ঢাকা ০৯:৪১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

ভোটের দিন হোক নতুন বাংলাদেশের জন্মদিন’: ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দেশবাসীকে ড. ইউনূসের আহ্বান

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:২৪:১৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ২০ বার পড়া হয়েছে

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আয়োজিত গণভোটের প্রাক্কালে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়েছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যা ৭টায় বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বেতারে সরাসরি সম্প্রচারিত এই ভাষণে তিনি দেশবাসীকে নির্ভয়ে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগের উদাত্ত আহ্বান জানান। প্রধান উপদেষ্টা এই নির্বাচনকে বাংলাদেশের ইতিহাসে এক ‘ভবিষ্যৎনির্ধারক মুহূর্ত’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

ভাষণের শুরুতেই ড. ইউনূস মহান মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সকল শহিদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। তিনি বলেন, জুলাইয়ের বীর যোদ্ধাদের আত্মত্যাগের বিনিময়েই আজ দেশ এক গণতান্ত্রিক উত্তরণের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। এবারের নির্বাচনকে কেবল একটি রুটিন নির্বাচন নয়, বরং দীর্ঘদিনের বৈষম্য ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে সাংবিধানিক প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে বর্ণনা করেন তিনি।

নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, এবারের প্রচার-প্রচারণা পূর্বের যেকোনো সময়ের চেয়ে শান্তিপূর্ণ ছিল। রাজনৈতিক দলগুলোর সংযম ও সাধারণ মানুষের সচেতনতা এই পরিবেশ তৈরিতে সহায়তা করেছে। তবে নির্বাচনী সহিংসতায় প্রাণহানির ঘটনায় গভীর দুঃখ প্রকাশ করে তিনি বলেন, গণতন্ত্রের চর্চায় একটি প্রাণ ঝরে যাওয়াও কোনো সভ্য রাষ্ট্রের জন্য গ্রহণযোগ্য নয়।

এবারের নির্বাচনের বিশেষত্ব তুলে ধরে তিনি জানান, নির্বাচনে মোট ৫১টি রাজনৈতিক দল অংশ নিচ্ছে, যা এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ। দুই হাজারের বেশি প্রার্থীর এই অংশগ্রহণ গণতন্ত্রের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। বিশেষ করে গত ১৭ বছর যারা ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত ছিলেন, সেই তরুণ প্রজন্ম ও নারীদের প্রতি তিনি বিশেষ আহ্বান জানান। তিনি বলেন, “আপনার একটি ভোট ১৭ বছরের নীরবতা ও ফ্যাসিবাদের জবাব দেবে। ভয়কে জয় করে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে নতুন বাংলাদেশের কারিগর হোন।”

নির্বাচনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার সর্বোচ্চ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে বলে দেশবাসীকে আশ্বস্ত করেন ড. ইউনূস। তিনি জানান, এবার রেকর্ডসংখ্যক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দিয়ে সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। এছাড়া স্বচ্ছতা বজায় রাখতে সারাদেশে সিসি ক্যামেরা, বডি ওর্ন ক্যামেরা এবং নজরদারিতে ড্রোন ও ডগ স্কোয়াড ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রথমবারের মতো প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভোটাধিকার এবং পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে সরকারি কর্মকর্তা ও কারাবন্দিদের ভোট দেওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করা হয়েছে।

‘জুলাই জাতীয় সনদ’ ও গণভোট প্রসঙ্গে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ৩০টিরও বেশি রাজনৈতিক দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে এই সনদ তৈরি করা হয়েছে, যা রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ সংস্কারের রূপরেখা। এই সনদের মাধ্যমে রাষ্ট্রব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের যে অঙ্গীকার করা হয়েছে, তার চূড়ান্ত বৈধতা দিতেই গণভোটের আয়োজন। তিনি বলেন, “জনগণই রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি। আপনাদের সিদ্ধান্তই ঠিক করে দেবে আগামী প্রজন্মের বাংলাদেশ কেমন হবে।”

ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে ছড়িয়ে পড়া গুজবের কড়া সমালোচনা করে ড. ইউনূস স্পষ্ট করে বলেন, “বর্তমান সরকার নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে দ্রুততম সময়ে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিতে বদ্ধপরিকর। আমরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি বিজয়ী সরকারের কাছে দায়িত্ব অর্পণ করে নিজ নিজ কাজে ফিরে যাওয়ার জন্য।”

ভাষণের শেষ পর্যায়ে প্রধান উপদেষ্টা দেশবাসীকে উৎসবমুখর পরিবেশে সপরিবারে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার অনুরোধ জানান। তিনি বলেন, “দেশের চাবি এখন আপনাদের হাতে। ব্যালটের মাধ্যমে সেই চাবি সঠিকভাবে ব্যবহার করুন। এবারের ভোটের দিনটিই হোক নতুন বাংলাদেশের জন্মদিন।” তিনি রাজনৈতিক দলগুলোকে তাদের নেতা-কর্মীদের শান্ত ও সুশৃঙ্খল থাকার নির্দেশ দিতে অনুরোধ করেন এবং যেকোনো অপপ্রচার বা গুজবে কান না দেওয়ার আহ্বান জানান।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

