ঢাকা ০৬:৫৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৩ মার্চ ২০২৬

নির্বাচন কমিশনের ফল ঘোষণা প্রক্রিয়া: স্বচ্ছতা নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১০:৩২:০০ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১০ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৫ বার পড়া হয়েছে

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার জন্য নির্বাচন কমিশন (ইসি) একগুচ্ছ প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর জোর দিয়ে কমিশন জানিয়েছে, তিন স্তরের নিবিড় যাচাই-বাছাই শেষে চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা করা হবে। তবে এই প্রস্তুতি এবং ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে নির্বাচন বিশ্লেষক এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা প্রশ্ন তুলেছেন।

নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ফলাফল ঘোষণার জন্য নির্বাচন ভবনের খোলা চত্বরে একটি বিশাল ডিজিটাল মনিটরিং স্ক্রিন স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়াও গণমাধ্যমের জন্য ৮৭টি বুথ প্রস্তুত করা হয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ফলাফল আদান-প্রদানের জন্য একটি সম্পূর্ণ ইন্টারনেটবিহীন ‘ক্লোজড নেটওয়ার্ক’ ব্যবস্থা চালু রাখা হচ্ছে। নির্বাচন কমিশন এই প্রক্রিয়াকে সর্বোচ্চ নিরাপদ বলে দাবি করছে।

এ বিষয়ে ইসির অতিরিক্ত সচিব কে এম আলী নেওয়াজ জানান, এবার ফলাফল কোনোভাবেই হ্যাক হওয়ার সুযোগ নেই, কারণ এটি ইন্টারনেট বা অনলাইন ব্যবস্থার বাইরে থাকবে। কমিশনের নিজস্ব সুরক্ষিত ভিপিএন (ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক) এর মাধ্যমে ফলাফল আদান-প্রদান করা হবে। তবে নির্বাচন বিশ্লেষকদের মতে, ইন্টারনেট সংযোগ না থাকলেও অভ্যন্তরীণ সিস্টেমের স্বচ্ছতা, অডিটযোগ্যতা এবং মানবীয় ত্রুটির সম্ভাবনা বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে যেতে পারে।

নির্বাচন ভবনেই কেন্দ্রীয় ফলাফল ঘোষণা কেন্দ্র

নির্বাচন ভবনকে কেন্দ্র করেই ফলাফল ঘোষণার মূল কার্যক্রম পরিচালিত হবে। সেখানে স্থাপিত তিনটি বড় ডিজিটাল মনিটরিং স্ক্রিনের পাশাপাশি দর্শনার্থী ও অতিথিদের সুবিধার্থে ভবনের ডান ও বাম পাশে আরও দুটি বিশাল স্ক্রিন বসানো হচ্ছে।

রিটার্নিং কর্মকর্তারা বেসরকারিভাবে ফলাফল ঘোষণা করার পর সেই তথ্য দ্রুত ডেটা সেন্টারে পৌঁছে যাবে। নির্বাচন কমিশন কোনো আসনের অন্তত ১০০টি কেন্দ্রের মধ্যে পাঁচটি কেন্দ্রের ফলাফল হাতে পাওয়ার পর তা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করবে। একই সঙ্গে ডিজিটাল ডিসপ্লে বোর্ডে মোট ফলাফল এবং গণভোটের ফল আলাদাভাবে প্রদর্শনের ব্যবস্থা থাকবে।

ফলাফল যাচাইয়ের সুনির্দিষ্ট ধাপ

নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, ভোটকেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসাররা কেন্দ্রের ফলাফল সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কাছে পাঠাবেন। সেখানে একটি বিশেষ ড্যাশবোর্ড সিস্টেমের মাধ্যমে এই তথ্য যাচাই করা হবে। প্রিসাইডিং অফিসার ও সহকারী রিটার্নিং অফিসার উভয়েই তথ্যের যথার্থতা নিশ্চিত করার পর তা রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে পাঠানো হবে। এই যাচাইকৃত তথ্যের ভিত্তিতেই নির্বাচন কমিশন কেন্দ্রীয়ভাবে চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা করবে।

