ঢাকা ০২:৫৪ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬

নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে ভোট চাইলেন নাহিদ ইসলাম: আধিপত্যবাদমুক্ত রাষ্ট্রই লক্ষ্য

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:০১:০১ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৩ বার পড়া হয়েছে

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও ঢাকা-১১ আসনের ১১ দলীয় জোটপ্রার্থী নাহিদ ইসলাম ভোটারদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি সকালে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রক্রিয়াকে সফল করতে। তিনি বলেন, ভোটাধিকার রক্ষা, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য জোটের নেতাকর্মীরা ভোটকেন্দ্রে সক্রিয় থাকবেন এবং জনগণের ভোটাধিকার কেউ কেড়ে নিতে পারবে না। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির পর একটি নতুন বাংলাদেশ পাওয়া যাবে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। গতকাল রোববার সন্ধ্যায় বাংলাদেশ টেলিভিশনে জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক বিশেষ ভাষণে তিনি এসব কথা বলেন।

নাহিদ ইসলাম তাঁর ভাষণে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ধারাবাহিকতায় এই নির্বাচনকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে হাজারো ভাইবোনের আত্মত্যাগ, শহীদ পরিবারের আকুতি এবং আহত যোদ্ধাদের বেদনা স্মরণ করে আমাদের এই নির্বাচনে অংশ নিতে হবে।

তিনি জানান, তাঁদের লক্ষ্য পরিবর্তনের রাজনীতি, সংস্কারের রাজনীতি। বাংলাদেশ থেকে দুর্নীতি, বৈষম্য ও আধিপত্যবাদ দূর করে একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করাই তাঁদের মূল উদ্দেশ্য। এই লক্ষ্য পূরণে এনসিপি ও এর ১১ দলীয় জোট ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। এনসিপির ‘শাপলা কলি’ প্রতীকে ৩০ জন প্রার্থী সারা দেশের বিভিন্ন আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তরুণ প্রজন্মকে এই পরিবর্তনের রাজনীতিতে সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

নাহিদ ইসলাম বলেন, গত দেড় বছরে অনেক কিছু অর্জন করতে না পারার হতাশা ও সীমাবদ্ধতা তাঁদের রয়েছে, যা তাঁরা স্বীকার করে নিচ্ছেন। তিনি দেশের মানুষের কাছে আরও একটি সুযোগ চেয়েছেন। তাঁর বিশ্বাস, দেশের মানুষ পরিবর্তন ও সংস্কার চায়। ১২ ফেব্রুয়ারি পরিবর্তনের রাজনীতি নাকি পুরোনো রাজনীতি, তা বেছে নেওয়ার সুযোগ এসেছে। তিনি দৃঢ়ভাবে বলেন, এবারের নির্বাচনে এনসিপিসহ ১১ দলীয় জোট জয়লাভ করলে তাঁরা পরিবর্তনের বাংলাদেশ, ইনসাফের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন।

সাবেক ছাত্রনেতা শরীফ ওসমান হাদিসহ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময়কার খুনিদের বিচার নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, আগামী নির্বাচনের সঙ্গেই গণভোট অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যেখানে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ভোট দিয়ে বাংলাদেশের সংস্কারের ধারা অব্যাহত রাখতে হবে। তিনি সতর্ক করে বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ব্যর্থ হলে ৫ আগস্টের বিপ্লবও ব্যর্থ হবে। তাই ৫ আগস্টের অর্জন ও আকাঙ্ক্ষাকে এগিয়ে নিতে হলে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন অপরিহার্য।

অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত উন্নয়নের রূপরেখা তুলে ধরে নাহিদ ইসলাম বলেন, বঙ্গোপসাগরের সীমানা ঘিরে একটি সুনীল অর্থনীতি গড়ে তোলা হবে এবং জনগণের অভিপ্রায় অনুসারে দেশের ন্যায্য হিস্যা আদায় করা হবে। পরিবেশ ও জলবায়ু রক্ষায় ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উপযোগী বাংলাদেশ গড়া, জলবায়ু উদ্বাস্তুদের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ এবং পরিবেশ দূষণ কমাতে পরিবেশ কর চালুর কথা জানান তিনি।

সাবেক শাসনামলের সমালোচনা করে নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন, বিভিন্ন বাহিনীর ভেতরে গুম, খুন, নির্যাতন, দুর্নীতি ও লুটপাটের সঙ্গে জড়িত সব অপরাধীকে শনাক্ত করে বিচারের আওতায় আনা হবে। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে বিভিন্ন ক্ষেত্রে এই অপরাধীরা অসহযোগিতা করছে এবং তথ্য-আলামত নষ্ট করে তদন্ত প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করছে। গুম বিষয়ক কমিশন এক হাজার ৮৫০টির বেশি অভিযোগ নিয়ে কাজ করছে বলেও তিনি জানান।

ক্ষমতায় এলে সাবেক স্বৈরাচারী শাসকের আমলে লুটপাট ও পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার এবং এর সঙ্গে জড়িত কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে দায়মুক্তি না দেওয়ার ঘোষণা দেন তিনি। তিনি বলেন, চিহ্নিত লুটপাটকারীদের ‘গণশত্রু’ ঘোষণা করে তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে একটি ‘পাবলিক ট্রাস্ট’-এর অধীনে আনার প্রস্তাব করেন। ঘুষ, দুর্নীতি ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটপাটের সংস্কৃতির অবসান ঘটিয়ে অর্থনৈতিক বৈষম্য বিলোপের মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং জনগণের কাছে রাষ্ট্রের সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়াই তাঁদের লক্ষ্য।

পররাষ্ট্রনীতি প্রসঙ্গে নাহিদ ইসলাম বলেন, পূর্ববর্তী শাসকগোষ্ঠীর পররাষ্ট্রনীতি ছিল ভারতের নির্দেশ পালন করা, যা বাংলাদেশকে বৈশ্বিক পরিসরে ভারতের পুতুল রাষ্ট্রে পরিণত করেছিল এবং জাতীয় স্বার্থ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এনসিপি ক্ষমতায় এলে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলা হবে। জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে আত্মমর্যাদাপূর্ণ ও স্বকীয় পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করা হবে। সার্ক পুনরুজ্জীবিত করা এবং আসিয়ানে যোগ দেওয়ার চেষ্টা অব্যাহত থাকবে। মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক উন্নয়ন করা হবে। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ন্যায্যতা ও সহযোগিতা হবে তাঁদের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি।

প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার পুনর্গঠনের ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, বাহিনীর সংখ্যা বাড়ানো নয়, বরং গুণগত মান বৃদ্ধিতে গুরুত্ব দেওয়া হবে। পুরো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও হাই-টেক বাহিনীতে রূপান্তর করা হবে। ১৮ বছরের ঊর্ধ্বে সক্ষম সব তরুণ-তরুণীর জন্য বাধ্যতামূলক সামরিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দেশব্যাপী গণপ্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার কথা বলেন, যা আধিপত্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় প্রতিরোধ সক্ষমতা বাড়াবে এবং দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের বিনিয়োগকৃত অর্থের অপচয় কমাবে।

দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখতে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারী ব্যবসায়ী, রাজনীতিক ও আমলাদের সিন্ডিকেট ভাঙা হবে। চাঁদাবাজ ও মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে পণ্যের অতিরিক্ত মূল্য পরিশোধের প্রবণতা বন্ধ করে ন্যায্যমূল্যের বাজার ব্যবস্থা এবং ওএমএস কর্মসূচি বিস্তৃত করা হবে। প্রতিবেশী বৃহৎ দেশের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে একাধিক বিকল্প উৎস থেকে আমদানি বাড়ানোর মাধ্যমে একটি ন্যায্য, স্বচ্ছ ও জনবান্ধব বাজারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার কথা জানান তিনি।

