গত এক দশক ধরে দেশের অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যাপক অগ্রগতি সাধিত হয়েছে, যার সিংহভাগই বৈদেশিক ঋণে পরিচালিত মেগা প্রকল্পগুলোর অবদান। পদ্মা রেল সংযোগ, কক্সবাজার রেল, কর্ণফুলী টানেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, মেট্রোরেল এবং আরও প্রায় ৮-১০টি বৃহৎ প্রকল্পে কোটি কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। তবে এই উন্নয়নের চাকচিক্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে ক্রমবর্ধমান ঋণের চাপ। গ্রেস পিরিয়ড (ঋণ পরিশোধের স্থগিতকাল) শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হবে কিস্তি পরিশোধ, সুদ সমন্বয় এবং বৈদেশিক মুদ্রায় বিপুল অঙ্কের আর্থিক দায়। নবনিযুক্ত অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, প্রকল্পগুলো চালু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই বিশাল ঋণ পরিশোধের ব্যবস্থা করা।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যেই অনেক প্রকল্পের ঋণের কিস্তির পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ হতে পারে। যদি আয়-ব্যয়ের এই অসমতা চলতে থাকে, তবে বাজেট সংকোচন, ছোট প্রকল্প স্থগিত করা এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার কমানোর মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে। এর পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের ওপরও চাপ পড়বে। যদি কোনো প্রকল্পের কিস্তি সময়মতো পরিশোধ করা সম্ভব না হয়, তবে নতুন ঋণ নিয়ে পুরোনো ঋণ শোধ করার এক ভয়ংকর ‘ডেট-ট্র্যাপ’ (ঋণের ফাঁদ) তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
দেশের মেগা প্রকল্পগুলোর ব্যয়-স্ফীতি অস্বাভাবিক পর্যায়ে পৌঁছেছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) এবং পরিকল্পনা কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, বড় প্রকল্পগুলোর প্রাথমিক ব্যয় বরাদ্দের তুলনায় ৩০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। উদাহরণস্বরূপ, পদ্মা রেল সংযোগ প্রকল্পের প্রাথমিক অনুমোদিত ব্যয় ২০১৬ সালে প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকা থাকলেও, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন, দীর্ঘসূত্রতা, জমি অধিগ্রহণে জটিলতা এবং নির্মাণ সামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধির কারণে এটি বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৯ হাজার কোটি টাকায়। এর ফলে প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে, যার একটি বড় অংশই এসেছে বৈদেশিক ঋণ থেকে।
পদ্মা রেল প্রকল্পের জন্য চীনা এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে ২০১৮ সালে স্বাক্ষরিত ঋণচুক্তির গ্রেস পিরিয়ড ২০২৪ সালে শেষ হয়েছে। এর ফলে একই বছর থেকে শুরু হয়েছে ২০ বছরের কিস্তি পরিশোধের মেয়াদ, যা ২০৪৪ সাল পর্যন্ত চলবে। এই ঋণে ২ শতাংশ সুদ এবং ০.২৫ শতাংশ সার্ভিস চার্জ ধরা হয়েছে। বর্তমানে প্রকল্পের আয়-ব্যয়ের ঘাটতির কারণে এই ঋণ পরিশোধের পুরো চাপ পড়ছে জাতীয় বাজেটের ওপর।
