ঢাকা ০৬:৩৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

ভাষা ও ভাবের লেনা-দেনা

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৪:৪৫:৩৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ২১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৪ বার পড়া হয়েছে

অবশ্যই, আপনার খসড়া আর্টিকেলটিকে পেশাদারী ভাষায় নতুন করে লিখছি।

ভাষা ও ভাবের মেলবন্ধন: বহুমাত্রিকতার শক্তি

ভাষার নিজস্ব কোনো শুদ্ধ বা অশুদ্ধ রূপ নেই। বাংলা ভাষা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বহু ভাষার শব্দকে আত্মস্থ করেছে। ইংরেজি, সংস্কৃত ছাড়াও আরবি, ফারসি, হিন্দি এবং আধুনিক বিশ্বে কোরিয়ান, জাপানিজ, চাইনিজ সহ নানা ভাষার শব্দ বাংলা ভাষায় মিশে গেছে। এই মিশ্রণ ভাষার স্বাভাবিক বিবর্তন, যা জ্ঞানার্জন ও জীবিকার প্রয়োজনে স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। নোয়াম চমস্কির ‘ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যাকুইজিশন ডিভাইস’ (LAD) এবং স্টিফেন ক্রাশেনের ‘মনিটর মডেল’-এর ‘এফেক্টিভ ফিল্টার হাইপোথিসিস’ অনুযায়ী, মানুষের ভাষা শেখার সহজাত ক্ষমতা রয়েছে এবং প্রয়োজন ও মানসিকতা ভাষা অর্জনে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। ‘ভাষা সাম্রাজ্যবাদ’ একটি আলোচিত ধারণা হলেও, ভিন্ন ভাষার সঙ্গে সম্পর্ক একটি ভাষার সমৃদ্ধিই ঘটায়।

আমরা একটি বহুভাষিক সমাজে বাস করি, যেখানে ‘কোড মিক্সিং’ বা ভিন্ন ভাষার শব্দের মিশ্রণ একটি সাধারণ ঘটনা। সমাজভাষাবিজ্ঞান এই ভাষিক পরিবর্তন ও ভাষার বহুবিধ ব্যবহার নিয়ে আলোচনা করে। বাংলা ভাষার নিজস্ব আঞ্চলিক রূপগুলোও এই বৃহত্তর ভাষারই অংশ। ভাষার বৈচিত্র্যই তার শক্তি, যা ভাষাকে আরও প্রকাশক্ষম করে তোলে। সামাজিক মাধ্যমের প্রসারের ফলে বাংলা ভাষা নতুন মাত্রা পাচ্ছে, যেখানে আঞ্চলিক, লিঙ্গীয় এবং পেশাগত নানা স্বর প্রতিফলিত হচ্ছে। শুদ্ধতাবাদীরা ভাষার ক্ষয় নিয়ে উদ্বিগ্ন হলেও, একটি ভাষার স্থিতিস্থাপকতা তার প্রাণশক্তিরই পরিচায়ক।

সাহিত্যিকরা তাঁদের ব্যক্তিগত প্রতিভা ও বৈশিষ্ট্যে ভাস্বর হয়ে সমাজের মানুষের মুখের ভাষাকে তাঁদের লেখায় তুলে ধরেন। ফার্দিনান্দ দ্য সোস্যুরের ‘প্যারোল’ ধারণা অনুযায়ী, ব্যক্তি তার নিজস্ব ভঙ্গিতে সমাজের ভাষাভাণ্ডার থেকে শব্দচয়ন ও ব্যবহার করে। সমাজ যেমন ব্যক্তিকে ভাষা দেয়, তেমনি ব্যক্তিপ্রতিভাও সমাজকে নতুন ভাব প্রকাশের ভাষা সরবরাহ করে। শেক্সপিয়র ও মিলটনের মতো সাহিত্যিকরা ইংরেজি ভাষায় নতুন শব্দ যোগ করেছেন। একুশের চেতনা আমাদের মধ্যে অন্তর্ভুক্তিমূলক ভাষারুচি ও চেতনা জাগিয়ে তুলুক, যেখানে ভাষার আদান-প্রদান ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বজায় থাকে। ভাষিক মৌলবাদ আখেরে বিপজ্জনক হতে পারে।

