দীর্ঘ দেড় দশকের স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটিয়ে এক নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ে পদার্পণ করেছে বাংলাদেশ। একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত হয়েছে নতুন সরকার, যেখানে দীর্ঘ সময় পর সংসদীয় রাজনীতিতে শক্তিশালী বিরোধী দলের উপস্থিতিও নিশ্চিত হয়েছে। জুলাই বিপ্লবের চেতনা ও ত্যাগের পটভূমিতে গঠিত এই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদকে ঘিরে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা এখন আকাশচুম্বী। জনগণের চাওয়া—সরকার ও বিরোধী দল কেবল ক্ষমতার দ্বন্দ্বে লিপ্ত না থেকে পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে একটি ন্যায়ভিত্তিক ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গড়ে তুলবে।
গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করেছে বিএনপি। অন্যদিকে, রাজনৈতিক ইতিহাসে সর্বোচ্চ আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে জামায়াতে ইসলামী। তাদের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়েছে জুলাই আন্দোলনের অন্যতম শক্তি এনসিপিসহ আরও তিনটি ইসলামপন্থী দল। সব মিলিয়ে ৭৭ সদস্যের একটি শক্তিশালী বিরোধী জোট পেয়েছে সংসদ। যদিও সরকারি ও বিরোধী দলের আসনের ব্যবধান অনেক, তবে প্রাপ্ত ভোটের ব্যবধান নির্দেশ করে যে দেশের একটি বড় অংশই বিরোধী শিবিরের আদর্শে আস্থাশীল। সরকারি দল যেখানে ৫০ শতাংশ ভোট পেয়েছে, সেখানে বিরোধী জোটের পক্ষে পড়েছে ৩৮ শতাংশ ভোট।
নতুন সরকারের শপথ গ্রহণের পর থেকেই নাগরিক জীবনে পরিবর্তনের হাওয়া বইতে শুরু করেছে। তবে এই আশার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে প্রত্যাশার চাপও। সাধারণ মানুষের প্রধান দাবি—দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণ করা। কারওয়ান বাজারে আসা সাধারণ ক্রেতা থেকে শুরু করে খেটে খাওয়া মানুষ, সবারই অভিন্ন আরজি—বাজার সিন্ডিকেট ভেঙে নিত্যপণ্যের দাম সাধারণের নাগালে আনা। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো যখন জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে, তখন সরকারের প্রথম ১০০ দিনের অগ্রাধিকার তালিকায় বাজার ব্যবস্থাপনা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নকে শীর্ষে দেখতে চান নাগরিকরা।
তরুণ প্রজন্মের বড় একটি অংশ কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা চায়। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের মূল সুরই ছিল মেধাভিত্তিক ও স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া। তাই সরকারি ও বেসরকারি খাতে নিয়োগে স্বচ্ছতা আনা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে ঋণ সুবিধা বাড়ানো এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির দাবি জোরালো হচ্ছে। একই সঙ্গে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন এবং গবেষণা খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। তাদের মতে, কর্মমুখী শিক্ষা নিশ্চিত করতে না পারলে বিপ্লব-পরবর্তী বাংলাদেশের লক্ষ্য পূরণ সম্ভব হবে না।
সুশাসন ও দুর্নীতি দমনে সরকারের কঠোর অবস্থান দেখতে চায় সচেতন মহল। প্রশাসনকে দলীয়করণমুক্ত করে একটি জবাবদিহিমূলক কাঠামো গড়ে তোলা এবং বিদেশে অর্থ পাচার রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া নতুন মন্ত্রিসভার বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। সাধারণ মানুষের মতে, গত ১৫ বছরের দুঃশাসন থেকে শিক্ষা নিয়ে সরকারকে দমন-পীড়নের নীতি পরিহার করতে হবে এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখাতে হবে।
সরকারের পাশাপাশি বিরোধী দলের ভূমিকা নিয়েও দেশবাসীর প্রত্যাশা কম নয়। বিগত সময়ের নেতিবাচক বা ধ্বংসাত্মক রাজনীতির পরিবর্তে গঠনমূলক সমালোচনার সংস্কৃতি দেখতে চায় জনগণ। বিরোধী দল কেবল বিরোধিতার খাতিরে বিরোধিতা না করে সরকারের ভুলগুলো ধরিয়ে দেবে এবং জনস্বার্থবিরোধী যেকোনো সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সংসদে ও রাজপথে সোচ্চার থাকবে—এমনটাই প্রত্যাশা। এরই মধ্যে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান ঘোষণা দিয়েছেন যে, তারা একটি দায়িত্বশীল বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করবেন এবং সরকারের সব জনকল্যাণমূলক কাজে সহযোগিতা করবেন।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনার এটি একটি সুবর্ণ সুযোগ। জুলাই বিপ্লবের শহীদদের আত্মত্যাগ সার্থক করতে হলে সরকার ও বিরোধী দল উভয়কেই সহনশীল হতে হবে। ধ্বংসাত্মক রাজনীতি বা জ্বালাও-পোড়াওয়ের সংস্কৃতি পরিহার করে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের ভিত্তিতে দেশ পরিচালনা করতে হবে। প্রশাসন ও বিচার বিভাগকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়ার পাশাপাশি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করাই হবে নতুন সরকারের প্রকৃত সাফল্য। জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে আসা এই সংসদ যেন কেবল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু না হয়ে জনদুর্ভোগ লাঘবের কার্যকর হাতিয়ার হয়ে ওঠে, সেটিই এখন সময়ের দাবি।
রিপোর্টারের নাম 