ফলাফল ঘোষণায় কেন্দ্রীয় টিম

ফলাফল ঘোষণার জন্য একটি তিন সদস্যের কেন্দ্রীয় টিম গঠন করা হয়েছে। এই টিমে রয়েছেন ইসির অতিরিক্ত সচিব কে এম আলী নেওয়াজ, যুগ্ম সচিব ডিএম আতিকুর রহমান এবং পরিচালক সাইফুল ইসলাম। পুরো প্রক্রিয়ার সার্বিক তত্ত্বাবধানের দায়িত্বে থাকবেন ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ।

ভোট পড়ার হার জানানো হবে পর্যায়ক্রমে

নির্বাচন সূত্রে জানা গেছে, ভোটগ্রহণ চলাকালীন প্রতি দুই ঘণ্টা অন্তর ভোট পড়ার হার গণমাধ্যমের মাধ্যমে জানানো হবে। এই তথ্য জাতির উদ্দেশে জানাবেন ইসির সিনিয়র সচিব। ভোটগ্রহণ শেষে চূড়ান্ত ভোটের হার প্রকাশ করা হবে।

নতুন সফটওয়্যার ও ডেটা ট্রান্সফার পদ্ধতি

ভোটকেন্দ্র থেকে রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় পর্যন্ত ফলাফল বার্তা শিটের মাধ্যমে ইএমএস (ইলেকশন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম) সফটওয়্যার ব্যবহার করে আংশিক বা পূর্ণ ফলাফল পাঠানো হবে। প্রিসাইডিং অফিসাররা ভোটকেন্দ্রে ফলাফল টানিয়ে রাখবেন এবং এর একটি কপি প্রার্থীর এজেন্টকে দেবেন। অন্য একটি কপি ডাকযোগে পাঠানো হবে এবং মূল কপি সরাসরি রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে পাঠানো হবে। তবে এবার ভোটকেন্দ্র থেকে সরাসরি নির্বাচন কমিশনে কোনো ফলাফল যাবে না; সকল ফলাফল রিটার্নিং কর্মকর্তাদের মাধ্যমেই কমিশনে পৌঁছাবে।

পূর্ববর্তী নির্বাচনে ব্যবহৃত ‘কপোত’ অ্যাপের পরিবর্তে এবার ইএমএস-এর একটি বিশেষ মডিউল ‘আরএমএস’ (রেজাল্ট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম) আলোচনায় রয়েছে। এটি একটি ডেটা ট্রান্সফারিং সিস্টেম, যা মাঠপর্যায়ের ফলাফল দ্রুত প্রধান কার্যালয়ে পৌঁছাতে সহায়ক হবে।

ইসি কর্মকর্তারা এই প্রক্রিয়াকে প্রযুক্তিগতভাবে অত্যন্ত নিরাপদ বলে দাবি করছেন। তাদের মতে, এটি ইন্টারনেট বা অনলাইন ব্যবস্থার বাইরে থাকায় বাইরে থেকে হস্তক্ষেপের কোনো সুযোগ নেই এবং এতে ফলাফলের নির্ভুলতা ও গোপনীয়তা নিশ্চিত থাকবে।

তবে, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক অধ্যাপক ড. বদিউল আলম মজুমদার কমিশনের এই পদক্ষেপের সমালোচনা করে বলেছেন, কমিশন যেসব কর্মকাণ্ড করছে তা আত্মঘাতী এবং তাদের এসব কার্যক্রম পক্ষপাতদুষ্ট মনে হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, নির্বাচনকে বিতর্কিত করতেই নির্বাচন কমিশন সরাসরি ভোটকেন্দ্রের দায়িত্বরত প্রিসাইডিং অফিসারের কাছ থেকে ফলাফল না নিয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তার মাধ্যমে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

