বহুল প্রতীক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। সকাল সাড়ে ৭টা থেকে শুরু হবে ভোটগ্রহণ, চলবে বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত।
গত বছরের ১১ ডিসেম্বর জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেন। তারপরও নানা কারণে জনমনে দেখা দেয় অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ। নির্বাচন হবে কিনা, কবে হবে—এমন প্রশ্ন ও সংশয় ঘিরে আলোচনা চলতে থাকে। সেই জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে রাত পোহালেই ভোট দেবেন দেশের মানুষ। তাদের ভোটে নির্ধারিত হবে আগামী দিনের দেশের নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক গতিপথ।
তীব্র আন্দোলনের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তৎকালীন ক্ষমতাসীন সরকারকে বিদায় নিতে হয়। এরপর রাজনৈতিক অস্থিরতা, রাজপথের উত্তাপে বদলে গেছে দেশের রাজনৈতিক সমীকরণ। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই নির্বাচন নিয়ে সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আগ্রহ ও চাপ বাড়তে থাকে।
নির্বাচনের প্রস্তুতি সম্পন্ন
প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনের নেতৃত্বে নির্বাচন কমিশন (ইসি) সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। সারা দেশের ভোটকেন্দ্র প্রস্তুত, নির্বাচনি সামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। ভোটারদের নির্বিঘ্নে ভোটাধিকার প্রয়োগের নিশ্চয়তাও দিয়েছে ইসি।
বুধবার (১১ ফেব্রুয়ারি) সিইসি বলেন, “ভোটগ্রহণ ও গণনা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হবে। লিঙ্গ বা বয়স নির্বিশেষে ভোটাররা অবাধে ভোট দিতে পারবে।”
শঙ্কা ও নিরাপত্তা
নির্বাচন নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে শঙ্কা ও অভিযোগও উঠেছে। বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, প্রার্থীদের নিরাপত্তা ও লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার মাত্র ২৪ ঘণ্টা না পেরোতেই ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য প্রার্থী ও ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরীফ ওসমান হাদির ওপর গুলির ঘটনা ঘটে। এরপর সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনের নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সরব হয়।
নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ তখন বলেছিলেন, “যারা নির্বাচনের পরিবেশ নষ্ট করতে চায়, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সতর্ক এবং সক্রিয় অবস্থানে রয়েছে।”
তফসিল ঘোষণার পর বিভিন্ন সময় লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিয়ে অভিযোগ জানিয়েছে বেশিরভাগ রাজনৈতিক দল। আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেছিলেন, “মাঠপর্যায়ে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড ও নির্বাচন আচরণবিধি মানার ক্ষেত্রে প্রশাসনের যে দৃঢ় অবস্থান থাকার কথা, তা অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে না।”
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেছিলেন, “সবার অংশগ্রহণে সুন্দর ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন আয়োজন করাই সবচেয়ে জরুরি। ইসি যদি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে তারা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।”
তবে সেই সময় ভিন্নমত দেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি ইসির সঙ্গে সুর মিলিয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির আশা প্রকাশ করেন। তার ভাষ্য, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব সরকারের। তারা সুষ্ঠু নির্বাচনি পরিবেশ চান এবং পরিবেশ সুস্থ থাকবে বলে আশা করেন।
দলের নিবন্ধন ও প্রতীক বরাদ্দ নিয়ে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে দ্বৈরথে জড়ায় জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। পরে নিজেদের চাওয়া ‘শাপলা’ প্রতীক না পেয়ে ইসির দেওয়া ‘শাপলা কলি’ প্রতীক নিয়েই নির্বাচনে অংশ নেয় দলটি। অন্যদিকে, আমজনতার দলের সদস্য সচিব তারেক রহমান ১২০ ঘণ্টার বেশি আমরণ অনশন করে দলের নিবন্ধন আদায় করেন এবং নির্বাচনে অংশ নেন।
ভোটের পরিসংখ্যান
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটগ্রহণ হবে ২৯৯ আসনে। জামায়াত ইসলামীর প্রার্থীর মৃত্যুতে শেরপুর-৩ আসনের নির্বাচন স্থগিত করা হয়েছে। এবারের নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী মোট প্রার্থী সংখ্যা ২,২৮০ জন, যার মধ্যে রাজনৈতিক দলের প্রার্থী ১,৭৫৫ এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী ২৭৩ জন। পুরুষ প্রার্থী ১,৯৪৬ জন (রাজনৈতিক দল ১,৬৯২, স্বতন্ত্র ২৫৩) এবং নারী প্রার্থী ৮৩ জন (রাজনৈতিক দল ৬৩, স্বতন্ত্র ২০)।
মোট ভোটার ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৯৩ জন, যার মধ্যে পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ৩৬১ জন, নারী ভোটার ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ২০০ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ১,২৩২ জন। সারা দেশে মোট ৪২,৭৭৯টি ভোটকেন্দ্র রয়েছে। সেগুলোকে ভাগ করা হয়েছে সাধারণ ও গুরুত্বপূর্ণ (ঝুঁকিপূর্ণ) ভোটকেন্দ্রে। সাধারণ ভোটকেন্দ্র ২১,২৭৩টি এবং গুরুত্বপূর্ণ ভোটকেন্দ্র ২১,৫০৬টি।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন
নির্বাচনকে নিরাপদ ও সুষ্ঠু করতে সারা দেশে মোট ৯ লাখ ১৯ হাজার ২৮০ জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন থাকবে। এর মধ্যে সেনাবাহিনীর সদস্য সংখ্যা ১ লাখ ৩ হাজার। ৫ জেলার ১৭ আসনে থাকবে ৫ হাজার নৌবাহিনীর সদস্য। বিমানবাহিনীর সদস্য থাকবে সাড়ে ৩ হাজার। বিজিবির থাকবে ৩৭ হাজার ৪৫৩ জন। কোস্টগার্ড থাকবে ৩ হাজার ৫৮৫ জন। পুলিশের সদস্য থাকবে ১ লাখ ৮৭ হাজার ৬০৩ জন। র্যাব থাকবে ৯ হাজার ৩৪৯ জন। আনসার থাকবে ৫ লাখ ৬৭ হাজার ৮৬৮ জন। বিএনসিসির সদস্য থাকবে ১ হাজার ৯২২ জন।
এদিকে, বুধবার নির্বাচন ভবনে স্থাপিত খবর পরিবেশনের বুথ পরিদর্শন করে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, “ভোটের পরিবেশ খুব ভালো, উৎসবমুখর। আমরা পরিকল্পিতভাবে কাজ করছি। আশা করছি ভোটের ফলাফল দ্রুত প্রকাশ করা যাবে।”
রিপোর্টারের নাম 























