## শিরোনাম: রমজানের ঐতিহ্যে রঙিন পুরান ঢাকা: চকবাজারের ইফতারি উৎসব
ভূমিকা:
বসন্তের কোকিলের ডাক আর শিমুল-পলাশের লালিমার সঙ্গে সঙ্গে মুসলিম উম্মাহর জীবনে নিয়ে এসেছে আত্মসংযম ও ত্যাগের বার্তা নিয়ে পবিত্র মাহে রমজান। ১৪৪৭ হিজরি সনের এই রমজান মাস রহমত, বরকত ও মাগফিরাতের এক অনবদ্য সুযোগ। এই পবিত্র মাসে সিয়াম সাধনার পাশাপাশি ইফতার ও সাহরিও এক বিশেষ ইবাদত। আর এই ইবাদতের অংশ হিসেবেই পুরান ঢাকার চকবাজার পরিণত হয়েছে এক বর্ণিল ইফতার উৎসবে, যেখানে ঐতিহ্য, স্বাদ এবং গন্ধ মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।
বিস্তারিত বর্ণনা:
পুরান ঢাকার বাতাসে সকাল থেকেই মিশে যেতে থাকে নানা ধরনের মুখরোচক ইফতার সামগ্রীর সুঘ্রাণ। সারাদিনের উপবাসের পর সন্ধ্যার ইফতার যদি হয় ঐতিহ্যের ছোঁয়া এবং খানদানি স্বাদে ভরপুর, তবে তা এক অসাধারণ উৎসবে পরিণত হয়। আর এই উৎসবের কেন্দ্রবিন্দু হলো চকবাজারের শাহি ইফতারির বাজার।
ঐতিহ্যবাহী এই ইফতার বাজারের সূচনা হয়েছিল মোগল আমলে। ১৬৭৬ সালে মোগল সুবেদার শায়েস্তা খান ঐতিহাসিক শাহি মসজিদ নির্মাণ করেন এবং পরবর্তীতে ১৭০২ সালে নবাব মুর্শিদ কুলি খাঁ চকবাজারকে একটি আধুনিক বাজারে রূপ দেন। তখন থেকেই রমজান মাসে এখানে বসতে শুরু করে মুখরোচক ইফতারির এক ভাসমান বাজার। ঢাকার বয়স যখন চার শতক ছাড়িয়েছে, তখন চকবাজারের ইফতারির ইতিহাসও তিন শতাব্দীরও বেশি পুরনো বলে অনুমান করা যায়।
গতকাল, অর্থাৎ রমজানের প্রথম দিন, সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে দুপুর থেকেই শাহি মসজিদের সামনের সড়কসহ পুরো চকবাজারের চেহারা পাল্টে যেতে শুরু করেছে। রাস্তার মাঝখানে সারি সারি অস্থায়ী টেবিল, বাঁশের কাঠামো এবং রঙিন সামিয়ানা দিয়ে সাজানো হয়েছে। টেবিলগুলোতে শোভা পাচ্ছে রান্না করা খাসি, যার দাম ১২ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত। এছাড়া, হরেক রকম মসলা দিয়ে রান্না করা রাজহাঁস, চীনা হাঁস, দেশি হাঁসও পাওয়া যাচ্ছে, যার দাম যথাক্রমে তিন হাজার, দুই হাজার ও এক হাজার টাকা। বড় বড় শিকের সঙ্গে জড়ানো সুতি কাবাব এবং জালি কাবাব স্তরে স্তরে সাজিয়ে রাখা হয়েছে।
টিক্কা কাবাব, বিফ স্টিক, চিকেন স্টিক, কিমা পরোটা, শাহি পরোটা, টানা পরোটা, খাসির কাবাব, গরুর কাবাব—সবকিছুই বিশাল বিশাল গামলায় সাজিয়ে পরিবেশন করা হচ্ছে। এছাড়াও দইবড়া, হালিম, ছোলা, ঘুগনিসহ বিভিন্ন ধরনের চপও পাওয়া যাচ্ছে। অন্যপাশে কাচ্চি বিরিয়ানি, তেহারি, মোরগ পোলাও, খাসির রানের রোস্ট, কবুতর ও কোয়েলের রোস্টও ক্রেতাদের আকর্ষণ করছে। মিষ্টির সারিতে চিকন জিলাপি, বড় শাহি জিলাপি, ফালুদা, ফিরনি, লাবাং, নূরানি লাচ্ছি, পনির, পেস্তা বাদামের শরবত, ছানামাঠা—সব মিলিয়ে এক বর্ণিল আয়োজন, যা চোখ, নাক এবং মনকে তৃপ্ত করে।