ফেব্রুয়ারি, ভাষা প্রেম ও রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ

ফেব্রুয়ারি মাস আমাদের ভাষাপ্রেমের মাস। এই সময়ে সাইনবোর্ডে বাংলা ভাষার ব্যবহার নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ দেখা যায়, যা কখনো কখনো জরিমানা বা হেনস্তার মাধ্যমে প্রয়োগ করা হয়। এই উদ্যোগ কতটা জনস্বার্থমূলক, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে। প্রকৃত ভাষাপ্রেম হলে উদ্যোগের ধরন ও ব্যাপকতা ভিন্ন হতে পারত।

ফেব্রুয়ারি এলেই কৃত্রিম ‘অপর’ তৈরির একটি প্রবণতা দেখা যায়। মনে করা হয়, বাংলায় অন্য কোনো ভাষার শব্দ ব্যবহার করা উচিত নয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, কোড মিক্সিং বা একাধিক ভাষার মিশ্রণ আধুনিক বিশ্বের এক অনিবার্য বাস্তবতা। বাংলা, ইংরেজি, আরবি, উর্দু, প্রমিত-অপ্রমিত শব্দের মিশ্রণ স্বাভাবিক। এই স্বাভাবিকতাকে গ্রহণ করাই প্রকৃত ভাষাপ্রেম। আমরা অনেক সময় শব্দের উৎস নিয়ে বিভেদ করি, কিন্তু আবুল মনসুর আহমদের মতো ভাষাবিদরা মনে করেন, যে শব্দ সাধারণ মানুষ বোঝে ও ব্যবহার করে, সেটাই বাংলা শব্দ। রিকশাচালকের মুখে ‘ইনসাফ’ শব্দটি বাংলা ভাষারই অংশ।

বাংলায় সংস্কৃত শব্দের প্রতি যেমন ভালোবাসা দেখা যায়, তেমনি বিদ্বেষও। অথচ, অনেক নতুন শব্দ গঠনে সংস্কৃত ব্যাকরণ অপরিহার্য। অন্যদিকে, আরবি-ফারসি শব্দকে ‘বিধর্মী’ বলে বর্জন করার প্রবণতা ভাষাকে সংকীর্ণ করে তোলে। আবার, আঞ্চলিক ভাষা নিয়ে অতি নিরীক্ষাপ্রবণতা ভাষাকে দুর্বোধ্য করে তুলতে পারে। প্রমিত ও অপ্রমিত ভাষার মিশ্রণ বা একটির অন্যটির প্রভাবই আমাদের নিয়তি।

বানান, বুদ্ধিবৃত্তি ও মধ্যপন্থা

অনেকের কাছে ভাষা জ্ঞান মানেই বানান জ্ঞান। আবার কেউ কেউ প্রচলিত বানান ভাঙাকে বিপ্লব মনে করেন। এই দুই চরমপন্থার মাঝামাঝি একটি মধ্যপন্থা থাকা আবশ্যক। ইসলামপন্থী লেখক ও কিছু তরুণ প্রজন্মকে এই মধ্যপথে দেখা যায়, যারা বানানের চেয়ে প্রকাশভঙ্গি ও বোধগম্যতার উপর জোর দেন। তাদের লেখায় বাংলা, আরবি, ফারসি, উর্দু ও ইংরেজির সুমিত মিশ্রণ গদ্যকে গতিময় করে তোলে।

বানান নিয়ে বিভিন্ন ঘরানা রয়েছে। ‘প্রসঙ্গবাদী’ ঘরানা অর্থের প্রয়োজনে বানানের ভিন্নতা বোঝাতে চায়, যেমন ‘বর্ণ’ (অক্ষর) ও ‘বর্ণ’ (রঙ)। ‘উচ্চারণবাদী’ ঘরানা শব্দের উচ্চারণ অনুযায়ী বানান লিখতে চায়, বিশেষত বিদেশি শব্দগুলোর ক্ষেত্রে। ‘নির্দেশবাদী’ ঘরানা, যেমন বাংলা একাডেমি, বানানের শৃঙ্খলায় এনে অভিন্নতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে। ‘ঐতিহ্যপ্রেমী’ ঘরানা প্রচলিত ও অভ্যস্ত বানানকেই গুরুত্ব দেয়, যেখানে শব্দের ব্যুৎপত্তি বা নিজস্ব ব্যাখ্যাও প্রভাব ফেলে। ‘নৈরাজ্যবাদী’ ঘরানা প্রচলিত সব বানানকে প্রশ্নবিদ্ধ করে নিজস্ব রীতিতে লেখে।

