ঢাকা ০৩:৩৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

রোজা ভাঙায় খেজুর: স্বাস্থ্য উপকারিতার এক অনবদ্য মেলবন্ধন

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:৪৫:৩১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৬ বার পড়া হয়েছে

রমজান মাস জুড়ে ইফতারের অবিচ্ছেদ্য অংশ খেজুর। বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মুসলমান সূর্যাস্তের পর এই মিষ্টি ফলটি দিয়েই রোজা ভাঙেন। ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের অন্যতম রোজা পালনের এই সময়ে, সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার থেকে বিরত থাকেন ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা। ইসলামি ঐতিহ্য অনুযায়ী, ইসলামের নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) রোজা ভাঙার জন্য খেজুর ব্যবহারের নির্দেশনা দিয়েছিলেন। পবিত্র কোরআনেও বিভিন্ন স্থানে খেজুরের উল্লেখ পাওয়া যায়। কিন্তু রোজাদারদের জন্য এই ফলটি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ? এর পেছনের চিকিৎসাগত কারণগুলো কী?

অনন্য পুষ্টিগুণ ও তাৎক্ষণিক শক্তি:

দীর্ঘক্ষণ উপবাসের পর শরীরের জন্য খেজুর একটি অত্যন্ত উপকারী খাদ্য। যুক্তরাজ্যের পুষ্টিবিদ শাহনাজ বশিরের মতে, রোজা ভাঙার পর শরীর দ্রুত গ্লুকোজের সন্ধান করে, যা শক্তির প্রধান উৎস। খেজুরে থাকা প্রাকৃতিক চিনি রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত বৃদ্ধি করে, যা তাৎক্ষণিক শক্তি যোগায়। শাহনাজ বশির আরও বলেন, “খেজুরে শর্করা এবং জটিল কার্বোহাইড্রেট উভয়ই বিদ্যমান। ফলে এটি শরীরকে বিপুল পরিমাণ শক্তি সরবরাহ করে, যা দীর্ঘক্ষণ খাদ্য গ্রহণ থেকে বিরত থাকা ব্যক্তির জন্য আদর্শ।” এছাড়াও, ভিটামিন এ, কে, বি৬ এবং আয়রনের মতো প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানে ভরপুর খেজুর অল্প সময়েই শরীরকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি সরবরাহ করতে সক্ষম।

জলশূন্যতা মোকাবিলা ও ইলেক্ট্রোলাইট ভারসাম্য:

শুকনো ফল হওয়া সত্ত্বেও, খেজুর শরীরকে হাইড্রেটেড রাখতে সহায়তা করে। এতে থাকা প্রাকৃতিক ইলেক্ট্রোলাইট পটাশিয়াম পানির প্রতি আকর্ষণ তৈরি করে এবং শরীরের কোষগুলোতে পানির সরবরাহ বজায় রাখে। শাহনাজ বশিরের মতে, “অনেকে খেজুর দিয়ে রোজা ভেঙে এরপর পানি পান করেন। এটি যেমন শক্তির জোগান দেয়, তেমনই শরীরে পানির ভারসাম্যও বজায় রাখে। খেজুর খাওয়ার পর সাধারণত অতিরিক্ত ইলেক্ট্রোলাইট গ্রহণের প্রয়োজন হয় না।”

অতিরিক্ত ভোজনের প্রবণতা হ্রাস ও হজমে সহায়তা:

রমজানে অনেকের ওজন কমলেও, ইফতারে অতিরিক্ত খাবার গ্রহণ করলে ওজন বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ঐতিহ্যগতভাবে, অনেক মুসলমান বিজোড় সংখ্যক (তিন, পাঁচ, সাত বা নয়টি) খেজুর খেয়ে মাগরিবের নামাজ আদায় করেন এবং এরপর মূল খাবার গ্রহণ করেন। খেজুরে থাকা ফাইবার হজম প্রক্রিয়া শুরু হলে অতিরিক্ত খাওয়ার ইচ্ছা কমে আসে, যা খাদ্য গ্রহণে একটি ভারসাম্য আনতে সাহায্য করে। শাহনাজ বশির বলেন, “খেজুর শরীরকে সংকেত দেয় যে কিছু খাবার গ্রহণ করা হয়েছে এবং হজম প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এটি অতিরিক্ত ভোজনের প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক।”

