোঝাতে প্রসঙ্গের ওপর গুরুত্ব দেয়। যেমন, ‘বর্ণ’ অক্ষর অর্থে এবং ‘বর্ণ’ রং অর্থে ব্যবহৃত হলেও আমরা প্রসঙ্গ অনুযায়ী তা বুঝি। এই ঘরানা মানুষের সহজাত ভাষাবোধের উপর আস্থা রাখে। উচ্চারণবাদী ঘরানা অনুযায়ী, অধিকাংশ ক্ষেত্রে বানান উচ্চারণ অনুযায়ী হওয়া উচিত, বিশেষত বিদেশি শব্দগুলোর ক্ষেত্রে। তবে, বিদেশি শব্দ দেশীয় রূপ পেলে তাদের জন্য আলাদা বানানবিধির প্রয়োজন হয় না। এই ঘরানাও স্বীকার করে যে, সব বানান উচ্চারণ অনুযায়ী লেখা সম্ভব নয় বা প্রয়োজনও নেই।

নির্দেশবাদী ঘরানা, যেমন বাংলা একাডেমি, বানানের শৃঙ্খলায় আনতে চায় এবং অভিন্ন বানানে লেখার ওপর জোর দেয়। তারা জাতিবোধ ও রাষ্ট্রসংহতি নির্মাণের বিষয়টিকেও গুরুত্ব দেয়। ঐতিহ্যপ্রেমী ঘরানা বানানের ঐতিহাসিক বা প্রতীকী তাৎপর্যের ওপর জোর দেয়। যেমন, ‘বৌ’ বানানে ঘোমটার সদৃশতা বা ‘দুঃখ’ বানানে বিসর্গের অশ্রুর মতো পতন তাঁদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে অভ্যস্ত এবং সহজ বানান তাঁরাই ব্যবহার করতে চান। এই ঘরানা আইডিওলজিকালও বটে। তাঁরা কোনো কোনো বানানের নিজস্ব ব্যাখ্যা হাজির করেন।

নৈরাজ্যবাদী ঘরানা প্রচলিত ও প্রতিষ্ঠিত সব বানানকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং নিজের মতো করে বানান লেখে। এটি একটি শক্তিশালী ঘরানা, তবে এটিও এক monolithic ঘরানা নয়। কেউ কেউ বানানের নিয়মকানুনের জটিলতা এড়াতে নৈরাজ্যবাদী হন। ধ্বনি, দৃশ্য, অর্থ ও কর্তৃত্বের নানা অনুষঙ্গ তাঁদের বানান-নৈরাজ্যে আস্থাশীল করে তোলে। তাঁদের গদ্যে সাধু-চলিত, প্রমিত-অপ্রমিত এবং নানা ধরনের বানানের মিশ্রণ দেখা যায়।

তবে, নির্দেশবাদী বা প্রতিষ্ঠান-প্রবর্তিত বানান পাঠ্যপুস্তকে ব্যবহৃত হলে পরবর্তী প্রজন্ম সেই বানানেই অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। যেমন, ‘আরবি’, ‘নবী’—এই বানানগুলো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ‘আরবি’, ‘নবী’-তে পরিবর্তিত হয়েছে। শেষ পর্যন্ত, পাঠ্যপুস্তক, ভাষা একাডেমি বা প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানের প্রবর্তিত বানান এবং তাতে অভ্যস্ততাই প্রধান হয়ে ওঠে। তবে, এই প্রবল ধারার বিরোধী একটি ধারা সবসময়ই থাকবে, যা স্বাভাবিক ও উপকারী।

এই বিভাজনগুলো কঠোর ও অচল নয়। একজন ব্যক্তি একই সময়ে বিভিন্ন ঘরানার বৈশিষ্ট্য ধারণ করতে পারেন। যেমন, কেউ উচ্চারণবাদী, আবার কোনো ক্ষেত্রে প্রথাবাদী বা নৈরাজ্যবাদী হতে পারেন।

পৃথিবীর কোনো ভাষাতেই সম্ভবত সম্পূর্ণ উচ্চারণ অনুযায়ী বানান লেখা হয় না। অনেক সময় বানান এক রকম থাকে, কিন্তু উচ্চারণ ভিন্ন হয়। তবে, উচ্চারণ অনুযায়ী বানান লেখার আকাঙ্ক্ষা কখনো মরে যায় না। সব ভাষাতেই বানান সহজ করার প্রচেষ্টা থাকে। ইংরেজি বানানের ইতিহাসেও এর পরিবর্তন দেখা যায়।