তবে, পাঠ্যপুস্তকে বা কোনো প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানের প্রবর্তিত বানানই শেষ পর্যন্ত প্রাধান্য পায়, কারণ এটি নতুন প্রজন্মের মধ্যে অভ্যস্ততা তৈরি করে। ষোড়শ শতকের ইংরেজি বানানের সঙ্গে বিংশ শতকের বানানের পার্থক্য এর উদাহরণ। যদিও একটি বিরোধী ধারা সবসময়ই থাকবে, যা স্বাভাবিক ও উপকারী। এই বিভাজনগুলো কখনো কখনো মিশ্রিতও হতে পারে।

অপ্রমিতের শক্তি: যা প্রমিতে হারিয়ে যায়

কিছু ভাব বা অনুভূতি অপ্রমিত ভাষায় প্রকাশ করলে যতটা তীব্র ও জোরালো হয়, প্রমিত ভাষায় তার সিকি ভাগও হয় না। একটি গানের উদাহরণে দেখা যায়, ‘হাইট্টা যায়’ বা ‘ফাইট্টা যায়’ শব্দগুলো যে তীব্রতা ও আবেগ প্রকাশ করে, ‘হেঁটে যায়’ বা ‘ফেটে যায়’ শব্দে তা অনুপস্থিত। ‘হাইট্টা’ শব্দ জুতা ও পায়ের আঘাতের শব্দকে এবং ‘ফাইট্টা’ শব্দ হৃদয়ের ভাঙনের তীব্রতাকে ফুটিয়ে তোলে। অপ্রমিত ভাষায় এই শব্দগুলো এক সুতীব্র হাহাকার সৃষ্টি করে।

অনেক কথাই আছে যা প্রমিত ভাষায় বললে তার শক্তি হারায়। তাই, অপ্রমিত ভাষার শক্তিকে কাজে লাগাতে দ্বিধা করা উচিত নয়।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

মাদকবিরোধী যুদ্ধের নামে হাজারো হত্যা: দুতার্তের বিরুদ্ধে আইসিসি প্রসিকিউটরের বিস্ফোরক অভিযোগ

ভাষা ও ভাবের লেনা-দেনা

আপডেট সময় : ০৪:৪৫:৩৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ২১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

অবশ্যই, আপনার খসড়া আর্টিকেলটিকে পেশাদারী ভাষায় নতুন করে লিখছি।

ভাষা ও ভাবের মেলবন্ধন: বহুমাত্রিকতার শক্তি

ভাষার নিজস্ব কোনো শুদ্ধ বা অশুদ্ধ রূপ নেই। বাংলা ভাষা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বহু ভাষার শব্দকে আত্মস্থ করেছে। ইংরেজি, সংস্কৃত ছাড়াও আরবি, ফারসি, হিন্দি এবং আধুনিক বিশ্বে কোরিয়ান, জাপানিজ, চাইনিজ সহ নানা ভাষার শব্দ বাংলা ভাষায় মিশে গেছে। এই মিশ্রণ ভাষার স্বাভাবিক বিবর্তন, যা জ্ঞানার্জন ও জীবিকার প্রয়োজনে স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। নোয়াম চমস্কির ‘ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যাকুইজিশন ডিভাইস’ (LAD) এবং স্টিফেন ক্রাশেনের ‘মনিটর মডেল’-এর ‘এফেক্টিভ ফিল্টার হাইপোথিসিস’ অনুযায়ী, মানুষের ভাষা শেখার সহজাত ক্ষমতা রয়েছে এবং প্রয়োজন ও মানসিকতা ভাষা অর্জনে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। ‘ভাষা সাম্রাজ্যবাদ’ একটি আলোচিত ধারণা হলেও, ভিন্ন ভাষার সঙ্গে সম্পর্ক একটি ভাষার সমৃদ্ধিই ঘটায়।

