ঢাকা ০৬:৪২ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

‘না’ ভোট দেয়া ২ কোটি ২৫ লাখ নাগরিকের চাওয়া আসলে কী: এক গভীর বিশ্লেষণ

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০২:০০:৩৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৩ বার পড়া হয়েছে

গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত বহুল আলোচিত গণভোটে জাতীয় সংস্কারমূলক প্রস্তাবের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছে ৪ কোটি ৮০ লাখ ৭৪ হাজার ৪২৯টি। এর বিপরীতে ‘না’ ভোট পড়েছে ২ কোটি ২৫ লাখ ৬৫ হাজার ৬২৭টি। সংখ্যার বিচারে ‘হ্যাঁ’ ভোট দ্বিগুণ ব্যবধানে জয়ী হলেও, এই সোয়া দুই কোটির বেশি ‘না’ ভোটকে কেবল একটি পরাজিত মত হিসেবে দেখলেই কি যথেষ্ট হবে? এই বিশাল জনশক্তি দেশের প্রায় ২০০ নির্বাচিত সংসদ সদস্যের সম্মিলিত ভোটব্যাংকের সমান। তাই এই বিপুল সংখ্যক নাগরিকের ‘না’ বলাকে আমাদের দেশের একটি বড় অংশের সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা অত্যন্ত জরুরি।

সাধারণত গণভোটে ‘না’ ভোট সবসময় যে আমূল পরিবর্তনের বিরোধিতা করে, তা নয়। বরং এটি অনেক ক্ষেত্রে নাগরিকের গভীর পর্যবেক্ষণ ও তিনটি প্রধান মানসিক প্রবণতার প্রতিফলন। প্রথমত, একটি বড় অংশের মধ্যে স্থিতিশীলতার প্রতি প্রবল টান থাকে। তারা মনে করেন, বিদ্যমান আইন ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোই যথেষ্ট; মূল সমস্যাটি কাঠামোগত নয়, বরং প্রয়োগের অভাব। পরিবর্তন মানেই নতুন কোনো অনিশ্চয়তা—এই মনস্তত্ত্ব থেকে অনেকেই ঝুঁকি এড়াতে ‘না’ বেছে নেন। তাদের কাছে বর্তমান অবস্থাটিই অপেক্ষাকৃত নিরাপদ মনে হয়।

দ্বিতীয়ত, এই ‘না’ ভোটের পেছনে থাকতে পারে এক ধরণের ‘সতর্ক সম্মতি’ বা সংশয়। অনেক নাগরিক হয়তো সংস্কারের প্রয়োজনীয়তাকে নীতিগতভাবে সমর্থন করেন, কিন্তু প্রস্তাবিত পদ্ধতি, সময়কাল কিংবা বাস্তবায়নের ধরন নিয়ে তাদের মধ্যে গভীর সন্দেহ থাকতে পারে। এমন প্রেক্ষাপটে তাদের ‘না’ বলার অর্থ হলো—প্রস্তাবিত ধারণাটি তারা পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করছেন না, বরং তারা বলছেন, “এভাবে নয়, আরও স্বচ্ছতা চাই” অথবা “আমাদের আরও বিকল্প প্রস্তাব প্রয়োজন।” এটি মূলত সংস্কারের প্রক্রিয়া বা গতির ওপর একটি রাশ টেনে ধরার প্রচেষ্টা।

গণভোটের মাধ্যমে মানুষ কেবল একটি নির্দিষ্ট নীতির পক্ষ-বিপক্ষেই মত দেয় না; অনেক সময় পুরো প্রক্রিয়ার প্রতি তাদের আস্থা আছে কি না, সেটিও গুরুত্ব পায়। প্রস্তাবটি কারা এনেছেন বা কীভাবে উপস্থাপিত হয়েছে—এসব বিষয়ও মানুষের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। তাই এই ‘না’ ভোট অনেক ক্ষেত্রে নেতৃত্বের প্রতি এক ধরণের নীরব অসন্তোষ বা আস্থার সংকটের বার্তা হতে পারে। দেখা গেছে, অনেক আসনে যেখানে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন, সেখানে গণভোটে ‘না’ বিপুল ভোটে এগিয়ে ছিল। এটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি বিষয়। এর অর্থ হলো, ভোটাররা তাদের রাজনৈতিক প্রতিনিধি নির্বাচনের ক্ষেত্রে একভাবে ভেবেছেন, আবার সংস্কারের নীতিগত প্রশ্নে সম্পূর্ণ ভিন্ন ও স্বাধীন অবস্থান নিয়েছেন।

