জাতীয় বিপ্লবী পরিষদের আহ্বায়ক খোমেনী ইহসান ‘জুলাই গণহত্যা’য় জড়িতদের বিচার ও শাস্তি কার্যকর, বিদ্যমান ‘ফ্যাসিবাদী’ সংবিধান বাতিল এবং আইন করে আওয়ামী লীগসহ সব ‘ফ্যাসিবাদী’ দল ও সংগঠন নিষিদ্ধ করার দাবিতে ছয় মাসের আল্টিমেটাম ঘোষণা করেছেন। শুক্রবার জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে অনুষ্ঠিত এক বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে তিনি এই আল্টিমেটাম দেন।
সমাবেশের সভাপতির বক্তব্যে খোমেনী ইহসান অভিযোগ করেন, ক্ষমতাসীন বিএনপির সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ না করে এবং সন্ত্রাসবাদী আইনে নিষিদ্ধ ‘ফ্যাসিবাদী দল’ আওয়ামী লীগকে সারা দেশে কার্যালয় খুলতে দিয়ে জনগণের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছেন। তিনি বলেন, জনগণ সন্দেহ করছে যে, ভারত ও আওয়ামী লীগের সঙ্গে আঁতাত করে বিএনপি ‘জুলাই বিপ্লবের শহীদদের রক্তের সঙ্গে বেইমানি’ করছে। এর ফলে শহীদ আবু সাঈদ, শহীদ মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ, শহীদ ওয়াসিম আকরাম ও শহীদ শরীফ ওসমান হাদি হত্যাসহ ‘জুলাই গণহত্যার’ বিচার হওয়া নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।
খোমেনী ইহসান আরও বলেন, ‘ফ্যাসিবাদী দল’ আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী দল-সংগঠনের দলগত বিচারের বদলে পুনর্বাসন হবে, এমন আলামতও স্পষ্ট। তার অভিযোগ, ইতোমধ্যে নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান ‘ফ্যাসিবাদী দল’ আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ করার বিষয়ে নেতিবাচক মনোভাব ব্যক্ত করেছেন।
সামগ্রিক পরিস্থিতিতে ‘জুলাই গণহত্যার’ বিচার ও সংসদে আইন পাস করে ‘ফ্যাসিবাদী রাজনীতি’ নিষিদ্ধ করার বিষয়ে চুপ করে থাকার অবকাশ নেই মন্তব্য করে খোমেনী ইহসান বলেন, বিচার আদায় করতে হলে লাগাতার আন্দোলনের মধ্যে থাকতে হবে। তিনি ঘোষণা দেন, ছয় মাসের মধ্যে বিচার ও শাস্তি কার্যকর করতে দুই মাসের মধ্যে জেলায় জেলায় ট্রাইব্যুনাল খোলা এবং সকল অভিযুক্ত খুনিকে গ্রেপ্তার করার বিষয়ে জনগণকে রাজপথে নামানো হবে। ‘ফ্যাসিবাদী দল ও সংগঠনের’ দলগত বিচারের দাবি আদায়েও রাজপথে প্রতিরোধ ও সংসদ ঘেরাও করা হবে।
বাংলাদেশের বিদ্যমান সংবিধানকে ‘ফ্যাসিবাদী’ আখ্যা দিয়ে খোমেনী ইহসান বলেন, শহীদ খালেদা জিয়া বিপুল জনসমাবেশে ঘোষণা দিয়ে গেছেন যে, জনগণের সরকার কায়েম হলে বর্তমান সংবিধান ছুঁড়ে ফেলা হবে। তাঁর এ অবস্থান বাংলাদেশের আপামর জনগণেরই অবস্থান। তিনি বলেন, ‘ফ্যাসিবাদী’ শেখ হাসিনা বর্তমান সংবিধানের দোহাই দিয়েই পরপর তিনটি নির্বাচন জালিয়াতি করেছেন, বিএনপি-জামায়াত-হেফাজতের হাজার হাজার নেতাকর্মীকে গুলি করে হত্যা করেছেন এবং শত শত মানুষকে গুম করেছেন।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান সংবিধান ‘ফ্যাসিবাদী’ হওয়ার বড় প্রমাণ হলো ফ্যাসিস্ট শাসক শেখ মুজিবের ছবি উত্তোলনকে সাংবিধানিক আইনে পরিণত করা হয়েছে। তাছাড়া এ সংবিধানে ৯২ ভাগ মুসলমানের ওপর ধর্মনিরপেক্ষতা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, যা মুসলমানদের ওপর জবরদস্তি এবং অমুসলিমদের জন্যও কোনো উপকার বয়ে আনেনি। বরং ধর্মনিরপেক্ষতা হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সব ধর্মকেই অধিকারহীন করেছে। সবচেয়ে বড় কথা হলো এ সংবিধানে জনগণের মৌলিক অধিকারের কোনো স্বীকৃতি নাই। এটি প্রধানমন্ত্রী, তার আজ্ঞাবহ আমলাতন্ত্র, সরকারি দল ও শাসক শ্রেণির জমিদারি কায়েম ও জনগণকে প্রজা বানানোর সংবিধান। তাই এ সংবিধান পুরোপুরি বাতিল করে জনগণতান্ত্রিক সংবিধান প্রণয়ন করতে হবে।
নতুন সংবিধান প্রণয়নের জন্য জনমত তৈরি করে সর্বাত্মক গণআন্দোলন গড়ে তুলতে গণতন্ত্রকামী সকল রাজনৈতিক দল ও সংগঠনকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ডাক দেন খোমেনী ইহসান। তিনি আশা প্রকাশ করেন, বাংলাদেশের প্রধান সংকট ‘ফ্যাসিবাদী সংবিধান’ থেকে মুক্ত হতে জনগণ অচিরেই একটি ব্যাপকভিত্তিক গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত করবে।
সমাবেশে ইউনাইটেড পিপলস বাংলাদেশের (আপ বাংলাদেশ) প্রধান সংগঠক নাঈম আহমাদ বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশে ফিরে জনগণের আবেগ ‘ক্যাশ’ করার জন্য শহীদ শরীফ ওসমান বিন হাদির কবর জিয়ারত করলেও ক্ষমতায় বসার পর সরকার শহীদ হাদি হত্যার বিচারের কথা ভুলে গেছে। তিনি অভিযোগ করেন, সরকার সংস্কারকে পাশ কাটিয়ে ‘জুলাই বিপ্লবকে’ উপেক্ষা করতে চাইছে।
জাতীয় বিপ্লবী পরিষদের যুগ্ম-আহ্বায়ক সাইয়েদ কুতুব বলেন, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হলো ‘৭২-এর সংবিধান’। শাসক শ্রেণি ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে বারবার এ সংবিধানের দোহাই দিয়ে জনগণকে নিপীড়ন করেছে। তিনি আরও বলেন, শহীদ বেগম খালেদা জিয়া বলেছিলেন জনগণের সরকার ক্ষমতায় আসলে ‘৭২-এর সংবিধান ছুড়ে ফেলবে। কিন্তু বিএনপি ক্ষমতায় আসতে না আসতেই সংবিধানের দোহাই দিয়ে সংস্কার ও গণভোটকে উপেক্ষা করছে। তাই প্রশ্ন উঠছে ‘জুলাই বিপ্লবের’ হাজারো মানুষের রক্তের বিনিময়ে পাওয়া সরকার কি জনগণের না?
জাতীয় বিপ্লবী পরিষদের কেন্দ্রীয় নেতা আরাফাত রহমান শৈশব হুঁশিয়ারি দেন, ছয় মাসের মধ্যে যদি ‘ফ্যাসিবাদী সংবিধান’ বাতিল ও ‘ফ্যাসিবাদী রাজনীতি’ নিষিদ্ধ এবং শহীদ আবু সাইদ, ওয়াসিম আকরাম ও ওসমান হাদিসহ ‘জুলাই গণহত্যার’ বিচার না করা হয়, তবে ছাত্র-কৃষক-শ্রমিক-জনতা রাজপথে কঠিন কর্মসূচি দিতে বাধ্য হবে।
বিপ্লবী ছাত্র পরিষদের সহকারী সদস্য সচিব জিহাদী ইহসান বলেন, জনগণের আকাঙ্ক্ষা পদদলিত করে যারা শহীদদের রক্তকে তাচ্ছিল্য করে গণভোটকে অবৈধ বলে, জনগণের রায়ের প্রতি প্রতারণা করে আল্লাহ তাদের বাংলাদেশের জমিনে ধ্বংস করে দেবেন। তিনি ‘বাহাত্তরের গালগল্পের সংবিধান’ বাতিল করে, ‘জুলাই গণহত্যা’, পিলখানা গণহত্যা, গুমখুনের দৃশ্যমান বিচার প্রক্রিয়া শুরুর দাবি জানান। অন্যথায় কঠোর আন্দোলন গড়ে তোলার ঘোষণা দেন।
বিপ্লবী ছাত্র পরিষদের সদস্য সচিব ফজলুর রহমানের সঞ্চালনায় সমাবেশে জাতীয় বিপ্লবী পরিষদের সহকারী সদস্য সচিব আব্দুস সালাম, সদস্য সাইদুল ইসলাম, আব্দুল্লাহ আল মাহফুজ, বায়েজিদ বোস্তামি, আহত জুলাই যোদ্ধা মো. শফিকুর রহমান, বিপ্লবী ছাত্র পরিষদের সহকারী সদস্য সচিব ডা. নাবিল আহমদ, বাংলাদেশ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আহবায়ক মো. আরিফুল ইসলাম, মাদ্রাসা-ই-আলিয়া শাখার আহ্বায়ক রাকিবুল ইসলাম মণ্ডল ও সদস্য সচিব মো. জিনাত হুসাইন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
রিপোর্টারের নাম 

























