ঢাকা ০৮:০৩ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৩ মার্চ ২০২৬

মানবিকতার ডাকে সাড়া দিয়ে গুলিবিদ্ধ, চিকিৎসক দিলেন নতুন জীবন

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৩:৩৭:১৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ১১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৫ বার পড়া হয়েছে

রাজধানীর উত্তাল দিনগুলোতে যখন চারদিকে কেবল আন্দোলন আর সংঘাত, তখন মোহাম্মদ উল্ল্যাহ নামের এক তরুণ মানবতার ডাকে সাড়া দিতে রাস্তায় নেমেছিলেন। মীর মুগ্ধের মতো তিনিও আহতদের পাশে দাঁড়াতে, তাদের তৃষ্ণা মেটাতে ছুটে গিয়েছিলেন। কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাসে, দ্বিতীয়বার পানির বোতল আনতে উপরে ওঠার মুহূর্তে বাসার সামনেই তিনি গুলিবিদ্ধ হন। ঊরুর মাঝ বরাবর হওয়া এই আঘাতটি কয়েক ইঞ্চি এদিক-ওদিক হলেই হয়তো তাকেও শহীদের তালিকায় খুঁজতে হতো।

জ্ঞান ফেরার পর মোহাম্মদ উল্ল্যাহ নিজেকে এক হাসপাতালের বিছানায় আবিষ্কার করেন। চিকিৎসা চলার পাশাপাশি শুনতে হয় প্রশ্ন, “আন্দোলনে নেমেছিলে কেন?” তার মনে তখন একটাই প্রশ্ন, তৃষ্ণার্ত মানুষকে পানি দেওয়া কি তবে অপরাধ? সেদিনের রাজধানীর পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। যেকোনো আহত আন্দোলনকারীকে সন্দেহের চোখে দেখা হতো, চলতো জিজ্ঞাসাবাদ ও হেনস্তা। একের পর এক হাসপাতাল তাকে ফিরিয়ে দেয়। চার বোনের একমাত্র ভাই, গুলিবিদ্ধ অবস্থায় ঢাকা শহরের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত ছুটে বেড়ান তিনি। বাড়িতে তখন কেবলই ভয়। যদি কেউ জেনে যায় যে তিনি আন্দোলনে আহত, তবে পুরো পরিবারকেই হয়তো ভোগান্তির শিকার হতে হবে।

এই চরম অনিশ্চয়তা ও ভীতিকর পরিস্থিতিতে ইনসাফ বারাকাহ কিডনি অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতালের অতিরিক্ত ম্যানেজিং ডিরেক্টর মরিয়া হয়ে যোগাযোগ করেন তার সকল অধ্যাপক ও কনসালট্যান্টদের সাথে। তিনি অনুরোধ করেন, “একটি ছেলে গুলিবিদ্ধ, অপারেশনটা কি কেউ করবেন?” রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় কেউই এগিয়ে আসেননি। শেষ পর্যন্ত, গভীর রাতে সেই দায়িত্ব এসে পড়ে এক চিকিৎসকের কাঁধে।

হাসপাতালে পৌঁছেই তিনি ছুটে যান অপারেশন থিয়েটারে। রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে তিনি অত্যন্ত সতর্কতার সাথে মোহাম্মদ উল্ল্যাহর ঊরুর হাড়ের পাশ থেকে গুলিটি বের করেন, যেখানে মিশে আছে নার্ভ, আর্টারি এবং জীবনের নরম সুতো। সেই গুলি শুধু ধাতু ছিল না, বরং ছিল ভয়, অন্যায় আর অস্থির সময়ের প্রতীক।

দুই সপ্তাহ পর, যখন মোহাম্মদ উল্ল্যাহ ড্রেসিংয়ের জন্য আবার আসেন, তখন তার ক্ষতচিহ্নগুলো শুকিয়ে গেলেও চোখে ছিল এক অদ্ভুত আলো। লাজুক কণ্ঠে তিনি বলেন, “স্যার, একটা ছবি তুলতে চাই। আপনার সাথে একটা ছবি থাকবে, এটা আমার জীবনের স্বপ্ন।” চিকিৎসক সেই স্বপ্ন ভাঙেননি। কারণ তিনিও অনুভব করেছিলেন, এমন এক সাহসী তরুণের সাথে একটি ছবি জীবনের এক অমূল্য প্রাপ্তি।

আজ সেই ছবিটি দেখলে মনে হয়, এ শুধু এক চিকিৎসক আর রোগীর ছবি নয়। এ যেন দুই সময়ের দুই নায়কের গল্প। একজন রাস্তায় পানি দিতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়েছেন, অন্যজন গভীর রাতে নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সেই গুলি বের করে তাকে নতুন জীবন দিয়েছেন। জুলাইয়ের এই আন্দোলন কেবল রাজনীতি ছিল না, এটি ছিল মানবিকতা, সাহস আর একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর এক অসামান্য দৃষ্টান্ত। মীর মুগ্ধ শহীদ হয়ে ইতিহাস হয়ে গেলেও, মোহাম্মদ উল্ল্যাহ বেঁচে থাকলেন সময়ের এক জীবন্ত সাক্ষী হয়ে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

