ঢাকা ০৮:৪২ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

অতি সংখ্যাগরিষ্ঠতার দ্বিমুখী তলোয়ার: নতুন সরকারের সামনে পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:৫৪:২৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৩ বার পড়া হয়েছে

তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত নতুন সরকার প্রায় দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসনের কুফল ও কলঙ্কিত উত্তরাধিকার বহন করছে। ২০০৮ সালের বিতর্কিত নির্বাচন, যা ১/১১-এর প্রেক্ষাপটে পাতানো ছিল বলে অভিযোগ ওঠে, এবং ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের নির্বাচন, যাকে অনেকে ‘৩৬ জুলাই’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন, এসব মিলিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট অত্যন্ত জটিল। এই পরিস্থিতিতে, বর্তমান সরকারের ‘সুপার মেজরিটি’ বা অতি সংখ্যাগরিষ্ঠতা কতটা আশীর্বাদ এবং কতটা চ্যালেঞ্জ, তা গভীরভাবে বিশ্লেষণের দাবি রাখে।

ক্ষমতার বিপুল ভার ও চ্যালেঞ্জ
নতুন প্রশাসনকে দুটি প্রধান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে: এক. ফ্যাসিবাদী আমলের আইনশৃঙ্খলা, আর্থিক ব্যবস্থাসহ সামগ্রিক জঞ্জাল পরিষ্কার করা এবং দুই. নির্বাচনে দেওয়া অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন। এছাড়াও, দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের বিভিন্ন বক্তব্য এবং নিষিদ্ধ দলের সঙ্গে ভোটের জন্য গোপন রাজনৈতিক সমন্বয় বা জোটবদ্ধতার মতো বিষয়গুলোও নিরীক্ষা ও পর্যালোচনার আওতায় আনা জরুরি, বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো প্রান্তিক গণতান্ত্রিক দেশে, যেখানে গোপন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। কারণ ক্ষমতার তত্ত্ব অনুযায়ী, এসব বিষয় ভবিষ্যতের দিনগুলোতে একে একে সামনে আসবে। বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে প্রায়শই একটি ‘রোলার কোস্টারের’ মতো বিপজ্জনক ও প্রতিনিয়ত পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়।

অতি সংখ্যাগরিষ্ঠতা: আশীর্বাদ না অভিশাপ?
এমতাবস্থায়, অতি সংখ্যাগরিষ্ঠতা কতটা আশীর্বাদ, তা বিবেচনায় নিতে হবে। এই বিপুল ক্ষমতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি অসম রাজনৈতিক ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে, যেখানে জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতার অভাব দেখা যেতে পারে। এমন পরিবেশে নেতার একক ইচ্ছায় কর্ম বা সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রলুব্ধ হওয়ার ঝুঁকি থাকে, যা ক্ষমতার সার্বিক পুঞ্জীভবন এবং ব্যক্তি কেন্দ্রিক শাসন গড়ে তুলতে পারে। কিন্তু কোনোক্রমেই এই পথে পা দেওয়া উচিত হবে না। সঠিক মাত্রার গণতন্ত্রে ব্যক্তি রাষ্ট্রের চেয়ে বড় নয়। অতি সংখ্যাগরিষ্ঠতার ফলে গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য রক্ষার জন্য বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। সঠিক এবং ক্যারিসম্যাটিক নেতৃত্ব ছাড়া এই পথ থেকে নিস্তার পাওয়া খুবই কঠিন। মনে রাখা প্রয়োজন, অতি সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রায়শই একনায়কতান্ত্রিক শাসনের খুব কাছাকাছি অবস্থান করে; তাই সিদ্ধান্তে সামান্য ভুলও মহাবিপদ ডেকে আনতে পারে।

জনগণের আকাঙ্ক্ষা ও রাজনৈতিক নির্মূলকরণ
দীর্ঘদিনের ফ্যাসিবাদী শাসনের পর জনগণের আকাঙ্ক্ষা আকাশচুম্বী হওয়া স্বাভাবিক, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু আশাবাদ এবং প্রাপ্যতার বিস্তর ফারাক থাকলে তা দুর্বিপাক বা অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যবস্থার জন্ম দিতে বাধ্য। রাজনীতি বিজ্ঞানে দুটি কথা প্রচলিত আছে—এক. বিজয়ী সবটুকু কেড়ে নেয় (Winner takes all), দুই. রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নির্মূল বা বিনাশ (Political elimination) উদ্যোগ। প্রতিপক্ষ নির্মূলের কিছু বাস্তবায়ন ইতিমধ্যেই বিদ্যমান। কেন্দ্র থেকে এই নির্মূল উদ্যোগকে বাধা দেওয়া কঠিন হলেও তা থামাতে হবে, কারণ এটি থামাতে না পারাটা বিপজ্জনক।

চাটুকার ও ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু
চাটুকারদের বিদ্যমানতা সব সরকারের আমলেই দেখা যায়। নিকোলো ম্যাকিয়াভেলি ১৪০০ শতকে বলেছেন, শাসক যদি বিচক্ষণ দূরদৃষ্টিসম্পন্ন না হন, তাহলে তিনি চাটুকারদের হাতে সহজেই ঘায়েল হতে পারেন। অতি সংখ্যাগরিষ্ঠতার আরও কিছু বিপজ্জনক প্রবণতা হলো—রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর বিজয়ী পক্ষের হস্তক্ষেপ, আইন ও বিচার বিভাগকে ব্যবহার করে প্রতিপক্ষকে হয়রানি এবং কেন্দ্র ও স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের মতামতকে উপেক্ষা করা। সবচেয়ে বেশি বিপজ্জনক যে বিষয়টি, তা হলো, কেন্দ্রীয় পর্যায়ে নিয়ন্ত্রণ করা না হলে ‘ক্ষমতাসীনদের প্রতি ভয়ের বা ভীতির মনোভাব সৃষ্টি হতে পারে’। বাংলাদেশে এই প্রবণতা নতুন কিছু নয়।
বাংলাদেশের মতো প্রান্তিক গণতন্ত্রের পরিস্থিতিতে, সংসদ সদস্যরা প্রায়শই একেকটি ‘ক্ষমতার আধা-আনুষ্ঠানিক কেন্দ্র’ (Semi power centres of power) হিসেবে গণ্য হন। প্রত্যেক সংসদ সদস্যের ক্ষমতার আনুষ্ঠানিক কেন্দ্রের কার্যক্রমকে সামাল দেওয়ার মতো কার্যকর ব্যবস্থা ক্ষমতাসীন দলের আছে কি না, না থাকলে এখনই কর্মকৌশল নির্ধারণ করতে হবে। এছাড়াও অসংখ্য ক্ষমতার অনানুষ্ঠানিক কেন্দ্র গড়ে উঠেছে এবং ভবিষ্যতে আরও উঠবে। এসব ক্ষমতার কেন্দ্রের কার্যক্রম কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে, তা নিশ্চিত করা জরুরি।

ভোটভীতি সিন্ড্রোম: গণতন্ত্রের প্রতি অবিশ্বাস
২০০৮ সালের পাতানো নির্বাচন, ২০১৪, ২০১৮, ২০২৪ সালের জোরজবরদস্তি চাপিয়ে দেওয়া নির্বাচন—বাংলাদেশের জনমনে এক গভীর ‘ভোটভীতি সিন্ড্রোম’ তৈরি করেছে। এটি হলো—ভোট প্রদান বা এর সঠিক ফল প্রাপ্তির ক্ষেত্রে ভোটারদের মনে তৈরি হওয়া মানসিক উদ্বেগ, আতঙ্ক, অনিশ্চয়তা, সহিংসতার মনস্তত্ত্ব এবং ভোটের ফল বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি দেখতে না পাওয়া। এটি রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, সহিংসতা বা ভোট প্রদানের ভীতি তৈরি করে এবং এমন পরিস্থিতি গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে তীব্র অবিশ্বাসের কারণে পুরো জনগণের মধ্যে সৃষ্ট মনস্তাত্ত্বিক ভীতিপ্রদ পরিস্থিতির জন্ম দেয়। এটি গণতন্ত্রকে সবল সজীব করার বদলে পেশিশক্তি, ফলাফল নিজের মতো তৈরি করা—সর্বোপরি পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রের কাছে মূল শক্তি, অর্থাৎ জনগণ তীব্র অসহায়ত্ববোধে আচ্ছন্ন হয়। একটি আন্তর্জাতিক সমীক্ষায় দেখা গেছে, এমন পরিস্থিতি নির্বাচনী সংস্কৃতি অর্থাৎ গণতন্ত্রের জন্য মারাত্মক বিপজ্জনক।

ব্যবসায়ীদের উত্থান: রাজনীতির নতুন ধারা
বাংলাদেশের নির্বাচনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, রাজনীতি আর সাধারণ মানুষের হাতে নেই। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যেখানে আইনজীবী, শিক্ষকসহ মধ্যবিত্তের প্রাধান্য ছিল, তা এখন ধনিক শ্রেণি এবং অভিজাতদের হাতে ও ব্যবসায়ীদের হাতে চলে গেছে। বিভিন্ন গবেষণা ও গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, বিগত নির্বাচনগুলোতে ব্যবসায়ীদের সংসদ সদস্য হওয়ার হার ক্রমান্বয়ে বেড়েছে। ২০০৮ সালের বিশেষ কারসাজির নির্বাচনে ৫৭ শতাংশ, ২০১৪ সালে ৫৯ শতাংশ, ২০১৮ সালে ৬২ শতাংশ এবং ২০২৪ সালের ফ্যাসিস্ট সরকারের সময়ে ৬৭ শতাংশ ব্যবসায়ী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। একটি জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমান সংসদেও ১৭৪ জন ব্যবসায়ী নির্বাচিত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ১৪৫ জন ক্ষমতাসীন দল থেকে, ২০ জন জামায়াত থেকে এবং দুজন এনসিপি থেকে। বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যমতে, ক্ষমতাসীন দলের ৫৯.৪১ শতাংশ প্রার্থী ঋণগ্রস্ত, যাদের কাছে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মোট পাওনা ১৭ হাজার ৪৭১ কোটি টাকা। এই তথ্য প্রায়শই কমিয়ে বলা হয়। এর অর্থ হলো, সংসদ এখন আর সাধারণ মানুষের প্রতিনিধিত্বমূলক প্রতিষ্ঠান নয়, বরং কোটিপতি অভিজাত শ্রেণির দখলে চলে গেছে। নতুন সরকারকে অবশ্যই এই ধনিক শ্রেণির ‘ডিকটেশন’ বা হুকুম এবং ‘ডিজায়ার’ বা ইচ্ছা ও আকাঙ্ক্ষাকে সীমিত করতে হবে। কারণ সাধারণ মানুষের ঐক্য থাকুক বা না থাকুক, ধনিক ও অভিজাত শ্রেণির অদৃশ্য এক বন্ধন এবং ঐক্য থাকে। ম্যাকিয়াভেলি বলেন, অভিজাত শ্রেণির শাসকরা সবসময় তার সমান বা সহমত ও মতামত প্রকাশকারী মানুষ দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকে, যে কারণে তাদের নিয়ন্ত্রণ করা কিংবা পক্ষে আনা কঠিন হয়ে পড়ে।

একচেটিয়া জয় ও একদলীয় কেন্দ্রিকতা
এ অবস্থায় অতি সংখ্যাগরিষ্ঠতা বা বিপুল ব্যবধানের একচেটিয়া জয়প্রাপ্ত দলটির ক্ষেত্রে ক্ষমতার প্রকৃত প্রতিযোগিতার পরিবর্তে শুধু বৈধতা অর্জনের আচার বা আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে ক্ষমতাকে ব্যবহার করার প্রবণতা কাজ করতে পারে। প্রতিযোগিতামূলক ব্যবস্থার পরিবর্তে একদলীয় কেন্দ্রিকতার ব্যবস্থায় চলে যাওয়ার নজির রয়েছে। সে সম্পর্কে দলের প্রধানকে সজাগ থাকতে হবে। অন্যথায় বিরোধীদলীয় বাস্তবতা থাকলেও তাদের কার্যকারিতা থাকে না, এতে কার্যত গণতন্ত্র বিপন্ন হয়। এটি উত্তরণের জন্য প্রয়োজন যোগ্য ও প্রজ্ঞাবান নেতৃত্বের।

অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি ও আমলাতন্ত্রের চ্যালেঞ্জ
এমন পরিস্থিতিতে প্রয়োজন অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবস্থার মাধ্যমে বিরোধী দলকে অগ্রাধিকার দিয়ে কার্যকর পার্লামেন্ট প্রতিষ্ঠা এবং এর ক্ষেত্র প্রস্তুত করা। রাজনৈতিক অঙ্গন যেন সবল বনাম দুর্বলের না হয়। পার্লামেন্টে এই ব্যবস্থা হতে হবে এবং তা জরুরি। এখানে রাজনৈতিক বিনাশ মানসিকতায় হিতে বিপরীত হতে বাধ্য। একটি বিরোধী দল বা পক্ষ যত ছোট বা দুর্বলই হোক না কেন, তাকে মূল ধারা এবং প্রক্রিয়ায় শামিল করতে হবে। কারণ তারাও একটি বিশাল জনগোষ্ঠীর ভোট পেয়ে এসেছেন। জাতীয় নীতিকৌশল, আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক যেকোনো চুক্তি কিংবা যেকোনো দুর্যোগ, সংকট মোকাবিলায় একসঙ্গে কাজ করতে পারার নাম ‘জাতীয় ঐক্য’। যদিও জুলাই সনদে এর যৎসামান্য অগ্রগতি হয়েছে, তবে প্রান্তিক বা স্বল্পমাত্রার গণতান্ত্রিক দেশে এটি বিরল। সমালোচনা যেমনই হোক, বড় দলের নেতাকে তা গঠনমূলক মানসিকতায় গ্রহণ করতে হবে।
বিদ্যমান আমলাতন্ত্রের সঙ্গে সবসময়ই অভিজাত শাসক এবং শাসকশ্রেণির সুসম্পর্ক বজায় থাকে। ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার হিসেবে আমলাতন্ত্র যেকোনো উপনিবেশ-শাসিত দেশের জন্য বিপদ হিসেবে চিহ্নিত করা চলে। এরা বিদ্যমান কাঠামোর বিপক্ষের শক্তি এবং জোটবদ্ধ। আন্তোনিও গ্রামসির মতে, আমলাতন্ত্র সবচেয়ে বিপজ্জনক লুকিয়ে থাকা রক্ষণশীল শক্তি, যা গণসদস্যদের থেকে নিজেদের স্বাধীন মনে করে একটি আঁটসাঁট চক্র গড়ে তুলতে পারলে, রাজনৈতিক দল তার সামাজিক বিষয় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। অতি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া দলকে বিশেষ করে আমলাতন্ত্রকে কীভাবে মোকাবিলা করতে হবে, সে সম্পর্ক এবং কৌশল কী হবে, দলের প্রধান ও প্রধানমন্ত্রীকে তা ভেবে দেখতে হবে গভীরভাবে।

জ্যাঁ জ্যাঁ রুশোর বিখ্যাত উক্তি দিয়ে লেখাটি শেষ করতে চাই: জনকল্যাণকর কার্যক্রমের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা আমরা যত সংকীর্ণ মনে করি, ঠিক তা নয়। এই সম্ভাবনা বাধাগ্রস্ত বা সংকীর্ণ হয় আমাদেরই দোষত্রুটি, পক্ষপাতিত্ব এবং আন্তরিকতার কারণে। বিজয়ের অনেক পিতা থাকলেও পরাজিত একজন এতিম।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

মাঠের রাজা হলেও যে অপূর্ণতা আজও পোড়ায় মেসিকে

অতি সংখ্যাগরিষ্ঠতার দ্বিমুখী তলোয়ার: নতুন সরকারের সামনে পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ

আপডেট সময় : ০৯:৫৪:২৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত নতুন সরকার প্রায় দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসনের কুফল ও কলঙ্কিত উত্তরাধিকার বহন করছে। ২০০৮ সালের বিতর্কিত নির্বাচন, যা ১/১১-এর প্রেক্ষাপটে পাতানো ছিল বলে অভিযোগ ওঠে, এবং ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের নির্বাচন, যাকে অনেকে ‘৩৬ জুলাই’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন, এসব মিলিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট অত্যন্ত জটিল। এই পরিস্থিতিতে, বর্তমান সরকারের ‘সুপার মেজরিটি’ বা অতি সংখ্যাগরিষ্ঠতা কতটা আশীর্বাদ এবং কতটা চ্যালেঞ্জ, তা গভীরভাবে বিশ্লেষণের দাবি রাখে।

ক্ষমতার বিপুল ভার ও চ্যালেঞ্জ
নতুন প্রশাসনকে দুটি প্রধান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে: এক. ফ্যাসিবাদী আমলের আইনশৃঙ্খলা, আর্থিক ব্যবস্থাসহ সামগ্রিক জঞ্জাল পরিষ্কার করা এবং দুই. নির্বাচনে দেওয়া অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন। এছাড়াও, দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের বিভিন্ন বক্তব্য এবং নিষিদ্ধ দলের সঙ্গে ভোটের জন্য গোপন রাজনৈতিক সমন্বয় বা জোটবদ্ধতার মতো বিষয়গুলোও নিরীক্ষা ও পর্যালোচনার আওতায় আনা জরুরি, বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো প্রান্তিক গণতান্ত্রিক দেশে, যেখানে গোপন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। কারণ ক্ষমতার তত্ত্ব অনুযায়ী, এসব বিষয় ভবিষ্যতের দিনগুলোতে একে একে সামনে আসবে। বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে প্রায়শই একটি ‘রোলার কোস্টারের’ মতো বিপজ্জনক ও প্রতিনিয়ত পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়।

অতি সংখ্যাগরিষ্ঠতা: আশীর্বাদ না অভিশাপ?
এমতাবস্থায়, অতি সংখ্যাগরিষ্ঠতা কতটা আশীর্বাদ, তা বিবেচনায় নিতে হবে। এই বিপুল ক্ষমতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি অসম রাজনৈতিক ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে, যেখানে জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতার অভাব দেখা যেতে পারে। এমন পরিবেশে নেতার একক ইচ্ছায় কর্ম বা সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রলুব্ধ হওয়ার ঝুঁকি থাকে, যা ক্ষমতার সার্বিক পুঞ্জীভবন এবং ব্যক্তি কেন্দ্রিক শাসন গড়ে তুলতে পারে। কিন্তু কোনোক্রমেই এই পথে পা দেওয়া উচিত হবে না। সঠিক মাত্রার গণতন্ত্রে ব্যক্তি রাষ্ট্রের চেয়ে বড় নয়। অতি সংখ্যাগরিষ্ঠতার ফলে গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য রক্ষার জন্য বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। সঠিক এবং ক্যারিসম্যাটিক নেতৃত্ব ছাড়া এই পথ থেকে নিস্তার পাওয়া খুবই কঠিন। মনে রাখা প্রয়োজন, অতি সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রায়শই একনায়কতান্ত্রিক শাসনের খুব কাছাকাছি অবস্থান করে; তাই সিদ্ধান্তে সামান্য ভুলও মহাবিপদ ডেকে আনতে পারে।

জনগণের আকাঙ্ক্ষা ও রাজনৈতিক নির্মূলকরণ
দীর্ঘদিনের ফ্যাসিবাদী শাসনের পর জনগণের আকাঙ্ক্ষা আকাশচুম্বী হওয়া স্বাভাবিক, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু আশাবাদ এবং প্রাপ্যতার বিস্তর ফারাক থাকলে তা দুর্বিপাক বা অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যবস্থার জন্ম দিতে বাধ্য। রাজনীতি বিজ্ঞানে দুটি কথা প্রচলিত আছে—এক. বিজয়ী সবটুকু কেড়ে নেয় (Winner takes all), দুই. রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নির্মূল বা বিনাশ (Political elimination) উদ্যোগ। প্রতিপক্ষ নির্মূলের কিছু বাস্তবায়ন ইতিমধ্যেই বিদ্যমান। কেন্দ্র থেকে এই নির্মূল উদ্যোগকে বাধা দেওয়া কঠিন হলেও তা থামাতে হবে, কারণ এটি থামাতে না পারাটা বিপজ্জনক।

চাটুকার ও ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু
চাটুকারদের বিদ্যমানতা সব সরকারের আমলেই দেখা যায়। নিকোলো ম্যাকিয়াভেলি ১৪০০ শতকে বলেছেন, শাসক যদি বিচক্ষণ দূরদৃষ্টিসম্পন্ন না হন, তাহলে তিনি চাটুকারদের হাতে সহজেই ঘায়েল হতে পারেন। অতি সংখ্যাগরিষ্ঠতার আরও কিছু বিপজ্জনক প্রবণতা হলো—রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর বিজয়ী পক্ষের হস্তক্ষেপ, আইন ও বিচার বিভাগকে ব্যবহার করে প্রতিপক্ষকে হয়রানি এবং কেন্দ্র ও স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের মতামতকে উপেক্ষা করা। সবচেয়ে বেশি বিপজ্জনক যে বিষয়টি, তা হলো, কেন্দ্রীয় পর্যায়ে নিয়ন্ত্রণ করা না হলে ‘ক্ষমতাসীনদের প্রতি ভয়ের বা ভীতির মনোভাব সৃষ্টি হতে পারে’। বাংলাদেশে এই প্রবণতা নতুন কিছু নয়।
বাংলাদেশের মতো প্রান্তিক গণতন্ত্রের পরিস্থিতিতে, সংসদ সদস্যরা প্রায়শই একেকটি ‘ক্ষমতার আধা-আনুষ্ঠানিক কেন্দ্র’ (Semi power centres of power) হিসেবে গণ্য হন। প্রত্যেক সংসদ সদস্যের ক্ষমতার আনুষ্ঠানিক কেন্দ্রের কার্যক্রমকে সামাল দেওয়ার মতো কার্যকর ব্যবস্থা ক্ষমতাসীন দলের আছে কি না, না থাকলে এখনই কর্মকৌশল নির্ধারণ করতে হবে। এছাড়াও অসংখ্য ক্ষমতার অনানুষ্ঠানিক কেন্দ্র গড়ে উঠেছে এবং ভবিষ্যতে আরও উঠবে। এসব ক্ষমতার কেন্দ্রের কার্যক্রম কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে, তা নিশ্চিত করা জরুরি।

ভোটভীতি সিন্ড্রোম: গণতন্ত্রের প্রতি অবিশ্বাস
২০০৮ সালের পাতানো নির্বাচন, ২০১৪, ২০১৮, ২০২৪ সালের জোরজবরদস্তি চাপিয়ে দেওয়া নির্বাচন—বাংলাদেশের জনমনে এক গভীর ‘ভোটভীতি সিন্ড্রোম’ তৈরি করেছে। এটি হলো—ভোট প্রদান বা এর সঠিক ফল প্রাপ্তির ক্ষেত্রে ভোটারদের মনে তৈরি হওয়া মানসিক উদ্বেগ, আতঙ্ক, অনিশ্চয়তা, সহিংসতার মনস্তত্ত্ব এবং ভোটের ফল বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি দেখতে না পাওয়া। এটি রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, সহিংসতা বা ভোট প্রদানের ভীতি তৈরি করে এবং এমন পরিস্থিতি গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে তীব্র অবিশ্বাসের কারণে পুরো জনগণের মধ্যে সৃষ্ট মনস্তাত্ত্বিক ভীতিপ্রদ পরিস্থিতির জন্ম দেয়। এটি গণতন্ত্রকে সবল সজীব করার বদলে পেশিশক্তি, ফলাফল নিজের মতো তৈরি করা—সর্বোপরি পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রের কাছে মূল শক্তি, অর্থাৎ জনগণ তীব্র অসহায়ত্ববোধে আচ্ছন্ন হয়। একটি আন্তর্জাতিক সমীক্ষায় দেখা গেছে, এমন পরিস্থিতি নির্বাচনী সংস্কৃতি অর্থাৎ গণতন্ত্রের জন্য মারাত্মক বিপজ্জনক।

ব্যবসায়ীদের উত্থান: রাজনীতির নতুন ধারা
বাংলাদেশের নির্বাচনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, রাজনীতি আর সাধারণ মানুষের হাতে নেই। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যেখানে আইনজীবী, শিক্ষকসহ মধ্যবিত্তের প্রাধান্য ছিল, তা এখন ধনিক শ্রেণি এবং অভিজাতদের হাতে ও ব্যবসায়ীদের হাতে চলে গেছে। বিভিন্ন গবেষণা ও গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, বিগত নির্বাচনগুলোতে ব্যবসায়ীদের সংসদ সদস্য হওয়ার হার ক্রমান্বয়ে বেড়েছে। ২০০৮ সালের বিশেষ কারসাজির নির্বাচনে ৫৭ শতাংশ, ২০১৪ সালে ৫৯ শতাংশ, ২০১৮ সালে ৬২ শতাংশ এবং ২০২৪ সালের ফ্যাসিস্ট সরকারের সময়ে ৬৭ শতাংশ ব্যবসায়ী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। একটি জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমান সংসদেও ১৭৪ জন ব্যবসায়ী নির্বাচিত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ১৪৫ জন ক্ষমতাসীন দল থেকে, ২০ জন জামায়াত থেকে এবং দুজন এনসিপি থেকে। বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যমতে, ক্ষমতাসীন দলের ৫৯.৪১ শতাংশ প্রার্থী ঋণগ্রস্ত, যাদের কাছে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মোট পাওনা ১৭ হাজার ৪৭১ কোটি টাকা। এই তথ্য প্রায়শই কমিয়ে বলা হয়। এর অর্থ হলো, সংসদ এখন আর সাধারণ মানুষের প্রতিনিধিত্বমূলক প্রতিষ্ঠান নয়, বরং কোটিপতি অভিজাত শ্রেণির দখলে চলে গেছে। নতুন সরকারকে অবশ্যই এই ধনিক শ্রেণির ‘ডিকটেশন’ বা হুকুম এবং ‘ডিজায়ার’ বা ইচ্ছা ও আকাঙ্ক্ষাকে সীমিত করতে হবে। কারণ সাধারণ মানুষের ঐক্য থাকুক বা না থাকুক, ধনিক ও অভিজাত শ্রেণির অদৃশ্য এক বন্ধন এবং ঐক্য থাকে। ম্যাকিয়াভেলি বলেন, অভিজাত শ্রেণির শাসকরা সবসময় তার সমান বা সহমত ও মতামত প্রকাশকারী মানুষ দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকে, যে কারণে তাদের নিয়ন্ত্রণ করা কিংবা পক্ষে আনা কঠিন হয়ে পড়ে।