রোজাদারদের মধ্যে কোষ্ঠকাঠিন্য ও পেট ফাঁপার মতো সমস্যা দেখা দেওয়া অস্বাভাবিক নয়। কারণ দীর্ঘক্ষণ উপবাসের পর হজম প্রক্রিয়া কিছুটা ধীর হয়ে যায়। খেজুর ফাইবারের এক চমৎকার উৎস, যা অন্ত্রের বর্জ্য পদার্থকে সহজে শরীর থেকে বের করে দিতে সাহায্য করে। যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস (NHS) একজন পূর্ণবয়স্ক ব্যক্তির জন্য প্রতিদিন ৩০ গ্রাম ফাইবার গ্রহণের পরামর্শ দেয়। শাহনাজ বশিরের মতে, “রমজানে আমরা দ্রুত হজম হওয়া সরল শর্করা পছন্দ করি, যা তাৎক্ষণিক শক্তি দেয়। কিন্তু পরিকল্পিতভাবে খাবার তৈরি করলে খাদ্যে ফাইবারের উপস্থিতি নিশ্চিত করা সম্ভব। শুকনো ফল, যেমন খেজুর, খাদ্যতালিকায় যোগ করলে সহজেই ফাইবার গ্রহণ বাড়ানো যায়।”

বিকল্প স্বাস্থ্যকর পানীয়:

যারা নির্দিষ্ট ধরনের খেজুর পছন্দ করেন না, তাদের জন্য রয়েছে বিকল্প ব্যবস্থা। বিশ্বজুড়ে রোজা রাখা কেবল ধর্মীয় নয়, স্বাস্থ্যগত দিক থেকেও জনপ্রিয়তা লাভ করছে। শাহনাজ বশিরের মতে, “শত শত ধরনের খেজুর রয়েছে, তাই অন্য ধরনের খেজুর চেষ্টা করা যেতে পারে। এদের গঠন, স্বাদ ও উপাদানে ভিন্নতা রয়েছে।” তিনি আরও পরামর্শ দেন, যদি কেউ সরাসরি খেজুর খেতে না চান, তবে স্মুদি বা শরবতে খেজুর যোগ করতে পারেন। “খেজুর, দুধ, সামান্য দই এবং অন্যান্য শুকনো ফল একসাথে মিশিয়ে একটি স্বাস্থ্যকর ও উপকারী পানীয় তৈরি করা যেতে পারে।”

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

নামে আন্তঃনগর, মানে লোকাল: উত্তরের রেলপথে অন্তহীন ভোগান্তি

রোজা ভাঙায় খেজুর: স্বাস্থ্য উপকারিতার এক অনবদ্য মেলবন্ধন

আপডেট সময় : ০৯:৪৫:৩১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

রমজান মাস জুড়ে ইফতারের অবিচ্ছেদ্য অংশ খেজুর। বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মুসলমান সূর্যাস্তের পর এই মিষ্টি ফলটি দিয়েই রোজা ভাঙেন। ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের অন্যতম রোজা পালনের এই সময়ে, সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার থেকে বিরত থাকেন ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা। ইসলামি ঐতিহ্য অনুযায়ী, ইসলামের নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) রোজা ভাঙার জন্য খেজুর ব্যবহারের নির্দেশনা দিয়েছিলেন। পবিত্র কোরআনেও বিভিন্ন স্থানে খেজুরের উল্লেখ পাওয়া যায়। কিন্তু রোজাদারদের জন্য এই ফলটি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ? এর পেছনের চিকিৎসাগত কারণগুলো কী?

অনন্য পুষ্টিগুণ ও তাৎক্ষণিক শক্তি:

দীর্ঘক্ষণ উপবাসের পর শরীরের জন্য খেজুর একটি অত্যন্ত উপকারী খাদ্য। যুক্তরাজ্যের পুষ্টিবিদ শাহনাজ বশিরের মতে, রোজা ভাঙার পর শরীর দ্রুত গ্লুকোজের সন্ধান করে, যা শক্তির প্রধান উৎস। খেজুরে থাকা প্রাকৃতিক চিনি রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত বৃদ্ধি করে, যা তাৎক্ষণিক শক্তি যোগায়। শাহনাজ বশির আরও বলেন, “খেজুরে শর্করা এবং জটিল কার্বোহাইড্রেট উভয়ই বিদ্যমান। ফলে এটি শরীরকে বিপুল পরিমাণ শক্তি সরবরাহ করে, যা দীর্ঘক্ষণ খাদ্য গ্রহণ থেকে বিরত থাকা ব্যক্তির জন্য আদর্শ।” এছাড়াও, ভিটামিন এ, কে, বি৬ এবং আয়রনের মতো প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানে ভরপুর খেজুর অল্প সময়েই শরীরকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি সরবরাহ করতে সক্ষম।