কুকুরের তাণ্ডবে নীলফামারীতে ১৪ জন আহত, ভ্যাকসিন সংকটে ভোগান্তি চরমে

ভোটের দিন হোক নতুন বাংলাদেশের জন্মদিন’: ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দেশবাসীকে ড. ইউনূসের আহ্বান

আপডেট সময় : ০৯:২৪:১৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আয়োজিত গণভোটের প্রাক্কালে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়েছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যা ৭টায় বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বেতারে সরাসরি সম্প্রচারিত এই ভাষণে তিনি দেশবাসীকে নির্ভয়ে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগের উদাত্ত আহ্বান জানান। প্রধান উপদেষ্টা এই নির্বাচনকে বাংলাদেশের ইতিহাসে এক ‘ভবিষ্যৎনির্ধারক মুহূর্ত’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

ভাষণের শুরুতেই ড. ইউনূস মহান মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সকল শহিদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। তিনি বলেন, জুলাইয়ের বীর যোদ্ধাদের আত্মত্যাগের বিনিময়েই আজ দেশ এক গণতান্ত্রিক উত্তরণের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। এবারের নির্বাচনকে কেবল একটি রুটিন নির্বাচন নয়, বরং দীর্ঘদিনের বৈষম্য ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে সাংবিধানিক প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে বর্ণনা করেন তিনি।

নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, এবারের প্রচার-প্রচারণা পূর্বের যেকোনো সময়ের চেয়ে শান্তিপূর্ণ ছিল। রাজনৈতিক দলগুলোর সংযম ও সাধারণ মানুষের সচেতনতা এই পরিবেশ তৈরিতে সহায়তা করেছে। তবে নির্বাচনী সহিংসতায় প্রাণহানির ঘটনায় গভীর দুঃখ প্রকাশ করে তিনি বলেন, গণতন্ত্রের চর্চায় একটি প্রাণ ঝরে যাওয়াও কোনো সভ্য রাষ্ট্রের জন্য গ্রহণযোগ্য নয়।

এবারের নির্বাচনের বিশেষত্ব তুলে ধরে তিনি জানান, নির্বাচনে মোট ৫১টি রাজনৈতিক দল অংশ নিচ্ছে, যা এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ। দুই হাজারের বেশি প্রার্থীর এই অংশগ্রহণ গণতন্ত্রের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। বিশেষ করে গত ১৭ বছর যারা ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত ছিলেন, সেই তরুণ প্রজন্ম ও নারীদের প্রতি তিনি বিশেষ আহ্বান জানান। তিনি বলেন, “আপনার একটি ভোট ১৭ বছরের নীরবতা ও ফ্যাসিবাদের জবাব দেবে। ভয়কে জয় করে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে নতুন বাংলাদেশের কারিগর হোন।”

নির্বাচনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার সর্বোচ্চ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে বলে দেশবাসীকে আশ্বস্ত করেন ড. ইউনূস। তিনি জানান, এবার রেকর্ডসংখ্যক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দিয়ে সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। এছাড়া স্বচ্ছতা বজায় রাখতে সারাদেশে সিসি ক্যামেরা, বডি ওর্ন ক্যামেরা এবং নজরদারিতে ড্রোন ও ডগ স্কোয়াড ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রথমবারের মতো প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভোটাধিকার এবং পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে সরকারি কর্মকর্তা ও কারাবন্দিদের ভোট দেওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করা হয়েছে।

‘জুলাই জাতীয় সনদ’ ও গণভোট প্রসঙ্গে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ৩০টিরও বেশি রাজনৈতিক দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে এই সনদ তৈরি করা হয়েছে, যা রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ সংস্কারের রূপরেখা। এই সনদের মাধ্যমে রাষ্ট্রব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের যে অঙ্গীকার করা হয়েছে, তার চূড়ান্ত বৈধতা দিতেই গণভোটের আয়োজন। তিনি বলেন, “জনগণই রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি। আপনাদের সিদ্ধান্তই ঠিক করে দেবে আগামী প্রজন্মের বাংলাদেশ কেমন হবে।”

ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে ছড়িয়ে পড়া গুজবের কড়া সমালোচনা করে ড. ইউনূস স্পষ্ট করে বলেন, “বর্তমান সরকার নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে দ্রুততম সময়ে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিতে বদ্ধপরিকর। আমরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি বিজয়ী সরকারের কাছে দায়িত্ব অর্পণ করে নিজ নিজ কাজে ফিরে যাওয়ার জন্য।”

ভাষণের শেষ পর্যায়ে প্রধান উপদেষ্টা দেশবাসীকে উৎসবমুখর পরিবেশে সপরিবারে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার অনুরোধ জানান। তিনি বলেন, “দেশের চাবি এখন আপনাদের হাতে। ব্যালটের মাধ্যমে সেই চাবি সঠিকভাবে ব্যবহার করুন। এবারের ভোটের দিনটিই হোক নতুন বাংলাদেশের জন্মদিন।” তিনি রাজনৈতিক দলগুলোকে তাদের নেতা-কর্মীদের শান্ত ও সুশৃঙ্খল থাকার নির্দেশ দিতে অনুরোধ করেন এবং যেকোনো অপপ্রচার বা গুজবে কান না দেওয়ার আহ্বান জানান।