মোহাম্মদ মিরাজ, যিনি নয় বছর ধরে ফালুদা, ফিরনি, পেস্তা বাদামের শরবত ও জর্দা বিক্রি করছেন, জানালেন এটি তাদের পারিবারিক ব্যবসা। তার বাবা মোহাম্মদ সোহরাবও রমজানে একই ব্যবসা করতেন। এটি তাদের কাছে শুধু আয়ের উৎসই নয়, বরং এক পারিবারিক ঐতিহ্য।
চকবাজারে প্রবেশ করলেই কিছু বিশেষ ছড়া শোনা যায়, যা এই বাজারের জনপ্রিয়তাকে আরও বাড়িয়ে তোলে। এর মধ্যে ‘বড় বাপের পোলায় খায়, ঠোঙায় ভইরা লইয়া যায়’, ‘ধনী-গরিব সবাই খায়, মজা পাইয়া লইয়া যায়’ এবং ‘কিপটামি বাদ দেন, ইফতারি ঠোঙায় নেন’ বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। বিশেষ করে ‘বড় বাপের পোলায় খায়’ আইটেমটি পুরান ঢাকার ঐতিহ্যের প্রতীক। ডিম, গরুর মগজ, আলু, ঘি, কাঁচা ও শুকনো মরিচ, গরুর কলিজা, মুরগির মাংসের কুচি, গিলা-কলিজা, সুতি কাবাব, মাংসের কিমাসহ নানা উপাদানে তৈরি এই বিশেষ মিশ্রণটি বাজারে প্রথম নিয়ে আসেন হারুন মিয়া, এমনটাই দাবি করেন তার সন্তান বিলাল শাহ। তারা বংশানুক্রমে এই ইফতার বাজারে ব্যবসা করে আসছেন।
চকবাজারের অধিকাংশ বিক্রেতাই মৌসুমি। সারা বছর অন্য পেশায় থাকলেও রমজান এলেই তারা ফিরে আসেন এই ঐতিহ্যবাহী বাজারে। অনেকেই বাসা থেকে খাবার তৈরি করে এনে নির্দিষ্ট টেবিলে সাজান, এবং ক্রেতারাও এই ঘরোয়া স্বাদের প্রতি আকৃষ্ট হন।
বিশাল আকৃতির শাহি জিলাপিও ক্রেতাদের নজর কাড়ে। একেকটি শাহি জিলাপির ওজন আধা কেজি থেকে পাঁচ কেজি পর্যন্ত হতে পারে। বিক্রেতা সাইফুল ইসলাম জানান, তার দাদা মোহাম্মদ রুবেল এবং বাবা মোহাম্মদ আলীও এই ব্যবসা করেছেন। প্রতি কেজি জিলাপির দাম ৪০০ টাকা। এছাড়া, আবদুল জাব্বারের দইবড়া ১৫০ থেকে ২৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
যাত্রাবাড়ী থেকে ইফতারি কিনতে আসা হোসনে আরা বেগম জানান, তিনি প্রতি বছর প্রথম রমজানে এখানে আসেন এবং পরিবারের সবাই চকবাজারের ইফতারি দিয়েই রোজা শুরু করতে পছন্দ করেন। তবে, তিনি সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়ে বলেন যে, রমজান মাসে খাবার পরীক্ষা করার সুযোগ থাকে না বলে অনেক সময় ফ্রিজের খাবার দিয়ে দেওয়া হয়।
পুরান ঢাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ নাদিম বলেন, সময় বদলেছে, আয়োজন বেড়েছে, কিন্তু ঐতিহ্য রক্ষার্থেই তারা এখনো এই উৎসবে অংশ নেন। প্রতি রমজানেই তারা নিয়মিত এখান থেকে ইফতারি কেনেন, এটি তাদের ঐতিহ্য।
স্বাদ, তৃপ্তি ও ঐতিহ্যের মেলবন্ধনে মোগল আমল থেকে শুরু হওয়া এই আয়োজন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে বয়ে চলেছে। ১৪৪৭ হিজরির প্রথম রমজান গতকাল পেরিয়ে গেছে, এবং রমজান মাস জুড়ে প্রতিদিন চকবাজারের অলিগলিতে কাবাবের ধোঁয়া, জিলাপির মিষ্টি সুবাস এবং নানা রকম ইফতারির ঘ্রাণ মানুষের কোলাহলকে আরও বাড়িয়ে তুলবে। ইতিহাস, স্বাদ ও স্মৃতির এই মেলবন্ধনে চকবাজার প্রতি রমজানেই নতুন করে প্রমাণ করে যে, ঐতিহ্য কেবল অতীত নয়, এটি এক জীবন্ত বর্তমান।
রিপোর্টারের নাম 





