মানবিকতার ডাকে সাড়া দিয়ে গুলিবিদ্ধ, চিকিৎসক দিলেন নতুন জীবন

আপডেট সময় : ০৩:৩৭:১৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ১১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

রাজধানীর উত্তাল দিনগুলোতে যখন চারদিকে কেবল আন্দোলন আর সংঘাত, তখন মোহাম্মদ উল্ল্যাহ নামের এক তরুণ মানবতার ডাকে সাড়া দিতে রাস্তায় নেমেছিলেন। মীর মুগ্ধের মতো তিনিও আহতদের পাশে দাঁড়াতে, তাদের তৃষ্ণা মেটাতে ছুটে গিয়েছিলেন। কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাসে, দ্বিতীয়বার পানির বোতল আনতে উপরে ওঠার মুহূর্তে বাসার সামনেই তিনি গুলিবিদ্ধ হন। ঊরুর মাঝ বরাবর হওয়া এই আঘাতটি কয়েক ইঞ্চি এদিক-ওদিক হলেই হয়তো তাকেও শহীদের তালিকায় খুঁজতে হতো।

জ্ঞান ফেরার পর মোহাম্মদ উল্ল্যাহ নিজেকে এক হাসপাতালের বিছানায় আবিষ্কার করেন। চিকিৎসা চলার পাশাপাশি শুনতে হয় প্রশ্ন, “আন্দোলনে নেমেছিলে কেন?” তার মনে তখন একটাই প্রশ্ন, তৃষ্ণার্ত মানুষকে পানি দেওয়া কি তবে অপরাধ? সেদিনের রাজধানীর পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। যেকোনো আহত আন্দোলনকারীকে সন্দেহের চোখে দেখা হতো, চলতো জিজ্ঞাসাবাদ ও হেনস্তা। একের পর এক হাসপাতাল তাকে ফিরিয়ে দেয়। চার বোনের একমাত্র ভাই, গুলিবিদ্ধ অবস্থায় ঢাকা শহরের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত ছুটে বেড়ান তিনি। বাড়িতে তখন কেবলই ভয়। যদি কেউ জেনে যায় যে তিনি আন্দোলনে আহত, তবে পুরো পরিবারকেই হয়তো ভোগান্তির শিকার হতে হবে।

এই চরম অনিশ্চয়তা ও ভীতিকর পরিস্থিতিতে ইনসাফ বারাকাহ কিডনি অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতালের অতিরিক্ত ম্যানেজিং ডিরেক্টর মরিয়া হয়ে যোগাযোগ করেন তার সকল অধ্যাপক ও কনসালট্যান্টদের সাথে। তিনি অনুরোধ করেন, “একটি ছেলে গুলিবিদ্ধ, অপারেশনটা কি কেউ করবেন?” রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় কেউই এগিয়ে আসেননি। শেষ পর্যন্ত, গভীর রাতে সেই দায়িত্ব এসে পড়ে এক চিকিৎসকের কাঁধে।

হাসপাতালে পৌঁছেই তিনি ছুটে যান অপারেশন থিয়েটারে। রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে তিনি অত্যন্ত সতর্কতার সাথে মোহাম্মদ উল্ল্যাহর ঊরুর হাড়ের পাশ থেকে গুলিটি বের করেন, যেখানে মিশে আছে নার্ভ, আর্টারি এবং জীবনের নরম সুতো। সেই গুলি শুধু ধাতু ছিল না, বরং ছিল ভয়, অন্যায় আর অস্থির সময়ের প্রতীক।

দুই সপ্তাহ পর, যখন মোহাম্মদ উল্ল্যাহ ড্রেসিংয়ের জন্য আবার আসেন, তখন তার ক্ষতচিহ্নগুলো শুকিয়ে গেলেও চোখে ছিল এক অদ্ভুত আলো। লাজুক কণ্ঠে তিনি বলেন, “স্যার, একটা ছবি তুলতে চাই। আপনার সাথে একটা ছবি থাকবে, এটা আমার জীবনের স্বপ্ন।” চিকিৎসক সেই স্বপ্ন ভাঙেননি। কারণ তিনিও অনুভব করেছিলেন, এমন এক সাহসী তরুণের সাথে একটি ছবি জীবনের এক অমূল্য প্রাপ্তি।

আজ সেই ছবিটি দেখলে মনে হয়, এ শুধু এক চিকিৎসক আর রোগীর ছবি নয়। এ যেন দুই সময়ের দুই নায়কের গল্প। একজন রাস্তায় পানি দিতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়েছেন, অন্যজন গভীর রাতে নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সেই গুলি বের করে তাকে নতুন জীবন দিয়েছেন। জুলাইয়ের এই আন্দোলন কেবল রাজনীতি ছিল না, এটি ছিল মানবিকতা, সাহস আর একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর এক অসামান্য দৃষ্টান্ত। মীর মুগ্ধ শহীদ হয়ে ইতিহাস হয়ে গেলেও, মোহাম্মদ উল্ল্যাহ বেঁচে থাকলেন সময়ের এক জীবন্ত সাক্ষী হয়ে।