ঢাকা ০১:৫৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

আদানির ‘অসম’ বিদ্যুৎ চুক্তি পর্যালোচনায় সরকার: সচিবালয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৮:৫২:২০ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২০ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৩ বার পড়া হয়েছে

ভারতের আদানি গ্রুপের সঙ্গে স্বাক্ষরিত বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তিটি পর্যালোচনার উদ্যোগ নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। চুক্তির বিভিন্ন অসংগতি ও শর্তাবলি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখতে গতকাল বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ের এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। দেড় ঘণ্টাব্যাপী এই বৈঠকে সরকারের চারজন মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এবং আন্তর্জাতিক চুক্তি বিশেষজ্ঞ ও কারিগরি প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে আদানির চুক্তিসহ বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সম্পাদিত বিভিন্ন ‘অসম’ চুক্তির বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০১০ সালের বিশেষ আইনের আওতায় সম্পাদিত বিদ্যুৎ চুক্তিগুলো পর্যালোচনার জন্য গঠিত জাতীয় রিভিউ কমিটি আদানি পাওয়ার লিমিটেডের (এপিএল) সঙ্গে করা এই চুক্তিকে ‘বিশ্বের নিকৃষ্টতম’ ও বাংলাদেশের জন্য ‘আত্মঘাতী’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। কমিটি এই চুক্তির শর্তগুলো পুনর্বিবেচনা অথবা প্রয়োজনে তা বাতিলের সুপারিশ করেছে। গতকালের বৈঠকে জাতীয় কমিটির এই সুপারিশগুলো নিয়ে গভীর আলোচনা হয়।

বৈঠক শেষে বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানান, বিগত সরকারের আমলে করা বিভিন্ন বিদ্যুৎ চুক্তির স্বচ্ছতা নিয়ে জনমনে যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে। তিনি বলেন, “আমরা দায়িত্ব গ্রহণের পর বিশেষজ্ঞদের নিয়ে বসেছি। জনগণের প্রত্যাশা ও জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে আন্তর্জাতিক বিধিবিধান অনুযায়ী এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।”

উল্লেখ্য, দাপ্তরিক কার্যক্রম শুরুর প্রথম দিনেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আসন্ন রমজান, সেচ ও গ্রীষ্ম মৌসুমকে সামনে রেখে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে দেশের সামগ্রিক বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে দ্রুত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে অনুশাসন দিয়েছেন।

বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রীর পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত এবং জাতীয় কমিটির সদস্য ও ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের অধ্যাপক অর্থনীতিবিদ মোশতাক হোসেন খান। পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, সরকার বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে এবং এ নিয়ে আরও বিস্তারিত আলোচনা হবে। প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত স্পষ্ট করে বলেন, সরকার যেকোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে দেশ ও জনগণের স্বার্থকে সবার আগে স্থান দেবে।

বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০১৭ সালে আদানির সঙ্গে স্বাক্ষরিত এই ২৫ বছর মেয়াদি চুক্তির আওতায় ১ হাজার ৪৯৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহের কথা থাকলেও এর আর্থিক শর্তাবলি বাংলাদেশের জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিপিডিবির তথ্যমতে, ভারতের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের তুলনায় আদানির বিদ্যুতের দাম প্রায় ৮৫ শতাংশ বেশি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আদানির বিদ্যুতের গড় দাম ছিল প্রতি ইউনিট ১৪ টাকা ৮৭ পয়সা, যেখানে অন্যান্য উৎস থেকে প্রাপ্ত বিদ্যুতের দাম ৮ থেকে ১০ টাকার মধ্যে।

চুক্তির মারপ্যাঁচে বাংলাদেশ কোনো বিদ্যুৎ না কিনলেও প্রতি মাসে ক্যাপাসিটি চার্জ হিসেবে আদানিকে প্রায় ৪৫০ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হচ্ছে। গত দুই অর্থবছরেই আদানিকে বিল বাবদ দেওয়া হয়েছে ২৪ হাজার কোটি টাকার বেশি। সব মিলিয়ে এ পর্যন্ত আদানিকে অন্তত ৩০ হাজার কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। জাতীয় কমিটির প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, এই চুক্তির কারণে বাংলাদেশ প্রতি বছর প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা (৫০০ মিলিয়ন ডলার) অতিরিক্ত ব্যয় করছে। ২৫ বছরের চুক্তির মেয়াদে এই ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াতে পারে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও আদানির কাছ থেকে চড়া দামে বিদ্যুৎ আমদানি এবং অসম দায়বদ্ধতার শর্তগুলো কোনোভাবেই জনস্বার্থ রক্ষা করে না। সরকার এখন জাতীয় কমিটির সুপারিশ ও আইনি দিকগুলো বিশ্লেষণ করে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