আমরা একটি বহুভাষিক সমাজে বাস করি, যেখানে ‘কোড মিক্সিং’ বা ভিন্ন ভাষার শব্দের মিশ্রণ একটি সাধারণ ঘটনা। সমাজভাষাবিজ্ঞান এই ভাষিক পরিবর্তন ও ভাষার বহুবিধ ব্যবহার নিয়ে আলোচনা করে। বাংলা ভাষার নিজস্ব আঞ্চলিক রূপগুলোও এই বৃহত্তর ভাষারই অংশ। ভাষার বৈচিত্র্যই তার শক্তি, যা ভাষাকে আরও প্রকাশক্ষম করে তোলে। সামাজিক মাধ্যমের প্রসারের ফলে বাংলা ভাষা নতুন মাত্রা পাচ্ছে, যেখানে আঞ্চলিক, লিঙ্গীয় এবং পেশাগত নানা স্বর প্রতিফলিত হচ্ছে। শুদ্ধতাবাদীরা ভাষার ক্ষয় নিয়ে উদ্বিগ্ন হলেও, একটি ভাষার স্থিতিস্থাপকতা তার প্রাণশক্তিরই পরিচায়ক।

সাহিত্যিকরা তাঁদের ব্যক্তিগত প্রতিভা ও বৈশিষ্ট্যে ভাস্বর হয়ে সমাজের মানুষের মুখের ভাষাকে তাঁদের লেখায় তুলে ধরেন। ফার্দিনান্দ দ্য সোস্যুরের ‘প্যারোল’ ধারণা অনুযায়ী, ব্যক্তি তার নিজস্ব ভঙ্গিতে সমাজের ভাষাভাণ্ডার থেকে শব্দচয়ন ও ব্যবহার করে। সমাজ যেমন ব্যক্তিকে ভাষা দেয়, তেমনি ব্যক্তিপ্রতিভাও সমাজকে নতুন ভাব প্রকাশের ভাষা সরবরাহ করে। শেক্সপিয়র ও মিলটনের মতো সাহিত্যিকরা ইংরেজি ভাষায় নতুন শব্দ যোগ করেছেন। একুশের চেতনা আমাদের মধ্যে অন্তর্ভুক্তিমূলক ভাষারুচি ও চেতনা জাগিয়ে তুলুক, যেখানে ভাষার আদান-প্রদান ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বজায় থাকে। ভাষিক মৌলবাদ আখেরে বিপজ্জনক হতে পারে।

ফেব্রুয়ারি, ভাষা প্রেম ও রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ

ফেব্রুয়ারি মাস আমাদের ভাষাপ্রেমের মাস। এই সময়ে সাইনবোর্ডে বাংলা ভাষার ব্যবহার নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ দেখা যায়, যা কখনো কখনো জরিমানা বা হেনস্তার মাধ্যমে প্রয়োগ করা হয়। এই উদ্যোগ কতটা জনস্বার্থমূলক, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে। প্রকৃত ভাষাপ্রেম হলে উদ্যোগের ধরন ও ব্যাপকতা ভিন্ন হতে পারত।

ফেব্রুয়ারি এলেই কৃত্রিম ‘অপর’ তৈরির একটি প্রবণতা দেখা যায়। মনে করা হয়, বাংলায় অন্য কোনো ভাষার শব্দ ব্যবহার করা উচিত নয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, কোড মিক্সিং বা একাধিক ভাষার মিশ্রণ আধুনিক বিশ্বের এক অনিবার্য বাস্তবতা। বাংলা, ইংরেজি, আরবি, উর্দু, প্রমিত-অপ্রমিত শব্দের মিশ্রণ স্বাভাবিক। এই স্বাভাবিকতাকে গ্রহণ করাই প্রকৃত ভাষাপ্রেম। আমরা অনেক সময় শব্দের উৎস নিয়ে বিভেদ করি, কিন্তু আবুল মনসুর আহমদের মতো ভাষাবিদরা মনে করেন, যে শব্দ সাধারণ মানুষ বোঝে ও ব্যবহার করে, সেটাই বাংলা শব্দ। রিকশাচালকের মুখে ‘ইনসাফ’ শব্দটি বাংলা ভাষারই অংশ।

বাংলায় সংস্কৃত শব্দের প্রতি যেমন ভালোবাসা দেখা যায়, তেমনি বিদ্বেষও। অথচ, অনেক নতুন শব্দ গঠনে সংস্কৃত ব্যাকরণ অপরিহার্য। অন্যদিকে, আরবি-ফারসি শব্দকে ‘বিধর্মী’ বলে বর্জন করার প্রবণতা ভাষাকে সংকীর্ণ করে তোলে। আবার, আঞ্চলিক ভাষা নিয়ে অতি নিরীক্ষাপ্রবণতা ভাষাকে দুর্বোধ্য করে তুলতে পারে। প্রমিত ও অপ্রমিত ভাষার মিশ্রণ বা একটির অন্যটির প্রভাবই আমাদের নিয়তি।