ভোটারদের এই বহুমুখী আচরণ প্রমাণ করে যে, তারা একমাত্রিক নন। তারা একই সঙ্গে দুই ব্যালটে দুই ধরনের বার্তা দিতে সক্ষম—একটি তাদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের বিষয়ে, অন্যটি মৌলিক নীতিগত প্রশ্নে। তবে একটি বড় আক্ষেপের জায়গা হলো, গণভোটের জাতীয় ফল প্রকাশিত হলেও আসনভিত্তিক বা এলাকাভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ তথ্য উন্মুক্ত করা হয়নি। ফলে ঠিক কোন সামাজিক বা আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে এই ‘না’ ভোট বেশি পড়েছে, তা বুঝতে পারা কঠিন হয়ে পড়েছে। গণতন্ত্রে স্বচ্ছতা বাড়াতে এই ধরণের তথ্য উন্মুক্ত রাখা অপরিহার্য।

পরিশেষে বলা যায়, দুই কোটির বেশি নাগরিকের এই ‘না’ অবস্থান গণতন্ত্রের জন্য কোনো হুমকি নয়; বরং এটি নির্ভয়ে ভিন্নমত প্রকাশের একটি সার্থকতা। গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠের জয়ে নয়, বরং সংখ্যালঘু মতের মর্যাদার ওপর নির্ভরশীল। ‘হ্যাঁ’ জয়ী হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সোয়া দুই কোটি মানুষের ‘না’ একটি গভীর প্রশ্ন রেখে গেছে। সেই প্রশ্নের সঠিক উত্তর খোঁজা এবং তাঁদের সংশয় দূর করাই হবে প্রকৃত গণতান্ত্রিক পরিপক্বতার পরিচয়।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

মধ্যপ্রাচ্যে নতুন সামরিক সমীকরণ: চীন থেকে অত্যাধুনিক সুপারসনিক মিসাইল কিনছে ইরান

‘না’ ভোট দেয়া ২ কোটি ২৫ লাখ নাগরিকের চাওয়া আসলে কী: এক গভীর বিশ্লেষণ

আপডেট সময় : ০২:০০:৩৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত বহুল আলোচিত গণভোটে জাতীয় সংস্কারমূলক প্রস্তাবের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছে ৪ কোটি ৮০ লাখ ৭৪ হাজার ৪২৯টি। এর বিপরীতে ‘না’ ভোট পড়েছে ২ কোটি ২৫ লাখ ৬৫ হাজার ৬২৭টি। সংখ্যার বিচারে ‘হ্যাঁ’ ভোট দ্বিগুণ ব্যবধানে জয়ী হলেও, এই সোয়া দুই কোটির বেশি ‘না’ ভোটকে কেবল একটি পরাজিত মত হিসেবে দেখলেই কি যথেষ্ট হবে? এই বিশাল জনশক্তি দেশের প্রায় ২০০ নির্বাচিত সংসদ সদস্যের সম্মিলিত ভোটব্যাংকের সমান। তাই এই বিপুল সংখ্যক নাগরিকের ‘না’ বলাকে আমাদের দেশের একটি বড় অংশের সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা অত্যন্ত জরুরি।

সাধারণত গণভোটে ‘না’ ভোট সবসময় যে আমূল পরিবর্তনের বিরোধিতা করে, তা নয়। বরং এটি অনেক ক্ষেত্রে নাগরিকের গভীর পর্যবেক্ষণ ও তিনটি প্রধান মানসিক প্রবণতার প্রতিফলন। প্রথমত, একটি বড় অংশের মধ্যে স্থিতিশীলতার প্রতি প্রবল টান থাকে। তারা মনে করেন, বিদ্যমান আইন ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোই যথেষ্ট; মূল সমস্যাটি কাঠামোগত নয়, বরং প্রয়োগের অভাব। পরিবর্তন মানেই নতুন কোনো অনিশ্চয়তা—এই মনস্তত্ত্ব থেকে অনেকেই ঝুঁকি এড়াতে ‘না’ বেছে নেন। তাদের কাছে বর্তমান অবস্থাটিই অপেক্ষাকৃত নিরাপদ মনে হয়।