কাতারে মোসাদের গোপন তৎপরতা: দোহা অস্বীকার করলো অবগত থাকার তথ্য

নির্বাচন কমিশনের ফল ঘোষণা প্রক্রিয়া: স্বচ্ছতা নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ

আপডেট সময় : ১০:৩২:০০ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১০ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার জন্য নির্বাচন কমিশন (ইসি) একগুচ্ছ প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর জোর দিয়ে কমিশন জানিয়েছে, তিন স্তরের নিবিড় যাচাই-বাছাই শেষে চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা করা হবে। তবে এই প্রস্তুতি এবং ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে নির্বাচন বিশ্লেষক এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা প্রশ্ন তুলেছেন।

নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ফলাফল ঘোষণার জন্য নির্বাচন ভবনের খোলা চত্বরে একটি বিশাল ডিজিটাল মনিটরিং স্ক্রিন স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়াও গণমাধ্যমের জন্য ৮৭টি বুথ প্রস্তুত করা হয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ফলাফল আদান-প্রদানের জন্য একটি সম্পূর্ণ ইন্টারনেটবিহীন ‘ক্লোজড নেটওয়ার্ক’ ব্যবস্থা চালু রাখা হচ্ছে। নির্বাচন কমিশন এই প্রক্রিয়াকে সর্বোচ্চ নিরাপদ বলে দাবি করছে।

এ বিষয়ে ইসির অতিরিক্ত সচিব কে এম আলী নেওয়াজ জানান, এবার ফলাফল কোনোভাবেই হ্যাক হওয়ার সুযোগ নেই, কারণ এটি ইন্টারনেট বা অনলাইন ব্যবস্থার বাইরে থাকবে। কমিশনের নিজস্ব সুরক্ষিত ভিপিএন (ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক) এর মাধ্যমে ফলাফল আদান-প্রদান করা হবে। তবে নির্বাচন বিশ্লেষকদের মতে, ইন্টারনেট সংযোগ না থাকলেও অভ্যন্তরীণ সিস্টেমের স্বচ্ছতা, অডিটযোগ্যতা এবং মানবীয় ত্রুটির সম্ভাবনা বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে যেতে পারে।

নির্বাচন ভবনেই কেন্দ্রীয় ফলাফল ঘোষণা কেন্দ্র

নির্বাচন ভবনকে কেন্দ্র করেই ফলাফল ঘোষণার মূল কার্যক্রম পরিচালিত হবে। সেখানে স্থাপিত তিনটি বড় ডিজিটাল মনিটরিং স্ক্রিনের পাশাপাশি দর্শনার্থী ও অতিথিদের সুবিধার্থে ভবনের ডান ও বাম পাশে আরও দুটি বিশাল স্ক্রিন বসানো হচ্ছে।

রিটার্নিং কর্মকর্তারা বেসরকারিভাবে ফলাফল ঘোষণা করার পর সেই তথ্য দ্রুত ডেটা সেন্টারে পৌঁছে যাবে। নির্বাচন কমিশন কোনো আসনের অন্তত ১০০টি কেন্দ্রের মধ্যে পাঁচটি কেন্দ্রের ফলাফল হাতে পাওয়ার পর তা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করবে। একই সঙ্গে ডিজিটাল ডিসপ্লে বোর্ডে মোট ফলাফল এবং গণভোটের ফল আলাদাভাবে প্রদর্শনের ব্যবস্থা থাকবে।

ফলাফল যাচাইয়ের সুনির্দিষ্ট ধাপ

নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, ভোটকেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসাররা কেন্দ্রের ফলাফল সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কাছে পাঠাবেন। সেখানে একটি বিশেষ ড্যাশবোর্ড সিস্টেমের মাধ্যমে এই তথ্য যাচাই করা হবে। প্রিসাইডিং অফিসার ও সহকারী রিটার্নিং অফিসার উভয়েই তথ্যের যথার্থতা নিশ্চিত করার পর তা রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে পাঠানো হবে। এই যাচাইকৃত তথ্যের ভিত্তিতেই নির্বাচন কমিশন কেন্দ্রীয়ভাবে চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা করবে।

