বাংলাদেশের জনগণ যাকে নির্বাচিত করবে, তাদের সঙ্গেই কাজ করবে যুক্তরাষ্ট্র – এমন দ্ব্যর্থহীন বার্তা দিয়েছেন ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন। মঙ্গলবার একটি আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি এই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন। একইসাথে দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন মার্কিন এই কূটনীতিক, যা বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচন এবং ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। এর আগে, ২০২৪ সালের আগস্টে তরুণদের নেতৃত্বে এক গণঅভ্যুত্থানে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর ভারতের প্রভাব কিছুটা কমে আসে এবং বাংলাদেশে চীনের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। এই নির্বাচনে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে রয়েছে সাবেক দুই রাজনৈতিক মিত্র—বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। জনমত জরিপে বিএনপি কিছুটা এগিয়ে থাকার ইঙ্গিত মিলেছে।
মার্কিন রাষ্ট্রদূত ক্রিস্টেনসেন জানান, দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক অঙ্গনে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র উদ্বিগ্ন। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশের পরবর্তী সরকারকে চীনা সামরিক সরঞ্জামের বিকল্প হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের উন্নত প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম প্রস্তাব করার পরিকল্পনা রয়েছে ওয়াশিংটনের। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত কোনো তথ্য তিনি দেননি।
সম্প্রতি চীন বাংলাদেশের সঙ্গে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, যার আওতায় ভারত সীমান্তের কাছে একটি ড্রোন কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া পাকিস্তান-বাংলাদেশ যৌথভাবে চীনের তৈরি জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়েও আলোচনা চলছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, বাংলাদেশ-চীন সহযোগিতা কৌশলগত অংশীদারত্বের ভিত্তিতে পরিচালিত এবং এটি কোনো তৃতীয় পক্ষের বিরুদ্ধে নয়। বেইজিং আরও স্পষ্ট করে বলেছে যে, এই সম্পর্কে বাইরের কোনো হস্তক্ষেপ মেনে নেওয়া হবে না।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ইতিবাচক সম্পর্ক দেখতে আগ্রহী, যা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করে যুক্তরাষ্ট্র। রাষ্ট্রদূত ক্রিস্টেনসেনের মতে, শেখ হাসিনার বিদায়ের পর ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্কের টানাপোড়েন ভিসা কার্যক্রম ও ক্রীড়া ক্ষেত্রসহ বিভিন্ন পর্যায়ে প্রভাব ফেলেছে।
বাণিজ্য কূটনীতিকে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করে রাষ্ট্রদূত বলেন, অনেক মার্কিন প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে বিনিয়োগের উজ্জ্বল সম্ভাবনা দেখছে। তবে নতুন সরকারকে ক্ষমতায় এসেই বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার সুস্পষ্ট বার্তা দিতে হবে। তিনি আরও বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যে অগ্রগতি হয়েছে, তা এগিয়ে নিতে এবং বাণিজ্য, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সম্পর্ক আরও জোরদার করতে ওয়াশিংটন নতুন সরকারের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী।
যদিও শেভরনের মতো কিছু প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে কার্যক্রম চালাচ্ছে, অন্যান্য বড় মার্কিন প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতি এখনো সীমিত। উচ্চ করহার এবং মুনাফা দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার জটিলতা বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বড় বাধা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশে এখনো স্টারবাকস বা ম্যাকডোনাল্ডসের মতো বিশ্বখ্যাত চেইনগুলোর কোনো শাখা নেই।
বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর প্রসঙ্গে রাষ্ট্রদূত ক্রিস্টেনসেন জানান, মানবিক সহায়তায় যুক্তরাষ্ট্রই সবচেয়ে বড় দাতা দেশ। সম্প্রতি জাতিসংঘের সঙ্গে ২০০ কোটি ডলারের একটি বৈশ্বিক তহবিল চুক্তি সই হয়েছে, যা বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে সহায়তার কার্যকারিতা বাড়াতে সাহায্য করবে। তিনি আন্তর্জাতিক অংশীদারদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, কারণ রোহিঙ্গা সংকটের মতো বিশাল মানবিক দায়িত্ব একা যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়। সম্প্রতি অর্থসংকটের কারণে রোহিঙ্গাদের খাদ্য রেশন কমানো এবং কিছু শিক্ষা কার্যক্রম স্থগিত করার বিষয়টিও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
রিপোর্টারের নাম 























