বাংলাদেশের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নতুন সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণ এবং সরকার গঠনের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে পরবর্তী রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বর্তমান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদে থাকা না থাকা এবং নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে জনমনে নানা কৌতূহল তৈরি হয়েছে।
বর্তমান রাষ্ট্রপতির অবস্থান ও আইনি জটিলতা
বর্তমান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ২০২৩ সালে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং সাংবিধানিক নিয়ম অনুযায়ী ২০২৮ সালের এপ্রিল পর্যন্ত তার মেয়াদ রয়েছে। তবে বিগত গণ-অভ্যুত্থানের পর তার পদত্যাগের জোরালো দাবি উঠলেও শেষ পর্যন্ত তিনি স্বপদেই বহাল রয়েছেন এবং তার কাছেই নতুন সরকার শপথ গ্রহণ করেছে। আইনজ্ঞদের মতে, বর্তমান রাষ্ট্রপতি স্বপদে বহাল থাকা অবস্থায় নতুন কাউকে এই পদে বসানোর কোনো আইনি সুযোগ নেই। কেবল মৃত্যু, পদত্যাগ কিংবা অভিশংসনের মাধ্যমেই এই পদটি শূন্য হতে পারে। এর আগে রাষ্ট্রপতি একটি আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নতুন নির্বাচনের পর সরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, যা এই আলোচনার পালে নতুন হাওয়া দিয়েছে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়া ও সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা
বাংলাদেশের সংবিধানের ৫০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, একজন রাষ্ট্রপতি পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচিত হন এবং তিনি সর্বোচ্চ দুই মেয়াদে দায়িত্ব পালন করতে পারেন। সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি সরাসরি জনগণের ভোটে নয়, বরং জাতীয় সংসদের সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত হন। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ‘নির্বাচনী কর্তা’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি স্পিকারের সাথে আলোচনা করে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেন।
প্রক্রিয়া অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি পদের জন্য প্রার্থী হতে হলে অন্তত ৩৫ বছর বয়স হতে হবে এবং সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্যতা থাকতে হবে। নির্বাচনে একজন সংসদ সদস্যকে প্রস্তাবক এবং অন্য একজনকে সমর্থক হতে হয়। যদি একক প্রার্থী থাকেন, তবে ভোটের প্রয়োজন পড়ে না এবং তাকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়। তবে একাধিক প্রার্থী থাকলে সংসদ অধিবেশনে গোপন ব্যালটের মাধ্যমে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়।
ক্ষমতার ভারসাম্য ও জুলাই সনদের প্রস্তাবনা
বর্তমানে বাংলাদেশের সংবিধানে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত। প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগ ছাড়া প্রায় সব ক্ষেত্রেই তাকে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করতে হয়। তবে সাম্প্রতিক ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পর ‘জুলাই সনদ’ বা রাষ্ট্র সংস্কারের বিভিন্ন প্রস্তাবে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্যের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে উঠে এসেছে।
প্রস্তাবিত সংস্কার অনুযায়ী, মানবাধিকার কমিশন, নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার প্রধান নিয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতিকে একক ক্ষমতা দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। তবে এই প্রস্তাবনাগুলো বাস্তবায়ন করতে হলে বর্তমান সংবিধানের ব্যাপক সংশোধন প্রয়োজন, যা কেবল নতুন সংসদের মাধ্যমেই সম্ভব।
পরিবর্তনের সম্ভাবনা ও রাজনৈতিক সমীকরণ
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নতুন সংসদ কার্যকর হওয়ার পর রাষ্ট্রপতির পরিবর্তন বা পদত্যাগের বিষয়টি আনুষ্ঠানিক রূপ পেতে পারে। যদি রাষ্ট্রপতি স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন, তবে কোনো আইনি জটিলতা ছাড়াই নতুন নির্বাচনের পথ প্রশস্ত হবে। সংসদীয় গণতন্ত্রের রীতি অনুযায়ী, সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হওয়ার পর স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের পরপরই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বিষয়টি অগ্রাধিকার পেতে পারে।
আপাতত সবার দৃষ্টি এখন জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের দিকে, যেখানে নির্ধারিত হবে দেশের পরবর্তী অভিভাবক হিসেবে বঙ্গভবনে কে আসীন হচ্ছেন।
রিপোর্টারের নাম 