দ্বিতীয়ত, এই ‘না’ ভোটের পেছনে থাকতে পারে এক ধরণের ‘সতর্ক সম্মতি’ বা সংশয়। অনেক নাগরিক হয়তো সংস্কারের প্রয়োজনীয়তাকে নীতিগতভাবে সমর্থন করেন, কিন্তু প্রস্তাবিত পদ্ধতি, সময়কাল কিংবা বাস্তবায়নের ধরন নিয়ে তাদের মধ্যে গভীর সন্দেহ থাকতে পারে। এমন প্রেক্ষাপটে তাদের ‘না’ বলার অর্থ হলো—প্রস্তাবিত ধারণাটি তারা পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করছেন না, বরং তারা বলছেন, “এভাবে নয়, আরও স্বচ্ছতা চাই” অথবা “আমাদের আরও বিকল্প প্রস্তাব প্রয়োজন।” এটি মূলত সংস্কারের প্রক্রিয়া বা গতির ওপর একটি রাশ টেনে ধরার প্রচেষ্টা।

গণভোটের মাধ্যমে মানুষ কেবল একটি নির্দিষ্ট নীতির পক্ষ-বিপক্ষেই মত দেয় না; অনেক সময় পুরো প্রক্রিয়ার প্রতি তাদের আস্থা আছে কি না, সেটিও গুরুত্ব পায়। প্রস্তাবটি কারা এনেছেন বা কীভাবে উপস্থাপিত হয়েছে—এসব বিষয়ও মানুষের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। তাই এই ‘না’ ভোট অনেক ক্ষেত্রে নেতৃত্বের প্রতি এক ধরণের নীরব অসন্তোষ বা আস্থার সংকটের বার্তা হতে পারে। দেখা গেছে, অনেক আসনে যেখানে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন, সেখানে গণভোটে ‘না’ বিপুল ভোটে এগিয়ে ছিল। এটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি বিষয়। এর অর্থ হলো, ভোটাররা তাদের রাজনৈতিক প্রতিনিধি নির্বাচনের ক্ষেত্রে একভাবে ভেবেছেন, আবার সংস্কারের নীতিগত প্রশ্নে সম্পূর্ণ ভিন্ন ও স্বাধীন অবস্থান নিয়েছেন।

ভোটারদের এই বহুমুখী আচরণ প্রমাণ করে যে, তারা একমাত্রিক নন। তারা একই সঙ্গে দুই ব্যালটে দুই ধরনের বার্তা দিতে সক্ষম—একটি তাদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের বিষয়ে, অন্যটি মৌলিক নীতিগত প্রশ্নে। তবে একটি বড় আক্ষেপের জায়গা হলো, গণভোটের জাতীয় ফল প্রকাশিত হলেও আসনভিত্তিক বা এলাকাভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ তথ্য উন্মুক্ত করা হয়নি। ফলে ঠিক কোন সামাজিক বা আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে এই ‘না’ ভোট বেশি পড়েছে, তা বুঝতে পারা কঠিন হয়ে পড়েছে। গণতন্ত্রে স্বচ্ছতা বাড়াতে এই ধরণের তথ্য উন্মুক্ত রাখা অপরিহার্য।

পরিশেষে বলা যায়, দুই কোটির বেশি নাগরিকের এই ‘না’ অবস্থান গণতন্ত্রের জন্য কোনো হুমকি নয়; বরং এটি নির্ভয়ে ভিন্নমত প্রকাশের একটি সার্থকতা। গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠের জয়ে নয়, বরং সংখ্যালঘু মতের মর্যাদার ওপর নির্ভরশীল। ‘হ্যাঁ’ জয়ী হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সোয়া দুই কোটি মানুষের ‘না’ একটি গভীর প্রশ্ন রেখে গেছে। সেই প্রশ্নের সঠিক উত্তর খোঁজা এবং তাঁদের সংশয় দূর করাই হবে প্রকৃত গণতান্ত্রিক পরিপক্বতার পরিচয়।