পুলিশি ব্যবস্থার সংস্কার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অত্যাচার ও জুলুমের কারণে মানুষ পুলিশকে ‘পুলিশ লীগ’ নামে ডাকতে শুরু করেছিল। জুলাই গণঅভ্যুত্থানসহ গত ১৫ বছর ধরে হত্যা, নির্যাতন, জুলুম, মিথ্যা মামলা, দস্যুবৃত্তি ও ঘুষ-দুর্নীতিতে জড়িত পুলিশ কর্মকর্তাদের বিচারের আওতায় আনা হবে। তিনি পুলিশ বাহিনীর নাম পরিবর্তন করে ‘জনসেবক বাহিনী’ বা অন্যকিছু রাখা এবং কেন্দ্রীয় কাঠামো ভেঙে স্থানীয় সরকার পর্যায়ে পুনর্গঠনের প্রস্তাব করেন। এ ক্ষেত্রে উপজেলা পর্যায় থেকে নিয়োগ এবং সেখানে পদায়ন করা হবে এবং সমানসংখ্যক নারী-পুরুষ নিয়োগ পাবে।

নাহিদ ইসলাম বিচার ব্যবস্থার ভেঙে পড়াকে ‘ভয়ংকর অশুভ চর্চা’ উল্লেখ করে বলেন, ন্যায়পরায়ণ, দক্ষ ও শিক্ষিত বিচারক নিয়োগ করে পুরো বিচার ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো হবে। ঘুষ-দুর্নীতি নির্ভর রায় বেচা-কেনার চলমান আয়োজন ভেঙে ফেলা হবে। রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করেন তিনি।

জনপ্রতিনিধি ব্যবস্থাকে কার্যকর করতে উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের নির্বাচিত নেতাদের প্রকৃত ক্ষমতা ও কঠোর জবাবদিহিতার আওতায় আনার কথা বলেন। চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হতে ন্যূনতম স্নাতক পাশের যোগ্যতা বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব করেন। শক্তিশালী কেন্দ্র ভেঙে বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা জনগণের হাতে ছেড়ে দিতে হবে।

সমাজ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশ কখনোই আফগানিস্তান হবে না, বরং মালয়েশিয়া বা তুরস্কের মতো ধর্মানুরাগী উদারনৈতিক সমাজ গড়া হবে। ধর্ম ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক চর্চার জায়গায় থাকবে এবং রাষ্ট্র পরিচালিত হবে আইন, ন্যায়বিচার ও ইনসাফের ভিত্তিতে। প্রত্যেক নাগরিক নিজের বিশ্বাস, সংস্কৃতি ও ব্যক্তিগত পছন্দ অনুযায়ী পোশাক নির্বাচনের পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করবেন।

নাহিদ ইসলাম বলেন, গৃহস্থলে সহিংসতা, যৌন হয়রানিসহ সব ধরনের নারী নির্যাতনের ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হবে। নারী সুরক্ষার ক্ষেত্রে প্রান্ত থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত প্রচলিত আইনগুলোর কঠোর প্রয়োগ এবং নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে জনপ্রতিরোধের সংস্কৃতি গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য আলাদা পরিবহন ব্যবস্থা না রেখে সবাইকে সাধারণ জনপরিবহন ব্যবহারের কথা বলেন তিনি। মন্ত্রী ও সচিবদের সপ্তাহে নির্দিষ্ট দিন জনপরিবহনে চলাচলের মাধ্যমে জনজীবনের বাস্তবতা অনুভব করার নতুন সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করেন।

পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নে আধুনিক বাস সার্ভিস চালুসহ গণপরিবহনে সরকারি বিনিয়োগের অগ্রাধিকার, মানসম্মত পরিবহন নিশ্চিত করা, ছাত্রছাত্রী, প্রতিবন্ধী ও প্রবীণ নাগরিকদের জন্য বিশেষ ছাড় ও সংরক্ষিত আসন নিশ্চিত করার কথা বলেন তিনি। পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি ও কালোবাজারি দমন করে ন্যায্য ভাড়া নিশ্চিত করা এবং টিকিটিং ব্যবস্থাকে স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দেন নাহিদ ইসলাম।

সবশেষে নাহিদ ইসলাম বলেন, এক নতুন স্বপ্ন আর নতুন বাংলাদেশের অভিপ্রায়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে তাঁরা রাজপথে নেমেছিলেন এবং জনগণও তাঁদের সঙ্গে ছিল। তাঁদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফলেই আজ তাঁরা কথা বলতে পারছেন। তিনি বলেন, যদি জনগণ সুযোগ দেয়, তবে তাঁরা এই স্বপ্ন বাস্তবায়নে সক্ষম হবেন।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর শুল্ক আরোপের পরিকল্পনা ইরানের

নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে ভোট চাইলেন নাহিদ ইসলাম: আধিপত্যবাদমুক্ত রাষ্ট্রই লক্ষ্য

আপডেট সময় : ০৯:০১:০১ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও ঢাকা-১১ আসনের ১১ দলীয় জোটপ্রার্থী নাহিদ ইসলাম ভোটারদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি সকালে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রক্রিয়াকে সফল করতে। তিনি বলেন, ভোটাধিকার রক্ষা, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য জোটের নেতাকর্মীরা ভোটকেন্দ্রে সক্রিয় থাকবেন এবং জনগণের ভোটাধিকার কেউ কেড়ে নিতে পারবে না। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির পর একটি নতুন বাংলাদেশ পাওয়া যাবে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। গতকাল রোববার সন্ধ্যায় বাংলাদেশ টেলিভিশনে জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক বিশেষ ভাষণে তিনি এসব কথা বলেন।

নাহিদ ইসলাম তাঁর ভাষণে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ধারাবাহিকতায় এই নির্বাচনকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে হাজারো ভাইবোনের আত্মত্যাগ, শহীদ পরিবারের আকুতি এবং আহত যোদ্ধাদের বেদনা স্মরণ করে আমাদের এই নির্বাচনে অংশ নিতে হবে।

তিনি জানান, তাঁদের লক্ষ্য পরিবর্তনের রাজনীতি, সংস্কারের রাজনীতি। বাংলাদেশ থেকে দুর্নীতি, বৈষম্য ও আধিপত্যবাদ দূর করে একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করাই তাঁদের মূল উদ্দেশ্য। এই লক্ষ্য পূরণে এনসিপি ও এর ১১ দলীয় জোট ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। এনসিপির ‘শাপলা কলি’ প্রতীকে ৩০ জন প্রার্থী সারা দেশের বিভিন্ন আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তরুণ প্রজন্মকে এই পরিবর্তনের রাজনীতিতে সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

নাহিদ ইসলাম বলেন, গত দেড় বছরে অনেক কিছু অর্জন করতে না পারার হতাশা ও সীমাবদ্ধতা তাঁদের রয়েছে, যা তাঁরা স্বীকার করে নিচ্ছেন। তিনি দেশের মানুষের কাছে আরও একটি সুযোগ চেয়েছেন। তাঁর বিশ্বাস, দেশের মানুষ পরিবর্তন ও সংস্কার চায়। ১২ ফেব্রুয়ারি পরিবর্তনের রাজনীতি নাকি পুরোনো রাজনীতি, তা বেছে নেওয়ার সুযোগ এসেছে। তিনি দৃঢ়ভাবে বলেন, এবারের নির্বাচনে এনসিপিসহ ১১ দলীয় জোট জয়লাভ করলে তাঁরা পরিবর্তনের বাংলাদেশ, ইনসাফের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন।

সাবেক ছাত্রনেতা শরীফ ওসমান হাদিসহ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময়কার খুনিদের বিচার নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, আগামী নির্বাচনের সঙ্গেই গণভোট অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যেখানে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ভোট দিয়ে বাংলাদেশের সংস্কারের ধারা অব্যাহত রাখতে হবে। তিনি সতর্ক করে বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ব্যর্থ হলে ৫ আগস্টের বিপ্লবও ব্যর্থ হবে। তাই ৫ আগস্টের অর্জন ও আকাঙ্ক্ষাকে এগিয়ে নিতে হলে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন অপরিহার্য।

অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত উন্নয়নের রূপরেখা তুলে ধরে নাহিদ ইসলাম বলেন, বঙ্গোপসাগরের সীমানা ঘিরে একটি সুনীল অর্থনীতি গড়ে তোলা হবে এবং জনগণের অভিপ্রায় অনুসারে দেশের ন্যায্য হিস্যা আদায় করা হবে। পরিবেশ ও জলবায়ু রক্ষায় ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উপযোগী বাংলাদেশ গড়া, জলবায়ু উদ্বাস্তুদের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ এবং পরিবেশ দূষণ কমাতে পরিবেশ কর চালুর কথা জানান তিনি।

