উচ্চগতির স্যাটেলাইট ইন্টারনেটের বৈশ্বিক প্রতিশ্রুতি নিয়ে বাংলাদেশে যাত্রা শুরু করলেও দেশের বাজারে আশানুরূপ সাড়া জাগাতে পারছে না ইলন মাস্কের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান স্টারলিংক। আধুনিক প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক মানের সেবার ঘোষণা থাকলেও উচ্চমূল্য, আমদানিতে জটিলতা এবং স্থানীয় পর্যায়ে সেবার অভাবসহ নানা কারণে গ্রাহক আকর্ষণে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে এই স্যাটেলাইট ইন্টারনেট পরিষেবা।
২০২৫ সালের ২৯ এপ্রিল বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ১০ বছর মেয়াদি লাইসেন্স পায় স্টারলিংক সার্ভিসেস বাংলাদেশ। এরপর ১৮ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করে তারা। তবে আড়ম্বরপূর্ণ সূচনার প্রায় আড়াই মাস পেরিয়ে গেলেও প্রতিষ্ঠানটি এখন পর্যন্ত মাত্র ১ হাজার ৯৩৩ জন গ্রাহক সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছে। প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, স্টারলিংকের উচ্চ সেটআপ খরচ এবং মাসিক সাবস্ক্রিপশন ফি বাংলাদেশের সাধারণ ও ব্যবসায়িক গ্রাহকদের সক্ষমতার বাইরে। এছাড়া হার্ডওয়্যার আমদানিতে কাস্টমস জটিলতা এবং আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়ের সীমাবদ্ধতাও গ্রাহকদের অনাগ্রহের অন্যতম কারণ।
বাজার সংশ্লিষ্ট তথ্যানুযায়ী, স্টারলিংকের সংযোগ নিতে একজন গ্রাহককে এককালীন যন্ত্রপাতি সেটআপ বাবদ ব্যয় করতে হচ্ছে প্রায় ৪৭ হাজার টাকা। এর বাইরে আবাসিক সংযোগের জন্য মাসিক ফি ৬ হাজার টাকা এবং ‘লাইট’ প্যাকেজের জন্য গুনতে হচ্ছে ৪ হাজার ২০০ টাকা। যেখানে দেশের বিদ্যমান ফাইবার অপটিক্যাল ও ৪জি নেটওয়ার্ক অনেক সাশ্রয়ী মূল্যে সেবা দিচ্ছে, সেখানে এই উচ্চ ব্যয় সাধারণ গ্রাহকদের নিরুৎসাহিত করছে।
পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশে সেবা প্রদানের লক্ষ্যে স্টারলিংক সাবমেরিন কেবল কোম্পানি থেকে ২০০ গিগাবাইট এবং আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট গেটওয়ে (আইআইজি) অপারেটরদের কাছ থেকে ৮০ জিবিপিএস ব্যান্ডউইথ বরাদ্দ নিয়েছে। তবে বিপুল এই সক্ষমতার বিপরীতে বর্তমানে গ্রাহক পর্যায়ে ব্যবহৃত হচ্ছে মাত্র ৩০ জিবিপিএস ব্যান্ডউইথ।
তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল উচ্চমূল্যই নয়, কারিগরি ও প্রশাসনিক জটিলতাও স্টারলিংকের প্রসারে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (আইএসপিএবি) পক্ষ থেকে অভিযোগ তোলা হয়েছে যে, স্টারলিংকের কার্যক্রম দেশীয় ইন্টারনেট উদ্যোক্তাদের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এছাড়া বিটিআরসির নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থার বাইরে থেকে অবাধ ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ থাকায় সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়ের আশঙ্কাও প্রকাশ করেছেন কেউ কেউ। তাদের মতে, লাইসেন্স নীতি অনুযায়ী বাণিজ্যিক আইপিএলসি ব্যবহার বা ক্রস-বর্ডার ডেটা সঞ্চালনের ক্ষেত্রে যে বিধিনিষেধ রয়েছে, তা কঠোরভাবে তদারকি করা প্রয়োজন।
এদিকে, নিরাপত্তাসংক্রান্ত আইনগত বাধ্যবাধকতা বা ‘ল’ফুল ইন্টারসেপশন কমপ্লায়েন্স’ (এলআই কমপ্লায়েন্স) নিয়েও বিটিআরসির প্রশ্নের মুখে রয়েছে স্টারলিংক। এনটিএমসিকে কমপ্লায়েন্স এপিআই টুল সরবরাহ করলেও তা এখনো পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। পাশাপাশি বাংলাদেশে অবস্থানরত বিদেশি রোমিং গ্রাহকরা স্থানীয় গ্রাউন্ড স্টেশনের মাধ্যমে সেবা পাচ্ছেন কি না, তা নিয়েও অস্পষ্টতা রয়ে গেছে।
গ্রাহক পর্যায়ে অসন্তোষের আরেকটি বড় কারণ হলো স্থানীয় সাপোর্ট বা অভিযোগ নিষ্পত্তিতে ধীরগতি। দেশের সাধারণ ইন্টারনেট সংযোগে কোনো সমস্যা দেখা দিলে স্থানীয় আইএসপি কর্মীরা দ্রুত সমাধান দিতে পারলেও স্টারলিংকের ক্ষেত্রে সেই সুযোগ নেই। সব মিলিয়ে স্যাটেলাইট ইন্টারনেট বাংলাদেশের প্রযুক্তি খাতে নতুন দিগন্ত উন্মোচনের সম্ভাবনা তৈরি করলেও বর্তমান কাঠামো ও বাজার বাস্তবতায় স্টারলিংক এখনো প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নীতিমালার যথাযথ প্রয়োগ এবং খরচ সহনীয় পর্যায়ে না আনলে দেশের বাজারে বড় অবস্থান তৈরি করা প্রতিষ্ঠানটির জন্য কঠিন হবে।
রিপোর্টারের নাম 























