## দিল্লিতে মাহদী হাসানের অভিজ্ঞতা: ভারত ছাড়ার বার্তা, কিন্তু নিগ্রহের অভিযোগ অস্বীকার
নতুন দিল্লি: বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক ও হবিগঞ্জ জেলা শাখার সদস্যসচিব মাহদী হাসানের ভারত সফর ঘিরে দেশজুড়ে আলোচনা ও জল্পনা-কল্পনা চলছে। সম্প্রতি ভারত থেকে দেশে ফিরেছেন তিনি, কিন্তু সেখানে ঠিক কী ঘটেছিল তা নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওকে কেন্দ্র করে এই ঘটনার সূত্রপাত।
ঘটনার সূত্রপাত ও আলোচনা: মাসখানেক আগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে মাহদী হাসানকে শায়েস্তাগঞ্জ থানায় বসে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল কালামকে হুমকি দিতে দেখা যায়। তিনি বলেন যে তারা বানিয়াচং থানা পুড়িয়েছেন এবং এসআই সন্তোষ চৌধুরীকে জ্বালিয়ে দিয়েছেন। এই বক্তব্যের প্রেক্ষিতে সমালোচনার মুখে তাকে জানুয়ারিতে আটক করে পুলিশ। তবে তার সমর্থকদের বিক্ষোভের মুখে তাকে মুক্তি দেওয়া হলে তা নিয়েও বিতর্ক সৃষ্টি হয়।
দিল্লিতে পর্তুগিজ ভিসার আবেদন ও শনাক্তকরণ: সম্প্রতি মাহদী হাসান পর্তুগালের ভিসা নিতে ভারতে গিয়েছিলেন। গত মঙ্গলবার সকালে দিল্লির প্রাণকেন্দ্র কনট প্লেসে একটি বেসরকারি সংস্থার দপ্তরে তাকে দেখা যায়। এই সংস্থাটি বিভিন্ন দেশের দূতাবাসের হয়ে ভিসার আবেদন প্রক্রিয়াকরণ করে থাকে। মাহদী হাসান ও তার সঙ্গে থাকা এক নারী পর্তুগালের ভিসার জন্য আবেদন করতে গিয়েছিলেন। জানা গেছে, তারা পাহাড়গঞ্জ এলাকার একটি হোটেলে ওঠেন। কনট প্লেসের ভিসা কেন্দ্রে অপেক্ষা করার সময়েই কেউ তাকে শনাক্ত করে এবং তার একটি ভিডিও রেকর্ড করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়। ভিডিও রেকর্ডকারী ব্যক্তিও সেখানে ভিসা নিতে গিয়েছিলেন, তবে অন্য কোনো দেশের জন্য।
গোয়েন্দা তৎপরতা ও ভারত ত্যাগের বার্তা: মাহদী হাসানকে শনাক্ত করার পরপরই ভারতীয় গোয়েন্দা কর্মকর্তারা সক্রিয় হয়ে ওঠেন। বিবিসি বাংলার সঙ্গে কথা বলা দুজন ওয়াকিবহাল সূত্র জানিয়েছে, মাহদী হাসানকে শারীরিকভাবে নিগ্রহ করা হয়নি। তবে তাকে স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দেওয়া হয় যে, “ভারতবিরোধী কথা বলা এবং বাংলাদেশের একজন হিন্দু পুলিশ কর্মকর্তাকে মেরে ফেলার প্রকাশ্য দাবি করা কোনো ব্যক্তিকে ভারতে অবস্থান করতে দেওয়া হবে না।” তাকে নিজের দেশে ফিরে যাওয়া ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই বলেও জানানো হয়।
ঘটনাপ্রবাহ ও জিজ্ঞাসাবাদের বিবরণ: সূত্রগুলো আরও জানায়, মঙ্গলবার সকাল ১১টার দিকে মাহদী হাসানকে চিহ্নিত করা হয়। এরপরই তার কাছে ভারত ও বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন নম্বর থেকে ফোন আসতে শুরু করে। এই অপ্রত্যাশিত ফোন কলগুলো তাকে চিন্তিত করে তোলে। গোয়েন্দা কর্মকর্তারাও তার ওপর নজরদারি শুরু করেন। দুপুর আড়াইটার দিকে তিনি জানতে পারেন যে তিনি চিহ্নিত হয়ে গেছেন। এরপর তিনি দিল্লিতে আশ্রয়ের সন্ধানে বিভিন্ন জায়গায় গেলেও কেউ তাকে আশ্রয় দিতে রাজি হয়নি।
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় তিনি পাহাড়গঞ্জের হোটেল ছেড়ে বিমানবন্দরের কাছাকাছি একটি হোটেলে ওঠেন। পর্তুগালের ভিসার আবেদন প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগেই তার ভিসা বাতিল করা হয়। বুধবার সকালে তিনি বিমানবন্দরের সিকিউরিটি চেকের জন্য যান। সেখানে তাকে নিরাপত্তা চেকিংয়ের লাইন থেকে সরিয়ে এনে বিভিন্ন এজেন্সির কর্মকর্তারা জিজ্ঞাসাবাদ করেন। প্রায় আধঘণ্টা ধরে চলা এই জিজ্ঞাসাবাদের সময় তাকে কোনো শারীরিক নিগ্রহ করা হয়নি। গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মূল উদ্বেগ ছিল যে, একজন ব্যক্তি প্রকাশ্যে ভারতকে অপমান করেছে, একজন পুলিশ কর্মকর্তাকে হত্যার দাবি করেছে এবং একজন হিন্দু কর্মকর্তাকে মারধর করার কথা বলেছে, এমন ব্যক্তি ভারতে এসে অন্য দেশে চলে যাবে আর তারা চুপ থাকবে—এটি তারা মানতে পারেননি।
দেশে ফিরে মাহদীর বক্তব্য: বুধবার বিকেলে মাহদী হাসান ইন্ডিগো বিমানে বাংলাদেশে ফিরে আসেন। বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের প্রশ্নে তিনি বলেন, “আমাকে এসএডি লিডার, বৈষম্যবিরোধী নেতা বলে আটক করা হয়েছিল। তারপর হচ্ছে আমাকে প্রচণ্ড হ্যারাস করা হয়েছে। আমি ফুল লাইফ রিস্কে ছিলাম।” তিনি আরও বলেন, “এটা আমি বলে না, যে কোনো অন্য একটা দেশের নাগরিককে যে নিরাপত্তা দেওয়ার কথা, সেটা দেয় নাই। সো এইটা আমরা ডিটেইলসে জানাবে পরে।” ক্রিপ্টোকারেন্সি সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাবে তিনি সেটিকে গুজব বলে উড়িয়ে দেন। বাংলাদেশে ফেরার পরও তাকে বিমানবন্দরে জিজ্ঞাসাবাদের মুখে পড়তে হয়েছে বলে তিনি জানান।
বিবিসি বাংলা মাহদী হাসানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে ভারতের দুটি সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, মাহদী হাসানকে ভারতে থাকার অনুমতি দেওয়া হয়নি এবং তাকে দ্রুত দেশে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রিপোর্টারের নাম 