একই চিত্র দেখা যায় মেট্রোরেল লাইন-৬-এর ক্ষেত্রেও। ২০১২ সালে অনুমোদনের সময় এর ব্যয় ছিল প্রায় ২১ হাজার কোটি টাকা। নকশার পরিবর্তন, রুট সম্প্রসারণ, নিরাপত্তা ব্যবস্থা বৃদ্ধি এবং রেল প্রকৌশল ব্যয় বাড়ার কারণে প্রকল্পটির মোট খরচ দাঁড়িয়েছে ৩৩ হাজার কোটি টাকারও বেশি। মেট্রোরেলের যাত্রী ভাড়া থেকে অর্জিত আয়ের একটি বড় অংশই পরিচালন ব্যয়ে চলে যায়। ফলে ঋণ পরিশোধ করার মতো পর্যাপ্ত অর্থ সঞ্চয় থাকে না। সরকার বাজেট থেকে অতিরিক্ত ভর্তুকি দিয়ে এই ঘাটতি পূরণ করছে।
এই প্রকল্পটি জাপানের উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা জাইকার (JICA) ঋণে বাস্তবায়িত হয়েছে। ঋণচুক্তির মেয়াদ ২০২৩ সালে শেষ ধাপে সম্পন্ন হয়েছে। মেট্রোরেলের জন্য জাইকা যে অফিসিয়াল ডেভেলপমেন্ট অ্যাসিস্ট্যান্স (ODA) লোন প্রদান করেছে, তার মোট পরিশোধকাল ৩০ বছর, যা ২০৬১-৬২ অর্থবছর পর্যন্ত বিস্তৃত। এই লোন ধাপে ধাপে কিস্তি পরিশোধের ভিত্তিতে দেওয়া হয়েছে। প্রথমদিকে কিস্তির পরিমাণ অপেক্ষাকৃত কম রাখা হয়েছিল, যাতে প্রকল্প চালু হওয়ার পর প্রাথমিক ব্যয়, পরিচালনা খরচ এবং রাজস্ব আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সরকার সহজে ঋণ পরিশোধ শুরু করতে পারে। পরে ধীরে ধীরে কিস্তির পরিমাণ বাড়বে এবং পূর্ণ মেয়াদ শেষে মোট ঋণ শোধ হবে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণ ব্যয় প্রাথমিক অনুমানের চেয়ে বহুগুণ বেড়ে প্রায় এক লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি দাঁড়িয়েছে। রি-অ্যাক্টর প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং নতুন নিরাপত্তা মান যুক্ত হওয়ার কারণে এই ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। সময়মতো এই প্রকল্প থেকে আয় না এলে, এর ঋণ পরিশোধ সরাসরি দেশের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যয়-স্ফীতি নিয়ন্ত্রণে না আনলে ভবিষ্যতের যেকোনো মেগা প্রকল্পই দেশের অর্থনীতির ওপর একটি ‘অকার্যকর বোঝা’ হয়ে দাঁড়াবে।
এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য রাশিয়া এক্সিম ব্যাংকের ঋণের গ্রেস পিরিয়ড ২০২৮ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। এরপর ২০৪৮-৪৯ সাল পর্যন্ত ২০ বছরের কিস্তি পরিশোধ চলবে। পারমাণবিক বিদ্যুতের ইউনিট মূল্য বাজারমূল্যের চেয়ে কম হওয়ায়, এই প্রকল্প থেকে অর্জিত আয় দিয়ে ঋণ পরিশোধ এখনো সম্ভব নয়। পুরো চাপ পড়বে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর।
দোহাজারী-কক্সবাজার রেল প্রকল্পের জন্য এডিবি-র ঋণের কিস্তি পরিশোধ ২০২২ সাল থেকে শুরু হয়েছে এবং এটি ২০ বছর ধরে ২০৪৮ সাল পর্যন্ত চলবে। প্রথম বছরের বার্ষিক কিস্তির পরিমাণ ছিল প্রায় ৪.২ বিলিয়ন টাকা, যা ২০২৮ সাল পর্যন্ত বেড়ে ৬.৬ বিলিয়ন টাকায় দাঁড়াবে। এই ঋণের সুদ প্রায় ২ শতাংশ, এবং প্রকল্পের নিজস্ব আয় দিয়ে এই সার্ভিসিং করা কঠিন। তাই সরকারকে বাজেটের ভর্তুকি দিতে হচ্ছে।
কর্ণফুলী টানেল প্রকল্পের জন্য গ্রেস পিরিয়ড শেষ হওয়ার পর ২০২২-২৩ অর্থবছরেই কিস্তি পরিশোধ শুরু হয়েছে। বার্ষিক মূল ঋণের কিস্তি প্রায় ৪.০৫ বিলিয়ন টাকা। সুদসহ সার্ভিসিং বর্তমানে চলছে। প্রকল্পটি লোকসানে চলায় সরকারকে বার্ষিক সুদ ও কিস্তি পরিশোধে বাজেট ভর্তুকি দিতে হচ্ছে।
সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, কিছু প্রকল্পের ঋণের কিস্তি ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে দোহাজারী-কক্সবাজার রেল, মেট্রোরেল এবং কর্ণফুলী টানেল। পদ্মা রেলের কিস্তি পরিশোধ ২০২৪ থেকে শুরু হলেও, রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রের কিস্তি পরিশোধ ২০২৮ থেকে শুরু হবে। ঋণের কিস্তি পরিশোধ আলাদা সময় থেকে শুরু হওয়ায় এবং এর মেয়াদকাল ভিন্ন হওয়ায়, অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদে একটি চাপের মুখে পড়বে।
মেগা প্রকল্পগুলো থেকে আয় আসবে বলে সরকার বরাবরই বলে এসেছে, কিন্তু মাঠের বাস্তবতা ভিন্ন। শুরুর দিকে কোনো প্রকল্পই পূর্ণাঙ্গ আয় করতে পারে না, বিশেষ করে বাংলাদেশে যেখানে ভাড়া নির্ধারণ সামাজিক মানদণ্ড দ্বারা প্রভাবিত হয়। পদ্মা রেল উদ্বোধনের পরও প্রত্যাশিত সংখ্যক যাত্রী পাওয়া যাচ্ছে না। মেট্রোরেল প্রতিদিন দুই থেকে আড়াই লাখ যাত্রী বহন করলেও, এর পরিচালন ব্যয় অনেক বেশি। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, একটি মেট্রোরেল লাভজনক হতে অন্তত পাঁচ থেকে ছয় লাখ যাত্রী প্রয়োজন।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিদ্যুতের ইউনিট মূল্য বাজারমূল্যের নিচে থাকার কারণে, অর্জিত আয় দিয়ে ঋণ পরিশোধ করা প্রায় অসম্ভব। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের পুরোনো লোকসানের সঙ্গে নতুন এই খরচ যুক্ত হওয়ায় ভর্তুকি আরও বাড়ছে।
ভোক্তাদের ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে। মেট্রোরেল ও রেলের ভাড়া বৃদ্ধি, বিদ্যুতের দাম সমন্বয় এবং দীর্ঘমেয়াদে নতুন কর বা ভ্যাট আরোপের প্রয়োজন হতে পারে। কারণ, রাজস্ব সংগ্রহ না বাড়লে মেগা প্রকল্পগুলোর ঋণ পরিশোধ সম্ভব নয়। বাংলাদেশের ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন, যা ঋণ পরিশোধকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
মেগা প্রকল্পগুলো উন্নয়নের প্রতীক হলেও, আগামী পাঁচ থেকে আট বছরে এগুলো দেশের জন্য একটি বড় আর্থিক বোঝা হয়ে দাঁড়াবে। প্রকল্পগুলো থেকে আয় আসতে আরও সময় লাগবে, কিন্তু ঋণ পরিশোধ ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। নতুন অর্থমন্ত্রীকে এখনই একটি স্পষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। ঋণ পুনর্বিন্যাস, ভর্তুকি কমানো, প্রকল্প পরিচালন দক্ষতা বৃদ্ধি এবং রাজস্ব সংগ্রহ বাড়ানো ছাড়া এই চাপ সামাল দেওয়া সম্ভব হবে না। অন্যথায়, আগামী কয়েক বছর দেশের অর্থনীতি একটি ‘টিকটিক করা টাইম বোমা’ নিয়ে চলবে।
অর্থনীতিবিদ এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. মইনুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের সব বড় মেগা প্রকল্পের ঋণের চাপ আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে পুরোপুরি কার্যকর হয়ে পড়বে। নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত অর্থমন্ত্রী কীভাবে এই বিশাল ঋণের বোঝা সামাল দেবেন, তা দেখার অপেক্ষায় সবাই। তার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্রকল্পের ঋণ পরিশোধ নিশ্চিত করা, ভর্তুকি কমানো এবং প্রকল্প পরিচালনায় দক্ষতা বৃদ্ধি করা। তা না হলে দেশের অর্থনীতি একটি টাইমবোমার মতো ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে।
রিপোর্টারের নাম 





