অপ্রমিতের শক্তি: যা প্রমিতের নাগালের বাইরে

কিছু কথা অপ্রমিত ভাষায় বললে যতটা তীব্র ও জোরালো হয়, প্রমিত ভাষায় বললে তার আবেদন অনেক কমে যায়। একটি গানের বিখ্যাত পঙ্ক্তি:

“বন্ধু যখন বউ লইয়া
আমার বাড়ির সামনে দিয়া
রঙ্গ কইরা হাইট্টা যায়,
ফাইট্টা যায়, বুকটা ফাইট্টা যায়।”

এই কথাগুলো যদি প্রমিত বাংলায় বলা হয়: “বন্ধু যখন বউ নিয়ে আমার বাড়ির সামনে দিয়ে রঙ্গ করে হেঁটে যায়, ফেটে যায়, বুকটা ফেটে যায়”—তাহলে এর তীব্রতা অনেকটাই হারায়। ‘হাইট্টা’ এবং ‘ফাইট্টা’ শব্দে যে ধ্বনিগত জোর এবং আবেগ প্রকাশ পায়, ‘হেঁটে’ এবং ‘ফেটে’ শব্দে তা পাওয়া যায় না। ‘ফাইট্টা যায়’—এই শব্দবন্ধ চৌচির হওয়া হৃদয়ের এক তীব্র অনুভূতি প্রকাশ করে, যা ‘ফেটে যায়’ শব্দের কোমলতায় ততটা স্পষ্ট হয় না। অপ্রমিত ভাষার এই প্রয়োগ এক সুতীব্র হাহাকার তৈরি করে।

অনেক কথাই আছে যা প্রমিত ভাষায় বললে তার শক্তি হারায়। তাই, অপ্রমিতের শক্তিকে কাজে লাগাতে দ্বিধা করা উচিত নয়।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

কনকাকাফ চ্যাম্পিয়ন্স কাপে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কাভানের ঐতিহাসিক অভিষেক

ভাষা: মিশ্রণ, বৈচিত্র্য ও বিবর্তনের এক অবিরাম যাত্রা

আপডেট সময় : ০৭:০১:১৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ২১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

ভাষা কেবল শব্দসমষ্টি নয়, এটি একটি জাতির আত্মপরিচয়, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ধারক। বাংলা ভাষা এর ব্যতিক্রম নয়। হাজারো বছরের বিবর্তনের ধারায় বাংলা ভাষা গ্রহণ করেছে ভিন্ন ভিন্ন ভাষার শব্দ, ব্যাকরণের ছাঁচ এবং ভাবপ্রকাশের নানা ভঙ্গি। এই গ্রহণ-বর্জন, মিশ্রণ ও রূপান্তরই ভাষাকে করেছে সমৃদ্ধ ও প্রাণবন্ত।

ঔপনিবেশিক শাসনের প্রভাবে যেমন বাংলা ভাষায় ইংরেজি শব্দের অনুপ্রবেশ ঘটেছে, তেমনি ধর্মীয় সূত্রে আরবি শব্দের ব্যবহারও স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বায়নের এই যুগে হিন্দি, কোরিয়ান, সিঙ্গাপুরি, চাইনিজ, জাপানি সহ নানা ভাষার শব্দ আমাদের দৈনন্দিন ভাষায় মিশে যাচ্ছে। এই মিশ্রণ কেবল ভাষার ঔপনিবেশিক প্রভাব বা সাম্রাজ্যবাদের ফল নয়, বরং এটি মানুষের জ্ঞান অর্জন, পারস্পরিক যোগাযোগ এবং জীবিকা নির্বাহের এক স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। ভাষাবিজ্ঞানী নোয়াম চমস্কির মতে, মানুষের ভাষা শেখার এক সহজাত ক্ষমতা রয়েছে, যাকে তিনি ‘ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যাকুইজিশন ডিভাইস’ (LAD) বলেছেন। মনোবিজ্ঞানী স্টিফেন ক্রাশেনের ‘মনিটর মডেল’ অনুযায়ী, কোনো বিশেষ ভাষা শেখার তীব্র আকাঙ্ক্ষা থাকলে তা সহজে আয়ত্ত করা সম্ভব।

ভাষা কেবল একটি নির্দিষ্ট গণ্ডিতে আবদ্ধ নয়। সমাজে এর ব্যবহারিক রূপ বিভিন্ন। ‘কোড মিক্সিং’ বা একাধিক ভাষার মিশ্রণ আমাদের মুখের ভাষায় এক অনিবার্য বাস্তবতা। যেমন, “উই আর লুকিং ফর শত্রুজ”—এই বাক্যটি আমাদের পরিচিত। সমাজভাষাবিজ্ঞান এই ভাষিক মিশ্রণ ও তার বিবিধ ব্যবহার নিয়ে আলোচনা করে। বাংলা ভাষারও রয়েছে নিজস্ব আঞ্চলিক রূপ, যা প্রমিত বাংলার সঙ্গে মিশে এক নতুন মাত্রা যোগ করে। ভাষাবিদ ফার্দিনান্দ দ্য সোস্যুরের ভাষায়, এই ভিন্ন ভিন্ন রূপগুলো সবই বৃহত্তর ‘লাং’ বা ভাষার অন্তর্ভুক্ত। একটি ভাষার বৈচিত্র্যই তার শক্তি। আঞ্চলিক, লিঙ্গীয় ও পেশাগত নানা স্বর যখন ভাষার শরীরে প্রতিফলিত হয়, তখন তা ভাষাকে আরও প্রকাশক্ষম করে তোলে। সামাজিক মাধ্যমের প্রসারের ফলে ভাষার এই বৈচিত্র্য আরও স্পষ্ট হচ্ছে। শুদ্ধতাবাদীরা ভাষার ক্ষয় নিয়ে উদ্বিগ্ন হলেও, একটি ভাষার স্থিতিস্থাপকতা তার টিকে থাকার সামর্থ্যেরই পরিচায়ক।

লেখক তাঁর নিজস্ব প্রতিভার মাধ্যমে সমাজের মানুষের মুখের ভাষাকে সাহিত্যে তুলে আনেন। কথক তাঁর ব্যক্তিত্বের সঙ্গে মিলিয়ে সমাজ বা গোষ্ঠীর ভাষাকে ব্যবহার করেন। সোস্যুর একে ‘প্যারোল’ বলেছেন—অর্থাৎ, সমাজের ভাষার ভাণ্ডার থেকে ব্যক্তির নিজস্ব ভঙ্গিতে ভাষাচয়ন ও ব্যবহার। সমাজ যেমন ব্যক্তিকে ভাষা দেয়, তেমনি ব্যক্তিও তার সৃজনশীলতার মাধ্যমে ভাষাকে নতুন রূপ দেয়। শেক্সপিয়ার ও মিলটনের মতো সাহিত্যিকরা তাঁদের লেখায় ইংরেজি ভাষায় নতুন শব্দ যোগ করে ভাষার ভাণ্ডার সমৃদ্ধ করেছেন। একুশের চেতনা আমাদের অন্তর্ভুক্তিমূলক ভাষারুচি ও চেতনা বিকাশের আহ্বান জানায়। ভাষিক মৌলবাদ আখেরে বিপজ্জনক হতে পারে, তাই ভাষায়-ভাষায়, মানুষে-মানুষে পারস্পরিক লেনদেন ও আদান-প্রদানকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

ভাষা ও রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ: এক ভিন্ন প্রেক্ষাপট

ফেব্রুয়ারি মাস ভাষাপ্রেমের মাস হিসেবে পরিচিত। এই সময়কালে সাইনবোর্ডে বাংলা ভাষার ব্যবহার নিশ্চিত করতে জরিমানা ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার যে উদ্যোগ দেখা যায়, তা ভাষাপ্রেমের কতটা আন্তরিক প্রকাশ, নাকি তা কেবল ক্ষমতা প্রদর্শন বা জনস্বার্থের আড়ালে অন্য কোনো উদ্দেশ্য—তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। প্রকৃত ভাষাপ্রেম হলে এর উদ্যোগ ও আয়োজন আরও ব্যাপক ও ভিন্নতর হতো বলে ধারণা করা যায়।

ফেব্রুয়ারি এলেই এক ধরনের ‘অপর’ তৈরির চেষ্টা চলে। জনমনে এমন ধারণা তৈরি করার চেষ্টা করা হয় যে, বাংলা ছাড়া অন্য কোনো ভাষার শব্দ ব্যবহার করা উচিত নয়। অথচ, একাধিক ভাষার মিশ্রণ, যাকে সমাজভাষাবিজ্ঞান ‘কোড মিক্সিং’ বলে, তা আধুনিক বিশ্বের এক অনিবার্য বাস্তবতা। কথা বা লেখায় বাংলা, ইংরেজি, আরবি, উর্দু, প্রমিত-অপ্রমিত শব্দাবলির ব্যবহার স্বাভাবিক। এই স্বাভাবিকতাকে মেনে নেওয়াই প্রকৃত ভাষাপ্রেম। শব্দের মধ্যে দেশি-বিদেশি বিভাজন করে এক ধরনের কৃত্রিম আত্মপ্রসাদ লাভ করা হয়। অথচ, ‘লোন ওয়ার্ড’ বা ধার করা শব্দ একটি ভাষার নিজস্ব শব্দ হয়ে যায়। আবুল মনসুর আহমদের মতে, যে শব্দ সাধারণ মানুষ বোঝে ও ব্যবহার করে, সেটাই বাংলা শব্দ। রিকশাচালক থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ পর্যন্ত ‘ইনসাফ’ শব্দটি ব্যবহার করেন, যা ফারসি হলেও বাংলা ভাষায় মিশে গেছে।

বঙ্গে সংস্কৃত শব্দের প্রতি যেমন প্রেম দেখা যায়, তেমনি বিদ্বেষও। অথচ, অনেক ক্ষেত্রে সংস্কৃত ব্যাকরণের নিয়ম ছাড়া নতুন শব্দ গঠন করা দুষ্কর। অন্যদিকে, কিছু গোষ্ঠী আরবি-ফারসিকে ‘বিধর্মী’ ভাষা বলে বাংলা থেকে দূরে রাখতে চান। ভাষার ক্ষেত্রে এই ধরনের সংকীর্ণতা ভাষার অগ্রগতির পথে অন্তরায়। আবার, আঞ্চলিক ভাষা দিয়ে গদ্য রচনার অতি নিরীক্ষাপ্রবণতা ভাষাকে দুরূহ করে তোলে, যা সাধারণ পাঠকের পক্ষে বোঝা কঠিন।

বানান, বুদ্ধিজীবিতা এবং মধ্যপন্থা

অনেকের কাছে ভাষা জ্ঞান মানেই বানান জ্ঞান। আবার, কেউ কেউ বানানের প্রচলিত নিয়ম ভেঙে বিপ্লব ঘটাতে চান। এই দুই চরমপন্থার মাঝে রয়েছে এক মধ্যপন্থা। ইসলামপন্থী লেখক এবং কিছু তরুণ প্রজন্ম এই মধ্যপন্থা অবলম্বন করে। বানানের প্রচলিত নিয়মের প্রতি তাঁরা অন্ধ না হয়ে প্রকাশের সহজতা, বোধগম্যতা এবং বিষয়বস্তুর ওপর বেশি জোর দেন। তাঁদের লেখায় বাংলা, আরবি, ফারসি, উর্দু ও ইংরেজির সুমিত মিশ্রণ গদ্যকে গতিময় ও সংবেদী করে তোলে।

বানানের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ঘরানা দেখা যায়। প্রসঙ্গবাদী ঘরানা বিভিন্ন অর্থে একই বানানে লেখা শব্দের পার্থক্য বোঝাতে প্রসঙ্গের ওপর গুরুত্ব দেয়। যেমন, ‘বর্ণ’ অক্ষর অর্থে এবং ‘বর্ণ’ রং অর্থে ব্যবহৃত হলেও আমরা প্রসঙ্গ অনুযায়ী তা বুঝি। এই ঘরানা মানুষের সহজাত ভাষাবোধের উপর আস্থা রাখে। উচ্চারণবাদী ঘরানা অনুযায়ী, অধিকাংশ ক্ষেত্রে বানান উচ্চারণ অনুযায়ী হওয়া উচিত, বিশেষত বিদেশি শব্দগুলোর ক্ষেত্রে। তবে, বিদেশি শব্দ দেশীয় রূপ পেলে তাদের জন্য আলাদা বানানবিধির প্রয়োজন হয় না। এই ঘরানাও স্বীকার করে যে, সব বানান উচ্চারণ অনুযায়ী লেখা সম্ভব নয় বা প্রয়োজনও নেই।

নির্দেশবাদী ঘরানা, যেমন বাংলা একাডেমি, বানানের শৃঙ্খলায় আনতে চায় এবং অভিন্ন বানানে লেখার ওপর জোর দেয়। তারা জাতিবোধ ও রাষ্ট্রসংহতি নির্মাণের বিষয়টিকেও গুরুত্ব দেয়। ঐতিহ্যপ্রেমী ঘরানা বানানের ঐতিহাসিক বা প্রতীকী তাৎপর্যের ওপর জোর দেয়। যেমন, ‘বৌ’ বানানে ঘোমটার সদৃশতা বা ‘দুঃখ’ বানানে বিসর্গের অশ্রুর মতো পতন তাঁদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে অভ্যস্ত এবং সহজ বানান তাঁরাই ব্যবহার করতে চান। এই ঘরানা আইডিওলজিকালও বটে। তাঁরা কোনো কোনো বানানের নিজস্ব ব্যাখ্যা হাজির করেন।