জলশূন্যতা মোকাবিলা ও ইলেক্ট্রোলাইট ভারসাম্য:

শুকনো ফল হওয়া সত্ত্বেও, খেজুর শরীরকে হাইড্রেটেড রাখতে সহায়তা করে। এতে থাকা প্রাকৃতিক ইলেক্ট্রোলাইট পটাশিয়াম পানির প্রতি আকর্ষণ তৈরি করে এবং শরীরের কোষগুলোতে পানির সরবরাহ বজায় রাখে। শাহনাজ বশিরের মতে, “অনেকে খেজুর দিয়ে রোজা ভেঙে এরপর পানি পান করেন। এটি যেমন শক্তির জোগান দেয়, তেমনই শরীরে পানির ভারসাম্যও বজায় রাখে। খেজুর খাওয়ার পর সাধারণত অতিরিক্ত ইলেক্ট্রোলাইট গ্রহণের প্রয়োজন হয় না।”

অতিরিক্ত ভোজনের প্রবণতা হ্রাস ও হজমে সহায়তা:

রমজানে অনেকের ওজন কমলেও, ইফতারে অতিরিক্ত খাবার গ্রহণ করলে ওজন বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ঐতিহ্যগতভাবে, অনেক মুসলমান বিজোড় সংখ্যক (তিন, পাঁচ, সাত বা নয়টি) খেজুর খেয়ে মাগরিবের নামাজ আদায় করেন এবং এরপর মূল খাবার গ্রহণ করেন। খেজুরে থাকা ফাইবার হজম প্রক্রিয়া শুরু হলে অতিরিক্ত খাওয়ার ইচ্ছা কমে আসে, যা খাদ্য গ্রহণে একটি ভারসাম্য আনতে সাহায্য করে। শাহনাজ বশির বলেন, “খেজুর শরীরকে সংকেত দেয় যে কিছু খাবার গ্রহণ করা হয়েছে এবং হজম প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এটি অতিরিক্ত ভোজনের প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক।”

রোজাদারদের মধ্যে কোষ্ঠকাঠিন্য ও পেট ফাঁপার মতো সমস্যা দেখা দেওয়া অস্বাভাবিক নয়। কারণ দীর্ঘক্ষণ উপবাসের পর হজম প্রক্রিয়া কিছুটা ধীর হয়ে যায়। খেজুর ফাইবারের এক চমৎকার উৎস, যা অন্ত্রের বর্জ্য পদার্থকে সহজে শরীর থেকে বের করে দিতে সাহায্য করে। যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস (NHS) একজন পূর্ণবয়স্ক ব্যক্তির জন্য প্রতিদিন ৩০ গ্রাম ফাইবার গ্রহণের পরামর্শ দেয়। শাহনাজ বশিরের মতে, “রমজানে আমরা দ্রুত হজম হওয়া সরল শর্করা পছন্দ করি, যা তাৎক্ষণিক শক্তি দেয়। কিন্তু পরিকল্পিতভাবে খাবার তৈরি করলে খাদ্যে ফাইবারের উপস্থিতি নিশ্চিত করা সম্ভব। শুকনো ফল, যেমন খেজুর, খাদ্যতালিকায় যোগ করলে সহজেই ফাইবার গ্রহণ বাড়ানো যায়।”

বিকল্প স্বাস্থ্যকর পানীয়:

যারা নির্দিষ্ট ধরনের খেজুর পছন্দ করেন না, তাদের জন্য রয়েছে বিকল্প ব্যবস্থা। বিশ্বজুড়ে রোজা রাখা কেবল ধর্মীয় নয়, স্বাস্থ্যগত দিক থেকেও জনপ্রিয়তা লাভ করছে। শাহনাজ বশিরের মতে, “শত শত ধরনের খেজুর রয়েছে, তাই অন্য ধরনের খেজুর চেষ্টা করা যেতে পারে। এদের গঠন, স্বাদ ও উপাদানে ভিন্নতা রয়েছে।” তিনি আরও পরামর্শ দেন, যদি কেউ সরাসরি খেজুর খেতে না চান, তবে স্মুদি বা শরবতে খেজুর যোগ করতে পারেন। “খেজুর, দুধ, সামান্য দই এবং অন্যান্য শুকনো ফল একসাথে মিশিয়ে একটি স্বাস্থ্যকর ও উপকারী পানীয় তৈরি করা যেতে পারে।”