বানান, বুদ্ধিবৃত্তি ও মধ্যপন্থা

অনেকের কাছে ভাষা জ্ঞান মানেই বানান জ্ঞান। আবার কেউ কেউ প্রচলিত বানান ভাঙাকে বিপ্লব মনে করেন। এই দুই চরমপন্থার মাঝামাঝি একটি মধ্যপন্থা থাকা আবশ্যক। ইসলামপন্থী লেখক ও কিছু তরুণ প্রজন্মকে এই মধ্যপথে দেখা যায়, যারা বানানের চেয়ে প্রকাশভঙ্গি ও বোধগম্যতার উপর জোর দেন। তাদের লেখায় বাংলা, আরবি, ফারসি, উর্দু ও ইংরেজির সুমিত মিশ্রণ গদ্যকে গতিময় করে তোলে।

বানান নিয়ে বিভিন্ন ঘরানা রয়েছে। ‘প্রসঙ্গবাদী’ ঘরানা অর্থের প্রয়োজনে বানানের ভিন্নতা বোঝাতে চায়, যেমন ‘বর্ণ’ (অক্ষর) ও ‘বর্ণ’ (রঙ)। ‘উচ্চারণবাদী’ ঘরানা শব্দের উচ্চারণ অনুযায়ী বানান লিখতে চায়, বিশেষত বিদেশি শব্দগুলোর ক্ষেত্রে। ‘নির্দেশবাদী’ ঘরানা, যেমন বাংলা একাডেমি, বানানের শৃঙ্খলায় এনে অভিন্নতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে। ‘ঐতিহ্যপ্রেমী’ ঘরানা প্রচলিত ও অভ্যস্ত বানানকেই গুরুত্ব দেয়, যেখানে শব্দের ব্যুৎপত্তি বা নিজস্ব ব্যাখ্যাও প্রভাব ফেলে। ‘নৈরাজ্যবাদী’ ঘরানা প্রচলিত সব বানানকে প্রশ্নবিদ্ধ করে নিজস্ব রীতিতে লেখে।

তবে, পাঠ্যপুস্তকে বা কোনো প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানের প্রবর্তিত বানানই শেষ পর্যন্ত প্রাধান্য পায়, কারণ এটি নতুন প্রজন্মের মধ্যে অভ্যস্ততা তৈরি করে। ষোড়শ শতকের ইংরেজি বানানের সঙ্গে বিংশ শতকের বানানের পার্থক্য এর উদাহরণ। যদিও একটি বিরোধী ধারা সবসময়ই থাকবে, যা স্বাভাবিক ও উপকারী। এই বিভাজনগুলো কখনো কখনো মিশ্রিতও হতে পারে।

অপ্রমিতের শক্তি: যা প্রমিতে হারিয়ে যায়

কিছু ভাব বা অনুভূতি অপ্রমিত ভাষায় প্রকাশ করলে যতটা তীব্র ও জোরালো হয়, প্রমিত ভাষায় তার সিকি ভাগও হয় না। একটি গানের উদাহরণে দেখা যায়, ‘হাইট্টা যায়’ বা ‘ফাইট্টা যায়’ শব্দগুলো যে তীব্রতা ও আবেগ প্রকাশ করে, ‘হেঁটে যায়’ বা ‘ফেটে যায়’ শব্দে তা অনুপস্থিত। ‘হাইট্টা’ শব্দ জুতা ও পায়ের আঘাতের শব্দকে এবং ‘ফাইট্টা’ শব্দ হৃদয়ের ভাঙনের তীব্রতাকে ফুটিয়ে তোলে। অপ্রমিত ভাষায় এই শব্দগুলো এক সুতীব্র হাহাকার সৃষ্টি করে।

অনেক কথাই আছে যা প্রমিত ভাষায় বললে তার শক্তি হারায়। তাই, অপ্রমিত ভাষার শক্তিকে কাজে লাগাতে দ্বিধা করা উচিত নয়।