নৈরাজ্যবাদী ঘরানা প্রচলিত ও প্রতিষ্ঠিত সব বানানকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং নিজের মতো করে বানান লেখে। এটি একটি শক্তিশালী ঘরানা, তবে এটিও এক monolithic ঘরানা নয়। কেউ কেউ বানানের নিয়মকানুনের জটিলতা এড়াতে নৈরাজ্যবাদী হন। ধ্বনি, দৃশ্য, অর্থ ও কর্তৃত্বের নানা অনুষঙ্গ তাঁদের বানান-নৈরাজ্যে আস্থাশীল করে তোলে। তাঁদের গদ্যে সাধু-চলিত, প্রমিত-অপ্রমিত এবং নানা ধরনের বানানের মিশ্রণ দেখা যায়।

তবে, নির্দেশবাদী বা প্রতিষ্ঠান-প্রবর্তিত বানান পাঠ্যপুস্তকে ব্যবহৃত হলে পরবর্তী প্রজন্ম সেই বানানেই অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। যেমন, ‘আরবি’, ‘নবী’—এই বানানগুলো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ‘আরবি’, ‘নবী’-তে পরিবর্তিত হয়েছে। শেষ পর্যন্ত, পাঠ্যপুস্তক, ভাষা একাডেমি বা প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানের প্রবর্তিত বানান এবং তাতে অভ্যস্ততাই প্রধান হয়ে ওঠে। তবে, এই প্রবল ধারার বিরোধী একটি ধারা সবসময়ই থাকবে, যা স্বাভাবিক ও উপকারী।

এই বিভাজনগুলো কঠোর ও অচল নয়। একজন ব্যক্তি একই সময়ে বিভিন্ন ঘরানার বৈশিষ্ট্য ধারণ করতে পারেন। যেমন, কেউ উচ্চারণবাদী, আবার কোনো ক্ষেত্রে প্রথাবাদী বা নৈরাজ্যবাদী হতে পারেন।

পৃথিবীর কোনো ভাষাতেই সম্ভবত সম্পূর্ণ উচ্চারণ অনুযায়ী বানান লেখা হয় না। অনেক সময় বানান এক রকম থাকে, কিন্তু উচ্চারণ ভিন্ন হয়। তবে, উচ্চারণ অনুযায়ী বানান লেখার আকাঙ্ক্ষা কখনো মরে যায় না। সব ভাষাতেই বানান সহজ করার প্রচেষ্টা থাকে। ইংরেজি বানানের ইতিহাসেও এর পরিবর্তন দেখা যায়।

অপ্রমিতের শক্তি: যা প্রমিতের নাগালের বাইরে

কিছু কথা অপ্রমিত ভাষায় বললে যতটা তীব্র ও জোরালো হয়, প্রমিত ভাষায় বললে তার আবেদন অনেক কমে যায়। একটি গানের বিখ্যাত পঙ্ক্তি:

“বন্ধু যখন বউ লইয়া
আমার বাড়ির সামনে দিয়া
রঙ্গ কইরা হাইট্টা যায়,
ফাইট্টা যায়, বুকটা ফাইট্টা যায়।”

এই কথাগুলো যদি প্রমিত বাংলায় বলা হয়: “বন্ধু যখন বউ নিয়ে আমার বাড়ির সামনে দিয়ে রঙ্গ করে হেঁটে যায়, ফেটে যায়, বুকটা ফেটে যায়”—তাহলে এর তীব্রতা অনেকটাই হারায়। ‘হাইট্টা’ এবং ‘ফাইট্টা’ শব্দে যে ধ্বনিগত জোর এবং আবেগ প্রকাশ পায়, ‘হেঁটে’ এবং ‘ফেটে’ শব্দে তা পাওয়া যায় না। ‘ফাইট্টা যায়’—এই শব্দবন্ধ চৌচির হওয়া হৃদয়ের এক তীব্র অনুভূতি প্রকাশ করে, যা ‘ফেটে যায়’ শব্দের কোমলতায় ততটা স্পষ্ট হয় না। অপ্রমিত ভাষার এই প্রয়োগ এক সুতীব্র হাহাকার তৈরি করে।

অনেক কথাই আছে যা প্রমিত ভাষায় বললে তার শক্তি হারায়। তাই, অপ্রমিতের শক্তিকে কাজে লাগাতে দ্বিধা করা উচিত নয়।