উত্তর চট্টগ্রামের শাইনিং জুয়েলস ইনস্টিটিউটে গত ১১ ফেব্রুয়ারি শনিবার সন্ধ্যায় ‘জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে নাগরিক ভাবনা’ শীর্ষক এক আলোচনা সভার আয়োজন করে পাঠকমেলার স্থানীয় সংগঠন। সভায় বক্তারা রাষ্ট্রকাঠামো, বিচার বিভাগ ও নির্বাচন ব্যবস্থাসহ গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় ইস্যুতে জুলাই সনদের অপরিহার্যতা তুলে ধরে এর দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন।
সংগঠনের যুগ্ম আহ্বায়ক প্রিন্সিপাল খায়ের উদ্দীন আহমেদ সোহেলের সভাপতিত্বে এবং সদস্য-সচিব মুহাম্মদ মহসীন আবুল কাশেমের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত এ সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও চট্টগ্রাম সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ (অব.) প্রফেসর মো. আবুল হাসান। প্রধান আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অনুসন্ধানী সাংবাদিক সোহাগ কুমার বিশ্বাস এবং বিশেষ অতিথি ছিলেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ওচমান জাহাঙ্গীর।
সভায় স্বাগত বক্তব্যে পাঠকমেলার জ্যেষ্ঠ সদস্য, চিন্তক ও লেখক সিএম আলী হায়দার ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমল থেকে বাংলার স্বাধীনতাকামী মানুষের দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস তুলে ধরেন। তিনি বলেন, কৌশলগত ভুল বা গভীর ষড়যন্ত্রের কারণে প্রতিবারই যৌক্তিক পরিণতিতে পৌঁছানোর আগেই এসব আন্দোলন স্বার্থান্বেষী মহলের হাতে চলে যায়। এর ফলে শান্তিপ্রিয় জনগণ বারবার প্রতারিত হয়েছে। অতীতের শিক্ষা নিয়ে এবার আলোচিত জুলাই বিপ্লবের সুফল রক্ষায় আমাদের ঘুরে দাঁড়াতে হবে।
এ বক্তব্যের সূত্র ধরে মুহাম্মদ মহসীন আবুল কাশেম বলেন, ঘুরে দাঁড়ানোর অর্থ হলো, ১৬২ শিশুসহ সহস্রাধিক শহীদ ও অগণিত আহত ছাত্র-জনতার রক্তের বিনিময়ে অর্জিত বিপ্লবের পটভূমিতে রচিত জুলাই জাতীয় সনদকে আইনি ভিত্তি প্রদানের গুরুত্ব বিবেচনায় মজবুত ও টেকসই পদ্ধতির অবলম্বন। তা না করতে পারলে এর খেসারত পুরো শতাব্দী ধরে দিতে হতে পারে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, জুলাইবিরোধী প্রচারণার বিপরীতে জনগণের মন্তব্য দেখলেই বোঝা যায়, তারা এসব অপপ্রচারকে ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করতে বদ্ধপরিকর।
সংগঠক ইঞ্জিনিয়ার আনোয়ার হোসেন মিশু বলেন, বিপ্লবী শহীদ ওসমান হাদির হত্যাকারীসহ চব্বিশের গণহত্যা পরিচালনাকারী জাতির শত্রুদের সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করে ভবিষ্যতের জন্য ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে চাইলে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের বিকল্প নেই।
জ্যেষ্ঠ ব্যাংকার মু. রফিকুল ইসলাম ইসলামাবাদী মন্তব্য করেন, বর্ষাবিপ্লবের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদমুক্ত হয়ে জেল-জুলুম থেকে নিষ্কৃতি পেয়ে এবং প্রবাসের উদ্বাস্তু জীবন থেকে মুক্ত হয়ে দেশে এসে অবাধ বিচরণের সুযোগলাভকারী রাজনীতিকরা সেই বিপ্লবের পটভূমিতে রচিত জুলাই সনদ বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি করে স্ববিরোধী অবস্থান নিয়েছেন, যা সচেতন জনগণ ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করবে।
আলোচ্য সনদের বিশেষত্ব উল্লেখ করে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ওচমান জাহাঙ্গীর বলেন, বহুল প্রত্যাশিত এ সনদ কোনো সাধারণ বিষয় নয়। এর বাস্তবায়ন একটি সিদ্ধান্তমূলক প্রক্রিয়া। রাষ্ট্রের আমূল সংস্কারে এর যথার্থতা সবাইকে অনুধাবন করতে হবে এবং ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে তা বাস্তবায়নে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হতে হবে।