মধ্যপ্রাচ্যে চরম উত্তেজনা: আকাশসীমা বন্ধ ঘোষণা করল ইসরায়েল, ইরান ও ইরাক

আদানির ‘অসম’ বিদ্যুৎ চুক্তি পর্যালোচনায় সরকার: সচিবালয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক

আপডেট সময় : ০৮:৫২:২০ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২০ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

ভারতের আদানি গ্রুপের সঙ্গে স্বাক্ষরিত বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তিটি পর্যালোচনার উদ্যোগ নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। চুক্তির বিভিন্ন অসংগতি ও শর্তাবলি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখতে গতকাল বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ের এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। দেড় ঘণ্টাব্যাপী এই বৈঠকে সরকারের চারজন মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এবং আন্তর্জাতিক চুক্তি বিশেষজ্ঞ ও কারিগরি প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে আদানির চুক্তিসহ বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সম্পাদিত বিভিন্ন ‘অসম’ চুক্তির বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০১০ সালের বিশেষ আইনের আওতায় সম্পাদিত বিদ্যুৎ চুক্তিগুলো পর্যালোচনার জন্য গঠিত জাতীয় রিভিউ কমিটি আদানি পাওয়ার লিমিটেডের (এপিএল) সঙ্গে করা এই চুক্তিকে ‘বিশ্বের নিকৃষ্টতম’ ও বাংলাদেশের জন্য ‘আত্মঘাতী’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। কমিটি এই চুক্তির শর্তগুলো পুনর্বিবেচনা অথবা প্রয়োজনে তা বাতিলের সুপারিশ করেছে। গতকালের বৈঠকে জাতীয় কমিটির এই সুপারিশগুলো নিয়ে গভীর আলোচনা হয়।

বৈঠক শেষে বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানান, বিগত সরকারের আমলে করা বিভিন্ন বিদ্যুৎ চুক্তির স্বচ্ছতা নিয়ে জনমনে যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে। তিনি বলেন, “আমরা দায়িত্ব গ্রহণের পর বিশেষজ্ঞদের নিয়ে বসেছি। জনগণের প্রত্যাশা ও জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে আন্তর্জাতিক বিধিবিধান অনুযায়ী এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।”

উল্লেখ্য, দাপ্তরিক কার্যক্রম শুরুর প্রথম দিনেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আসন্ন রমজান, সেচ ও গ্রীষ্ম মৌসুমকে সামনে রেখে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে দেশের সামগ্রিক বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে দ্রুত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে অনুশাসন দিয়েছেন।

বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রীর পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত এবং জাতীয় কমিটির সদস্য ও ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের অধ্যাপক অর্থনীতিবিদ মোশতাক হোসেন খান। পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, সরকার বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে এবং এ নিয়ে আরও বিস্তারিত আলোচনা হবে। প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত স্পষ্ট করে বলেন, সরকার যেকোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে দেশ ও জনগণের স্বার্থকে সবার আগে স্থান দেবে।

বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০১৭ সালে আদানির সঙ্গে স্বাক্ষরিত এই ২৫ বছর মেয়াদি চুক্তির আওতায় ১ হাজার ৪৯৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহের কথা থাকলেও এর আর্থিক শর্তাবলি বাংলাদেশের জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিপিডিবির তথ্যমতে, ভারতের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের তুলনায় আদানির বিদ্যুতের দাম প্রায় ৮৫ শতাংশ বেশি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আদানির বিদ্যুতের গড় দাম ছিল প্রতি ইউনিট ১৪ টাকা ৮৭ পয়সা, যেখানে অন্যান্য উৎস থেকে প্রাপ্ত বিদ্যুতের দাম ৮ থেকে ১০ টাকার মধ্যে।

চুক্তির মারপ্যাঁচে বাংলাদেশ কোনো বিদ্যুৎ না কিনলেও প্রতি মাসে ক্যাপাসিটি চার্জ হিসেবে আদানিকে প্রায় ৪৫০ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হচ্ছে। গত দুই অর্থবছরেই আদানিকে বিল বাবদ দেওয়া হয়েছে ২৪ হাজার কোটি টাকার বেশি। সব মিলিয়ে এ পর্যন্ত আদানিকে অন্তত ৩০ হাজার কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। জাতীয় কমিটির প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, এই চুক্তির কারণে বাংলাদেশ প্রতি বছর প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা (৫০০ মিলিয়ন ডলার) অতিরিক্ত ব্যয় করছে। ২৫ বছরের চুক্তির মেয়াদে এই ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াতে পারে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও আদানির কাছ থেকে চড়া দামে বিদ্যুৎ আমদানি এবং অসম দায়বদ্ধতার শর্তগুলো কোনোভাবেই জনস্বার্থ রক্ষা করে না। সরকার এখন জাতীয় কমিটির সুপারিশ ও আইনি দিকগুলো বিশ্লেষণ করে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছে।