বহুল প্রতীক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও রাষ্ট্রীয় সংস্কার সম্পর্কিত গণভোট আজ বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হয়েছে। কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া সারাদেশে উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। এখন শুরু হবে ভোট গণনা। দীর্ঘ দেড় দশক পর দেশের মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করে আগামী পাঁচ বছরের জন্য তাদের কান্ডারি বেছে নিলো। একই সঙ্গে, জাতির ভবিষ্যৎ পুনর্গঠনে জরুরি গণভোটে ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ এর পক্ষে রায় দিলেন ভোটাররা।
সকাল সাড়ে ৭টা থেকে শুরু হয়ে বিরতিহীনভাবে ভোটগ্রহণ চলে বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত। দেশের ২৯৯টি সংসদীয় আসনে ৪২ হাজার ৯৫৮টি ভোটকেন্দ্রে এই ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। তবে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে শেরপুর-৩ আসনের নির্বাচন স্থগিত রাখা হয়েছে।
এই ঐতিহাসিক নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশে একটি নির্বাচিত সরকার গঠিত হবে, যা বাংলাদেশকে গণতন্ত্রের পথে উত্তরণের প্রথম ধাপ অতিক্রম করতে সাহায্য করবে। দীর্ঘ ১৫ বছর পর দেশের জনগণ এমন একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পেলো। সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি, সংবিধান সংস্কার বিষয়ক ‘জুলাই সনদ’ বা জাতীয় গণভোটও একই দিনে অনুষ্ঠিত হয়েছে, যা জাতির ভবিষ্যৎ পুনর্গঠনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আজকের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ ৫৯টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৫১টি দল অংশ নেয়। এই নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী প্রধান দুই প্রতিপক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। উল্লেখ্য, ফ্যাসিবাদী শাসন, গুম ও গণহত্যা চালানোর অভিযোগে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় দলটি এবারের নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি।
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে ঘিরে সারাদেশে এক ধরনের ‘ঈদের আমেজ’ লক্ষ্য করা গেছে। উৎসবমুখর পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকার ও নির্বাচন কমিশন বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করে। ভোটারদের স্বাচ্ছন্দ্যে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার সুযোগ করে দিতে ১১ ও ১২ ফেব্রুয়ারি সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়, যা শুক্র ও শনিবারের সাপ্তাহিক ছুটির সঙ্গে মিলে চারদিনের দীর্ঘ ছুটিতে পরিণত হয়। রাজধানীর বাস টার্মিনাল, লঞ্চঘাট ও রেল স্টেশনগুলোতে ঈদে বাড়ি ফেরার মতো মানুষের ভিড় দেখা গেছে, যারা মূলত গ্রামের বাড়িতে ভোট দিতে গেছেন। দীর্ঘ ১৫ বছর পর প্রথমবারের মতো ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়ে অনেক তরুণ ভোটার বিশেষ করে নবীনরা দারুণ উচ্ছ্বসিত।
নির্বাচন কমিশন ক্যারাভ্যান বা ভ্রাম্যমাণ বাহনের মাধ্যমে প্রচারণার সুযোগ দিয়ে নির্বাচনি আমেজকে আরও বাড়িয়ে তোলে। নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করার জন্য এক লাখ সেনাবাহিনীসহ মোট ৯ লাখ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়।
এবারের নির্বাচনি প্রচার ছিল এক কথায় নজিরবিহীন উৎসবমুখর ও ডিজিটালনির্ভর। ফেসবুক, ইউটিউব এবং টিকটক-এর মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর ব্যাপক ব্যবহার ছিল এবারের প্রচারের অন্যতম বড় দিক। কোনো প্রকার বড় ধরনের সহিংসতা কিংবা বিশৃঙ্খলা ছাড়াই প্রার্থীরা তাদের প্রচার কার্যক্রম শেষ করেন। আজকের নির্বাচন বাংলাদেশের ইতিহাসে কয়েকটি কারণে অত্যন্ত ব্যতিক্রমী এবং একটি ‘ঐতিহাসিক মোড়’ হিসেবে বিবেচিত।
এবারই প্রথম একই দিনে সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি সংবিধান সংস্কারের ওপর একটি জাতীয় গণভোট অনুষ্ঠিত হলো। ভোটাররা দুটি ভিন্ন রঙের ব্যালট পেপার – সংসদ নির্বাচনের জন্য সাদা এবং গণভোটের জন্য গোলাপি – ব্যবহার করেন। গত তিনটি প্রহসনের নির্বাচনের পর এটিই প্রথম বড় ধরনের অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন। এবারের নির্বাচনে প্রায় ৪ কোটি তরুণ ভোটার রয়েছেন, যা মোট ভোটারের এক-তৃতীয়াংশ। ভোটকেন্দ্রগুলোতে সিসিটিভি ক্যামেরা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের জন্য ২৫ হাজার ৭০০ ‘বডি ওর্ন ক্যামেরা’ ব্যবহার করা হয়েছে। এছাড়া, প্রায় এক হাজার ড্রোন ভোটকেন্দ্রগুলোতে নজরদারি চালিয়েছে।
এবারের নির্বাচনে মোট ভোটার সংখ্যা ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৮৯৫ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ১৫১ জন, নারী ভোটার ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ৫২৪ জন এবং হিজড়া ভোটার ১ হাজার ১২০ জন।
রিপোর্টারের নাম 