অনুসন্ধানী সাংবাদিক সোহাগ কুমার বিশ্বাস বলেন, স্বপ্নের কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ বিনির্মাণে প্রচলিত ভঙ্গুর, ঘুণে ধরা ও কলুষিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার সংস্কার অবশ্য কর্তব্য। তাই আত্মবিশ্বাসী দেশপ্রেমিক জনতাকে সঙ্গে নিয়ে অপশক্তির মোকাবিলায় দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের রক্ষাকবচ হয়ে দাঁড়াতে হবে এবং জুলাইবিরোধী ফ্যাসিস্ট ও সেমি ফ্যাসিস্ট শক্তির দেশে আবার গুম, খুন ও আধিপত্যবাদী রাজনীতি পুনঃপ্রতিষ্ঠার ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে দিতে হবে। তাহলেই মুক্তি সম্ভব।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে দীর্ঘ ৪০ বছরের শিক্ষকতার জীবনে বেশকটি সরকারি কলেজে বিভাগীয় প্রধান, প্রফেসর ও অধ্যক্ষ হিসেবে একাডেমিক ও প্রশাসনিক গুরুদায়িত্ব পালনকারী সামাজিক ব্যক্তিত্ব মো. আবুল হাসান বলেন, সংবিধানের গুরুত্বপূর্ণ ধারা পরিবর্তন বা সংশোধনের প্রক্রিয়া কী হবে, প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার ভারসাম্য কীভাবে রক্ষা হবে, বিচার বিভাগ কীভাবে পরিচালিত হবে, ভবিষ্যতের নির্বাচন ব্যবস্থা কেমন হবে, একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ কতদিন প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন, সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলো কীভাবে গঠিত হবে, জাতীয় সংসদের স্পিকার-ডেপুটি স্পিকারসহ সাংবিধানিক পদগুলোয় নিয়োগ প্রক্রিয়া কোন পদ্ধতিতে হবে প্রভৃতি নানা রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে জুলাই জাতীয় সনদ প্রবর্তিত হয়েছে। বর্ণিত বিষয়ে এর আগে যে নীতি-কাঠামো প্রচলিত ছিল, তা মূলত গণতান্ত্রিক স্বৈরতন্ত্র ও দলীয় স্বেচ্ছাচারিতা তথা একনায়কতন্ত্র ছাড়া আর কিছুই নয়। তাই সর্বাঙ্গ সংস্কারের মাধ্যমে রাষ্ট্রের অঙ্গগুলোর কার্যকারিতা, পেশাদারিত্ব ও জবাবদিহিতা বাড়াতে আইনত জুলাই সনদের বাস্তবায়নে সবাইকে ব্যাপকভাবে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।
সভায় সভাপতির সমাপনী বক্তব্যে শিক্ষাবিদ ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব খায়ের উদ্দীন আহমেদ সোহেল বলেন, দুঃখজনক বিষয় যে, অগণিত ছাত্র-জনতার বিসর্জনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে পরিবর্তনকামী জনগণের নৈতিক আকাঙ্ক্ষার বিরুদ্ধে গিয়ে ক্ষমতাপ্রত্যাশী অনেকের মধ্যে পুরোনো রাজনৈতিক বন্দোবস্তে দেশ পরিচালনার ভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে, যা নিঃসন্দেহে ফ্যাসিস্ট পুনর্বাসনের অপপ্রয়াস। এজন্য সামগ্রিক পরিবর্তনের পক্ষে জোয়ার সৃষ্টি করে সব চক্রান্ত রুখে দেওয়া বাঞ্ছনীয়।
ওই সভায় আরও বক্তব্য দেন সমাজকর্মী ও সংগঠক মাওলানা মনিরুল ইসলাম, পদ্মা অয়েলের সাবেক সিনিয়র কর্মকর্তা সায়ফুদ্দিন আহমেদ ও চিকিৎসক ডা. মো. জানে আলম। পাঠকমেলার যুগ্ম সদস্য-সচিব মো. মনির উদ্দীনসহ এতে আরও অংশ নেন ব্যবসায়ী ফরিদ উদ্দীন, মো. ফরিদুল আলম বাবলু, সংগঠক মুজিবুর রহমান, ব্যবসায়ী গোলাম মোস্তফা রেজা, যমুনা ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার মো. সাইফুদ্দিন, অধ্যক্ষ মো. হাসান সোহরাব উদ্দীন জুয়েল, সেনাসদস্য (অব.) সাহাবুদ্দিন, ছাত্রনেতা নাহিদুল ইসলাম, ফটো সাংবাদিক মিনহাজ, থেরাপিস্ট শামসুল আরেফীন সাকিব ও কুমার বিশ্বজিৎ প্রমুখ।
রিপোর্টারের নাম 





