একচেটিয়া জয় ও একদলীয় কেন্দ্রিকতা
এ অবস্থায় অতি সংখ্যাগরিষ্ঠতা বা বিপুল ব্যবধানের একচেটিয়া জয়প্রাপ্ত দলটির ক্ষেত্রে ক্ষমতার প্রকৃত প্রতিযোগিতার পরিবর্তে শুধু বৈধতা অর্জনের আচার বা আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে ক্ষমতাকে ব্যবহার করার প্রবণতা কাজ করতে পারে। প্রতিযোগিতামূলক ব্যবস্থার পরিবর্তে একদলীয় কেন্দ্রিকতার ব্যবস্থায় চলে যাওয়ার নজির রয়েছে। সে সম্পর্কে দলের প্রধানকে সজাগ থাকতে হবে। অন্যথায় বিরোধীদলীয় বাস্তবতা থাকলেও তাদের কার্যকারিতা থাকে না, এতে কার্যত গণতন্ত্র বিপন্ন হয়। এটি উত্তরণের জন্য প্রয়োজন যোগ্য ও প্রজ্ঞাবান নেতৃত্বের।

অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি ও আমলাতন্ত্রের চ্যালেঞ্জ
এমন পরিস্থিতিতে প্রয়োজন অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবস্থার মাধ্যমে বিরোধী দলকে অগ্রাধিকার দিয়ে কার্যকর পার্লামেন্ট প্রতিষ্ঠা এবং এর ক্ষেত্র প্রস্তুত করা। রাজনৈতিক অঙ্গন যেন সবল বনাম দুর্বলের না হয়। পার্লামেন্টে এই ব্যবস্থা হতে হবে এবং তা জরুরি। এখানে রাজনৈতিক বিনাশ মানসিকতায় হিতে বিপরীত হতে বাধ্য। একটি বিরোধী দল বা পক্ষ যত ছোট বা দুর্বলই হোক না কেন, তাকে মূল ধারা এবং প্রক্রিয়ায় শামিল করতে হবে। কারণ তারাও একটি বিশাল জনগোষ্ঠীর ভোট পেয়ে এসেছেন। জাতীয় নীতিকৌশল, আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক যেকোনো চুক্তি কিংবা যেকোনো দুর্যোগ, সংকট মোকাবিলায় একসঙ্গে কাজ করতে পারার নাম ‘জাতীয় ঐক্য’। যদিও জুলাই সনদে এর যৎসামান্য অগ্রগতি হয়েছে, তবে প্রান্তিক বা স্বল্পমাত্রার গণতান্ত্রিক দেশে এটি বিরল। সমালোচনা যেমনই হোক, বড় দলের নেতাকে তা গঠনমূলক মানসিকতায় গ্রহণ করতে হবে।
বিদ্যমান আমলাতন্ত্রের সঙ্গে সবসময়ই অভিজাত শাসক এবং শাসকশ্রেণির সুসম্পর্ক বজায় থাকে। ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার হিসেবে আমলাতন্ত্র যেকোনো উপনিবেশ-শাসিত দেশের জন্য বিপদ হিসেবে চিহ্নিত করা চলে। এরা বিদ্যমান কাঠামোর বিপক্ষের শক্তি এবং জোটবদ্ধ। আন্তোনিও গ্রামসির মতে, আমলাতন্ত্র সবচেয়ে বিপজ্জনক লুকিয়ে থাকা রক্ষণশীল শক্তি, যা গণসদস্যদের থেকে নিজেদের স্বাধীন মনে করে একটি আঁটসাঁট চক্র গড়ে তুলতে পারলে, রাজনৈতিক দল তার সামাজিক বিষয় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। অতি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া দলকে বিশেষ করে আমলাতন্ত্রকে কীভাবে মোকাবিলা করতে হবে, সে সম্পর্ক এবং কৌশল কী হবে, দলের প্রধান ও প্রধানমন্ত্রীকে তা ভেবে দেখতে হবে গভীরভাবে।

জ্যাঁ জ্যাঁ রুশোর বিখ্যাত উক্তি দিয়ে লেখাটি শেষ করতে চাই: জনকল্যাণকর কার্যক্রমের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা আমরা যত সংকীর্ণ মনে করি, ঠিক তা নয়। এই সম্ভাবনা বাধাগ্রস্ত বা সংকীর্ণ হয় আমাদেরই দোষত্রুটি, পক্ষপাতিত্ব এবং আন্তরিকতার কারণে। বিজয়ের অনেক পিতা থাকলেও পরাজিত একজন এতিম।