দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ থাইল্যান্ডের সাধারণ নির্বাচনে সব হিসাব-নিকাশ পাল্টে দিয়ে বড় জয়ের পথে এগিয়ে যাচ্ছে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী আনুতিন চার্নভিরাকুলের দল ভূমজাইথাই। নির্বাচনের আগে বিভিন্ন জনমত জরিপে সংস্কারপন্থি পিপলস পার্টির জয়ের জোরালো সম্ভাবনা দেখা দিলেও, চূড়ান্ত ফলাফলে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। আনুতিনের দল প্রায় ১৯০টির বেশি আসন পেতে যাচ্ছে, যা দেশটিতে নতুন জোট সরকার গঠনের পথ প্রশস্ত করেছে। ভূমজাইথাইয়ের এই অভাবনীয় সাফল্য থাইল্যান্ডের তরুণ ও সংস্কারপন্থি ভোটারদের জন্য বড় একটি ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, থাইল্যান্ডের বিশেষ ও মিশ্র ভোটব্যবস্থাই মূলত এই ফলের পেছনে প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে। এবারের নির্বাচনে ভোটাররা দুটি পৃথক ব্যালটে ভোট দিয়েছেন—একটি নিজ এলাকার প্রার্থীর জন্য এবং অন্যটি পছন্দের রাজনৈতিক দলের জন্য। জাতীয় পর্যায়ের দলীয় তালিকার (পার্টি লিস্ট) ভোটে পিপলস পার্টি প্রায় এক কোটি ভোট পেয়ে সবার উপরে থাকলেও, ভূমজাইথাই পেয়েছে প্রায় ৬০ লাখ ভোট। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, ২০২৩ সালের নির্বাচনের তুলনায় এবার পিপলস পার্টির জনসমর্থন প্রায় ৪০ লাখ কমেছে।
থাইল্যান্ডের পার্লামেন্টের মোট ৫০০টি আসনের মধ্যে মাত্র ২০ শতাংশ নির্ধারিত হয় দলীয় তালিকার ভোটের ভিত্তিতে। বাকি ৮০ শতাংশ বা ৪০০টি আসন সরাসরি স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচনের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়। এখানেই বাজিমাত করেছে ভূমজাইথাই। পিপলস পার্টি মূলত শহরকেন্দ্রিক ও নতুন দল হওয়ায় গ্রামাঞ্চলে তাদের সাংগঠনিক ভিত্তি এখনো দুর্বল। অন্যদিকে, ভূমজাইথাই দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় প্রভাবশালী নেতা ও জনপ্রিয় ব্যক্তিদের নিজেদের দলে ভিড়িয়ে তৃণমূল পর্যায়ে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। ২০১৯ সালে মাত্র ৫১টি আসন পাওয়া একটি দলকে আনুতিন তার রাজনৈতিক কৌশলে আজ জাতীয় পর্যায়ের প্রধান বিজয়ী শক্তিতে পরিণত করেছেন।
সংস্কারপন্থিদের এই পিছিয়ে পড়ার পেছনে আইনি জটিলতা ও প্রচারণার সীমাবদ্ধতাকেও দায়ী করা হচ্ছে। ২০২৩ সালে সামরিক শাসনের অবসানের যে তীব্র আকাঙ্ক্ষা জনমনে ছিল, এবার তেমন কোনো সুনির্দিষ্ট ইস্যু ভোটারদের আলোড়িত করতে পারেনি। তদুপরি, রাজপরিবার অবমাননা আইন সংশোধনের দাবি তোলায় আইনি মারপ্যাঁচে সংস্কারপন্থিদের আগের দল ‘মুভ ফরোয়ার্ড’ ভেঙে দেওয়া হয় এবং শীর্ষ নেতাদের রাজনীতিতে নিষিদ্ধ করা হয়। ফলে আইনি খড়গের ভয়ে এবার তারা বড় কোনো সংস্কারমূলক প্রচারণায় নামতে পারেনি, যা তাদের জনপ্রিয়তায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
বিপরীতে, প্রধানমন্ত্রী আনুতিন চার্নভিরাকুল রক্ষণশীল ভোটারদের একটি বড় অংশকে নিজের পক্ষে টানতে সক্ষম হয়েছেন। কঠোর জাতীয়তাবাদী অবস্থান, সেনাবাহিনীর প্রতি নমনীয়তা এবং রাজতন্ত্রের প্রতি অবিচল আনুগত্য প্রকাশের মাধ্যমে তিনি থাইল্যান্ডের রক্ষণশীল রাজনীতির প্রধান মুখ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। সব মিলিয়ে, এই নির্বাচনের ফলাফল থাইল্যান্ডের আগামীর রাজনীতিতে এক নতুন ও অপ্রত্যাশিত মোড় নিয়ে এসেছে।
রিপোর্টারের নাম 






