সাবেক শাসনামলের সমালোচনা করে নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন, বিভিন্ন বাহিনীর ভেতরে গুম, খুন, নির্যাতন, দুর্নীতি ও লুটপাটের সঙ্গে জড়িত সব অপরাধীকে শনাক্ত করে বিচারের আওতায় আনা হবে। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে বিভিন্ন ক্ষেত্রে এই অপরাধীরা অসহযোগিতা করছে এবং তথ্য-আলামত নষ্ট করে তদন্ত প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করছে। গুম বিষয়ক কমিশন এক হাজার ৮৫০টির বেশি অভিযোগ নিয়ে কাজ করছে বলেও তিনি জানান।

ক্ষমতায় এলে সাবেক স্বৈরাচারী শাসকের আমলে লুটপাট ও পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার এবং এর সঙ্গে জড়িত কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে দায়মুক্তি না দেওয়ার ঘোষণা দেন তিনি। তিনি বলেন, চিহ্নিত লুটপাটকারীদের ‘গণশত্রু’ ঘোষণা করে তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে একটি ‘পাবলিক ট্রাস্ট’-এর অধীনে আনার প্রস্তাব করেন। ঘুষ, দুর্নীতি ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটপাটের সংস্কৃতির অবসান ঘটিয়ে অর্থনৈতিক বৈষম্য বিলোপের মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং জনগণের কাছে রাষ্ট্রের সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়াই তাঁদের লক্ষ্য।

পররাষ্ট্রনীতি প্রসঙ্গে নাহিদ ইসলাম বলেন, পূর্ববর্তী শাসকগোষ্ঠীর পররাষ্ট্রনীতি ছিল ভারতের নির্দেশ পালন করা, যা বাংলাদেশকে বৈশ্বিক পরিসরে ভারতের পুতুল রাষ্ট্রে পরিণত করেছিল এবং জাতীয় স্বার্থ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এনসিপি ক্ষমতায় এলে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলা হবে। জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে আত্মমর্যাদাপূর্ণ ও স্বকীয় পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করা হবে। সার্ক পুনরুজ্জীবিত করা এবং আসিয়ানে যোগ দেওয়ার চেষ্টা অব্যাহত থাকবে। মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক উন্নয়ন করা হবে। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ন্যায্যতা ও সহযোগিতা হবে তাঁদের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি।

প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার পুনর্গঠনের ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, বাহিনীর সংখ্যা বাড়ানো নয়, বরং গুণগত মান বৃদ্ধিতে গুরুত্ব দেওয়া হবে। পুরো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও হাই-টেক বাহিনীতে রূপান্তর করা হবে। ১৮ বছরের ঊর্ধ্বে সক্ষম সব তরুণ-তরুণীর জন্য বাধ্যতামূলক সামরিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দেশব্যাপী গণপ্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার কথা বলেন, যা আধিপত্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় প্রতিরোধ সক্ষমতা বাড়াবে এবং দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের বিনিয়োগকৃত অর্থের অপচয় কমাবে।

দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখতে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারী ব্যবসায়ী, রাজনীতিক ও আমলাদের সিন্ডিকেট ভাঙা হবে। চাঁদাবাজ ও মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে পণ্যের অতিরিক্ত মূল্য পরিশোধের প্রবণতা বন্ধ করে ন্যায্যমূল্যের বাজার ব্যবস্থা এবং ওএমএস কর্মসূচি বিস্তৃত করা হবে। প্রতিবেশী বৃহৎ দেশের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে একাধিক বিকল্প উৎস থেকে আমদানি বাড়ানোর মাধ্যমে একটি ন্যায্য, স্বচ্ছ ও জনবান্ধব বাজারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার কথা জানান তিনি।

পুলিশি ব্যবস্থার সংস্কার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অত্যাচার ও জুলুমের কারণে মানুষ পুলিশকে ‘পুলিশ লীগ’ নামে ডাকতে শুরু করেছিল। জুলাই গণঅভ্যুত্থানসহ গত ১৫ বছর ধরে হত্যা, নির্যাতন, জুলুম, মিথ্যা মামলা, দস্যুবৃত্তি ও ঘুষ-দুর্নীতিতে জড়িত পুলিশ কর্মকর্তাদের বিচারের আওতায় আনা হবে। তিনি পুলিশ বাহিনীর নাম পরিবর্তন করে ‘জনসেবক বাহিনী’ বা অন্যকিছু রাখা এবং কেন্দ্রীয় কাঠামো ভেঙে স্থানীয় সরকার পর্যায়ে পুনর্গঠনের প্রস্তাব করেন। এ ক্ষেত্রে উপজেলা পর্যায় থেকে নিয়োগ এবং সেখানে পদায়ন করা হবে এবং সমানসংখ্যক নারী-পুরুষ নিয়োগ পাবে।

নাহিদ ইসলাম বিচার ব্যবস্থার ভেঙে পড়াকে ‘ভয়ংকর অশুভ চর্চা’ উল্লেখ করে বলেন, ন্যায়পরায়ণ, দক্ষ ও শিক্ষিত বিচারক নিয়োগ করে পুরো বিচার ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো হবে। ঘুষ-দুর্নীতি নির্ভর রায় বেচা-কেনার চলমান আয়োজন ভেঙে ফেলা হবে। রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করেন তিনি।

জনপ্রতিনিধি ব্যবস্থাকে কার্যকর করতে উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের নির্বাচিত নেতাদের প্রকৃত ক্ষমতা ও কঠোর জবাবদিহিতার আওতায় আনার কথা বলেন। চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হতে ন্যূনতম স্নাতক পাশের যোগ্যতা বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব করেন। শক্তিশালী কেন্দ্র ভেঙে বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা জনগণের হাতে ছেড়ে দিতে হবে।

সমাজ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশ কখনোই আফগানিস্তান হবে না, বরং মালয়েশিয়া বা তুরস্কের মতো ধর্মানুরাগী উদারনৈতিক সমাজ গড়া হবে। ধর্ম ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক চর্চার জায়গায় থাকবে এবং রাষ্ট্র পরিচালিত হবে আইন, ন্যায়বিচার ও ইনসাফের ভিত্তিতে। প্রত্যেক নাগরিক নিজের বিশ্বাস, সংস্কৃতি ও ব্যক্তিগত পছন্দ অনুযায়ী পোশাক নির্বাচনের পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করবেন।

নাহিদ ইসলাম বলেন, গৃহস্থলে সহিংসতা, যৌন হয়রানিসহ সব ধরনের নারী নির্যাতনের ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হবে। নারী সুরক্ষার ক্ষেত্রে প্রান্ত থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত প্রচলিত আইনগুলোর কঠোর প্রয়োগ এবং নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে জনপ্রতিরোধের সংস্কৃতি গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য আলাদা পরিবহন ব্যবস্থা না রেখে সবাইকে সাধারণ জনপরিবহন ব্যবহারের কথা বলেন তিনি। মন্ত্রী ও সচিবদের সপ্তাহে নির্দিষ্ট দিন জনপরিবহনে চলাচলের মাধ্যমে জনজীবনের বাস্তবতা অনুভব করার নতুন সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করেন।

পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নে আধুনিক বাস সার্ভিস চালুসহ গণপরিবহনে সরকারি বিনিয়োগের অগ্রাধিকার, মানসম্মত পরিবহন নিশ্চিত করা, ছাত্রছাত্রী, প্রতিবন্ধী ও প্রবীণ নাগরিকদের জন্য বিশেষ ছাড় ও সংরক্ষিত আসন নিশ্চিত করার কথা বলেন তিনি। পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি ও কালোবাজারি দমন করে ন্যায্য ভাড়া নিশ্চিত করা এবং টিকিটিং ব্যবস্থাকে স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দেন নাহিদ ইসলাম।

সবশেষে নাহিদ ইসলাম বলেন, এক নতুন স্বপ্ন আর নতুন বাংলাদেশের অভিপ্রায়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে তাঁরা রাজপথে নেমেছিলেন এবং জনগণও তাঁদের সঙ্গে ছিল। তাঁদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফলেই আজ তাঁরা কথা বলতে পারছেন। তিনি বলেন, যদি জনগণ সুযোগ দেয়, তবে তাঁরা এই স্বপ্ন বাস্তবায়নে সক্ষম হবেন।