ফলাফল ঘোষণায় কেন্দ্রীয় টিম

ফলাফল ঘোষণার জন্য একটি তিন সদস্যের কেন্দ্রীয় টিম গঠন করা হয়েছে। এই টিমে রয়েছেন ইসির অতিরিক্ত সচিব কে এম আলী নেওয়াজ, যুগ্ম সচিব ডিএম আতিকুর রহমান এবং পরিচালক সাইফুল ইসলাম। পুরো প্রক্রিয়ার সার্বিক তত্ত্বাবধানের দায়িত্বে থাকবেন ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ।

ভোট পড়ার হার জানানো হবে পর্যায়ক্রমে

নির্বাচন সূত্রে জানা গেছে, ভোটগ্রহণ চলাকালীন প্রতি দুই ঘণ্টা অন্তর ভোট পড়ার হার গণমাধ্যমের মাধ্যমে জানানো হবে। এই তথ্য জাতির উদ্দেশে জানাবেন ইসির সিনিয়র সচিব। ভোটগ্রহণ শেষে চূড়ান্ত ভোটের হার প্রকাশ করা হবে।

নতুন সফটওয়্যার ও ডেটা ট্রান্সফার পদ্ধতি

ভোটকেন্দ্র থেকে রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় পর্যন্ত ফলাফল বার্তা শিটের মাধ্যমে ইএমএস (ইলেকশন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম) সফটওয়্যার ব্যবহার করে আংশিক বা পূর্ণ ফলাফল পাঠানো হবে। প্রিসাইডিং অফিসাররা ভোটকেন্দ্রে ফলাফল টানিয়ে রাখবেন এবং এর একটি কপি প্রার্থীর এজেন্টকে দেবেন। অন্য একটি কপি ডাকযোগে পাঠানো হবে এবং মূল কপি সরাসরি রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে পাঠানো হবে। তবে এবার ভোটকেন্দ্র থেকে সরাসরি নির্বাচন কমিশনে কোনো ফলাফল যাবে না; সকল ফলাফল রিটার্নিং কর্মকর্তাদের মাধ্যমেই কমিশনে পৌঁছাবে।

পূর্ববর্তী নির্বাচনে ব্যবহৃত ‘কপোত’ অ্যাপের পরিবর্তে এবার ইএমএস-এর একটি বিশেষ মডিউল ‘আরএমএস’ (রেজাল্ট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম) আলোচনায় রয়েছে। এটি একটি ডেটা ট্রান্সফারিং সিস্টেম, যা মাঠপর্যায়ের ফলাফল দ্রুত প্রধান কার্যালয়ে পৌঁছাতে সহায়ক হবে।

ইসি কর্মকর্তারা এই প্রক্রিয়াকে প্রযুক্তিগতভাবে অত্যন্ত নিরাপদ বলে দাবি করছেন। তাদের মতে, এটি ইন্টারনেট বা অনলাইন ব্যবস্থার বাইরে থাকায় বাইরে থেকে হস্তক্ষেপের কোনো সুযোগ নেই এবং এতে ফলাফলের নির্ভুলতা ও গোপনীয়তা নিশ্চিত থাকবে।

তবে, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক অধ্যাপক ড. বদিউল আলম মজুমদার কমিশনের এই পদক্ষেপের সমালোচনা করে বলেছেন, কমিশন যেসব কর্মকাণ্ড করছে তা আত্মঘাতী এবং তাদের এসব কার্যক্রম পক্ষপাতদুষ্ট মনে হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, নির্বাচনকে বিতর্কিত করতেই নির্বাচন কমিশন সরাসরি ভোটকেন্দ্রের দায়িত্বরত প্রিসাইডিং অফিসারের কাছ থেকে ফলাফল না নিয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তার মাধ্যমে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক।